মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

নিরাপত্তায় ঘাটতি থাকতে পারে চর

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৩০ এএম

পরপর দুদিন পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানে সোনালী ও কৃষি ব্যাংকের শাখায় সশস্ত্র হামলা চালিয়ে অর্থ লুট করেছে সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। এসব ঘটনায় ব্যাংকের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পরপর দুটি বড় ঘটনা ঘটলেও নিরাপত্তার বিষয়টি দেখা শুধু স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব বলে দায় সারছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ব্যাংক লুট করাই নয়, ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে, তারা এত গুছিয়ে একটা কাজ করল, ব্যাংকের ভেতরেও তাদের সোর্স আছে কি না, খতিয়ে দেখা দরকার। নিরাপত্তার কারণে বান্দরবান সদরসহ ছয়টি উপজেলায় সব ব্যাংকের লেনদেন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির ১৯টি এবং খাগড়াছড়ির ৯টি শাখায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় সতর্কভাবে লেনদেন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সোনালী ব্যাংকের জিএম (দক্ষিণ) সাইফুল আজিজ জানান, ডাকাতির ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের বান্দরবানের উপজেলা পর্যায়ের ছয়টি শাখায় লেনদেন সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে।

তবে এ হামলা শুধু অর্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে, তা আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও মেজর (অব.) মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘সেখানে যে শুধু ব্যাংক লুট করাই মুখ্য বিষয় ছিল, সেটা আমি মনে করি না। কেএনএফ দীর্ঘদিনের একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের আগের অনেক ইতিহাস আমরা জানি। শান্তিচুক্তির সময় তাদের সঙ্গে একটা সমঝোতা হয়েছিল। যারা এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করে থাকে বা যেই এলাকায় থাকে সেখানে রিল্যাক্স মুডে থাকার সুযোগ নেই। তাদের সঙ্গে সমঝোতা হোক বা না হোক, সেটার ওপর ভিত্তি করে চুপ থাকাটা ঠিক হয়নি। যাদের আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আছে, তারা প্রকাশ্য যা করে আড়ালে আরও কিছু থাকে। তারা যে ব্যাংক লুট করেছে, সেটা করেই ক্ষান্ত হয়নি। তারা টাকা নিয়ে গেছে, ম্যানেজারকে ধরে নিয়ে গেছে, অস্ত্র নিয়ে গেছে। তারা তাদের শক্তির জানান দিয়ে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সেখানে অবশ্যই নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল। এটা একটা পরিকল্পিত কাজ। আমার ধারণা, এখানে স্থানীয়দের পাশাপাশি ব্যাংকের ভেতরেও তাদের ইনফরমার থাকতে পারে, এলাকার সাধারণ লোকজনও তাদের কাছে তথ্য সরবরাহ করে থাকতে পারে। এখানে তারা এ কাজটার মাধ্যমে কিন্তু তাদের শক্তি প্রদর্শন করল। এ কাজটা সহজ ছিল না। এটা একটা স্পর্শকাতর এলাকা, জনবহুল একটা এলাকা। সেখানে পুলিশ ব্যারাক, আনসার ব্যারাক রয়েছে। তারা যেভাবে আনসার ক্যাম্পে গিয়ে তাদের নিরস্ত্র করেছে, তারপর ব্যাংকে হামলা করেছে, সবকিছুই তাদের গোছানো। সব থেকে অবাক করার বিষয় প্রায় এক ঘণ্টা সময় ধরে তারা তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়েছে অথচ কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খবরই পায়নি। তারা এত গুছিয়ে একটা কাজ করল আর আমরা সেটা বুঝতে পারলাম না, এটা আমাদের জন্য বড় একটা ব্যর্থতা। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা উচিত।’

এসব ঘটনার বারবার ঘটলে সারা দেশেই আতঙ্ক তৈরি হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা নিশ্চয়ই উদ্বেগের ব্যাপার। যারা আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে আছেন তাদের বিষয়গুলো দেখা উচিত। যারা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা উচিত। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত।’

তবে এ ঘটনার পর সব ব্যাংকেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ লিমিটেড (এবিবি)। এবিবি চেয়ারম্যান সেলিম আর এফ হোসেন বলেন, ‘এটা এক বিশেষ লোকেশনে হয়েছে। সব ব্যাংকই নিজেদের নিরাপত্তা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ওই এলাকায় যাদের ব্যাংক আছে তাদের আরেকটু সচেতন হওয়া প্রয়োজন। আমরা আশা করব সব ব্যাংকই এরকম তৎপরতা দেখিয়েছে এবং উপযুক্ত পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে ব্যাংকে থাকা অর্থ নিয়ে গ্রাহকের দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। কেননা ব্যাংকে যে অর্থ থাকে তার পূর্ণ নিশ্চয়তা থাকে। গ্রাহকের কোনো ক্ষতি হবে না। তাই গ্রাহকদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. মেজবাউল হক বলেন, ‘এটা আইনশৃঙ্খলা ও স্থানীয় প্রশাসনের বিষয়। এটা আমাদের বিষয়ের মধ্যে পড়ে না। আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি এবং তারা যে কার্যক্রম করছে আমরা সেই সম্পর্কে অবহিত আছি। সেখানে কিছু নির্দেশনা দেওয়ার অধিকার আমাদের নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেভাবে নির্দেশনা দেবে, সেভাবেই পরিচালিত হবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত