বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কাজের আগেই খরচ ১১০০ কোটি

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৪:৫৮ এএম

জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়াতে ১৪ বছর আগে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো এর নির্মাণকাজ শুরু করতে পারেনি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তবে জমি অধিগ্রহণে, পরামর্শক নিয়োগে, প্রস্তাব প্রণয়নসহ বিভিন্ন খাতে অন্তত ১১০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ২০১৬ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হওয়ার কথা থাকলেও না হওয়ার কারণ টাকার অভাব এবং দাপ্তরিক কাজে ধীরগতি ও কর্মকর্তাদের আন্তরিকতার ঘাটতি।

প্রকল্পটি সময়মতো বাস্তবায়িত না হওয়ায় সাগর থেকে পাইপলাইনে আমদানিকৃত জ্বালানি তেল কম খরচে ও কম সময়ে সঞ্চালনের জন্য নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পও পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগকারী না পাওয়ায় নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা আটকে আছে। কারণ বেসরকারি খাতের বড় শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ ইআরএলের সঙ্গে যৌথভাবে দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের জন্য প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগে প্রকল্পটির ৮০ শতাংশের মালিকানা চায়।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘এস আলম গ্রুপ একটি প্রস্তাব দিয়েছে। সেটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। জ্বালানি বিভাগ প্রস্তাব বিচার-বিশ্লেষণের করার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

সূত্রমতে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ প্রস্তাবে সায় দিয়েছে। প্রস্তাবের যাচাইয়ের জন্য জ্বালানি বিভাগের নির্দেশনায় একটি কমিটি করেছে বিপিসি। যদিও বিপিসি ও ইআরএল এখনো প্রকল্পটি নিজের টাকাতেই করতে চায়।

খনির জ্বালানি তেল ব্যবহার উপযোগী করার জন্য পরিশোধন করতে হয়। পরিশোধনের ফলে বিটুমিন, এলপিজিসহ বিভিন্ন উপজাত তৈরি হয়, যা ব্যবহৃত হয় নানা কাজে।

চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় দেশের জ্বালানি তেলের একমাত্র সরকারি শোধনাগার ইআরএল নির্মিত হয় ১৯৬৮ সালে। বছরে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল শোধনের ক্ষমতা রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির।

দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা বছরে প্রায় ৯০-৯৫ লাখ টন। শোধনসক্ষমতা না থাকায় চাহিদার জ্বালানি তেলের চাহিদার বেশিরভাগ আমদানি করা হয় পরিশোধিত অবস্থায়। পরিশোধিত তেলের দাম বেশি। ফলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। আবার বিটুমিন ও অন্যান্য উপজাত আমদানি করতে হচ্ছে।

জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ের জন্য সরকার ২০১০ সালে বছরে ৩০ লাখ টন জ্বালানি তেল পরিশোধনের ক্ষমতাসম্পন্ন দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। তখন প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৩ হাজার কোটি টাকা। পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারির ২০০ একর জায়গার একপাশের ৭০ একর জায়গায় দ্বিতীয় ইউনিট করার কথা। এর জন্য বাড়তি জমিও অধিগ্রহণ করা হয়। পরে সংশোধিত প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। ফিড কন্ট্রাক্টর হিসেবে ফ্রান্সের টেকনিপকে নিয়োগ দেওয়া হলে তারা প্রকল্পটির (ইআরএল-২) ডিজাইন সম্পন্ন করে। আর প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট (পিএমসি) হিসেবে নিয়োগ পায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড (ইআইএল)। ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল ভারতীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি করে বিপিসি। এসবের জন্য খরচ হয়েছে প্রায় ১১০০ কোটি টাকা।

সরকার বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছে, প্রকল্পটির জন্য বৈদেশিক ঋণ না পাওয়ায় এটির বাস্তবায়ন হচ্ছে না। পশ্চিম এশিয়ার (মধ্যপ্রাচ্যের) কয়েকটি কোম্পানি এর নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেও ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের আকার ছোট হওয়ায় শেষ পর্যন্ত রাজি হয়নি।

সর্বশেষ সংশোধনীর সময় প্রকল্পব্যয় ধরা হয় ২৩ হাজার ৫৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯২ হাজার টাকা। এর ১৬ হাজার ১৪২ কোটি টাকা সরকার আর ৬ হাজার ৯১৬ কোটি টাকা বিপিসির খরচ করার কথা। কিন্তু এ প্রস্তাবও ঝুলে গেছে।

এমন পরিস্থিতিতে গত বছর ১৩ অক্টোবরে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে ইআরএলের জমিতে ৫০ লাখ টন জ্বালানি তেল শোধানাগর নির্মাণের প্রস্তাব দেয় এস আলম গ্রুপ। গত ২৯ জানুয়ারি এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে সমঝোতা স্মারকের প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়। প্রস্তাবে ৩-৫ মিলিয়ন টন সক্ষমতার নতুন রিফাইনারি নির্মাণের আগ্রহের কথা বলা হয়। প্রকল্পে এস আলম গ্রুপের ৮০ শতাংশ এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির ২০ শতাংশ শেয়ারের প্রস্তাব করা হয়। গত ৫ ফেব্রুয়ারি এক চিঠিতে বিপিসিকে জ্বালানি বিভাগ জানায়, এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি যৌথ চুক্তির (পিপিপি) ভিত্তিতে প্রকল্পটি করা হবে। জ্বালানি বিভাগের নির্দেশনা অনুসারে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি সাত সদস্যের একটি কমিটি করে বিপিসি।

ইআরএল ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. লোকমান বলেন, ‘প্রকল্পটির ডিপিপি মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এস আলমের প্রস্তাব বিবেচনা করতে সাত সদস্যের কমিটি করেছে বিপিসি। সার্বিক বিবেচনা করে সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’

তবে এস আলমের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে প্রকল্প করা হলে সরকারের ব্যয় হওয়া প্রায় ১১০০ কোটি টাকার কী হবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

জ্বালানিবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেরি যেহেতু হয়েছে তাই এখন এস আলমের বিনিয়োগের প্রস্তাব সরকার বিবেচনায় নিতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে ইআরএল তথা দেশের মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। চুক্তির শর্তগুলোর জনবান্ধব হওয়া জরুরি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সহজে লাভ হবে এমন ক্ষেত্রে বিনিয়োগেই বেশি আগ্রহী। সরকারকে দেশের স্বার্থ আগে দেখতে হবে।’

ইজাজ হোসেন বলেন, ‘এস আলমের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়িক যোগাযোগ ভালো। দ্বিতীয় ইউনিট থেকে উৎপাদিত বাই প্রোডাক্ট বিদেশে রপ্তানির দায়িত্ব যদি তারা নেয় তাহলে সেটা ভালো হবে। তবে পুরো বিষয়টি দেশের মানুষের কাছে পরিষ্কার করা দরকার।’

বিপিসি ও ইআরএলের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি অর্থায়নে বিপিসি নিজেই এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে পরিশোধন ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকবে। এতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। ইতিমধ্যে অনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে।

এদিকে ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট না হওয়ায় সরাসরি সাগরের জাহাজ থেকে কম খরচে দ্রুত জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য নির্মিত এসপিএম প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও তা পুরোপরি কাজে আসছে না।

এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত বলেন, ‘এসপিএমের মাধ্যমে দুটো আলাদা পাইপলাইন দিয়ে বছরে ৪৫ লাখ টন পরিশোধিত এবং ৪৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেলসহ মোট ৯০ লাখ টন তেল সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহ করে পাইপলাইন পুরোপুরি কাজে লাগলেও অপরিশোধিত ৪৫ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা যাবে না। কারণ পরিশোধন সক্ষমতা নেই। তবে দ্বিতীয় ইউনিটের বাস্তবায়নের আগপর্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি তেল বেশি পরিমাণে আমদানি করে পাইপলাইন প্রকল্পের বিনিয়োগ তুলে আনার চেষ্টা করা হবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত