শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বায়ান্ন বিড়ালের তিপ্পান্ন তরিকা

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:৫২ এএম

ঈদ ও নববর্ষের লম্বা ছুটির সময় ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সভাপতির বাড়ির আঙিনাকেই সদ্যোজাত তিন ছানার জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত এবং যুক্তিযুক্ত আশ্রয়স্থল বিবেচনা করে বিড়ালটি। বিড়ালটি একটু ভাবুক প্রকৃতির এবং তার সহজ-সরল আচার-আচরণে মোটামুটি মুগ্ধ সবাই। এই ক্যাম্পাসে আছে সেই করোনাকালের অনেক আগে থেকেই। সভাপতি মহোদয়ের এক নিকট প্রতিবেশীর আটপৌরে জীবনযাপনকে সবসময় বিড়ালটি সম্মান ও সমীহ করে চলতেন। এই নিকট প্রতিবেশী এক সময় এমন এক দপ্তরের প্রধান পুরোহিত ছিলেন যাদের স্বভাব অন্যের হাঁড়ির খবর নেওয়া এবং সেখান থেকে রাষ্ট্রের পাথেয় জোগাড় করা। কাজটা সহজ নয় এবং সেখানে মানবিক হওয়ার সুযোগ থাকলেও তার অপব্যবহারের আশঙ্কা সবসময় বিদ্যমান। সেই প্রতিবেশী যিনি এক সময় চিকিৎসা সেবাদানকারী নামকরা প্রতিষ্ঠানের প্রধান সমন্বয়কারী নাকি ছিলেন, শুনেছে বিড়ালটি আরেকজনের কাছ থেকে। সে শুনেছে অন্যের কাছ থেকে। খাজনাপাতি আদায়-আহরণের নামে অনেকের মনোবেদনার কারণ হয়ে থাকতে পারেন, কারও অতি সুখের অসুখও হতে পারে এই বিবেচনায় কিনা জানা নেই। তিনি স্বাস্থ্যসেবার পেশায় গিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের সান্ত¡না সেবা দিয়ে কষ্টাকষ্টিতে কিছুটা ব্যালেন্স আনতে চান নিজের আগের ও পরের সব জটিল ও কুটিল কার্যক্রমের।

ভদ্রলোক আজ তিন ছানার আবাসস্থলের দিকে একটু পা বাড়িয়ে ছিলেন। মা বিড়ালটির (যাকে তিনিও চেনেন বিড়ালটিও তাকে সম্মান সমীহ করে) কাছে ব্যাপারটি ভালো তো ঠেকেনি বরং তার চেয়ে তার ছানাদের ভূত ভবিষ্যৎ নিয়ে সে চিন্তিত হয়ে পড়ে। ফলে একটু বিরূপ আচরণ তাকে করতেই হয়। কেননা মাতৃস্নেহ যে দায়িত্ববোধের জন্ম দিয়েছে তার মধ্যে সেখানে কোনো তস্করকে বিনা প্রতিকার প্রতিবিধানে যেতে দেওয়ার সুযোগ বা অবকাশ তার ছিল না। সে যা কখনো করেনি বেশ রাগান্বিত হয়ে প্রতিবাদের বডি ল্যাংগুয়েজ তার মধ্যে প্রকাশ পায়। বিড়ালটি এক সময় এই সমিতি ও আশপাশের আরও কয়েকটি সমিতির সমুদয় বিড়ালদের সম্মানজনক জীবন ও জীবিকা দেখভাল মোর্চার আহ্বায়ক ছিল। করোনাকালে ওই মোর্চার মঞ্চ ভেঙে যায়। সে সময় গৃহকর্তা-কর্ত্রীরা সারাদিন হাত ধোয়ায় ব্যস্ত থাকতেন, ঘরের বাইরে বড় একটা বের হতেন না। তখন বিড়ালদের দৈনন্দিন আহার-বিহারে টানাটানি তো পড়তই। না খেয়ে না দেয়ে প্রায় ৩৫টি বিড়াল ছানা বিনা খাদ্যে অনাহারে অনাদরে প্রাণপাত করে। করোনা কিংবা ডেঙ্গুতে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা টেলিভিশনে প্রতিদিন প্রচার পেত অথচ বিড়ালসহ প্রাণিকুলের বেদনাবিধুর খবর সেখানে থাকত না। একপর্যায়ে কোনো কোনো দেশে কোনো কোনো প্রাণীকে করোনার জন্য দায়ী করে অভিযান চালানো হয়। সুন্দরবনে বাঘ, বানর, হরিণ, কুমির (বাবাহকু) সমিতির তরফ থেকে জোর প্রতিবাদ জানানো হলে সে তৎপরতা থেমে যায়। করোনাকালেই বিউটি নামীয় বিড়ালটির এবারের মতো তিনটি ছানার জন্ম হয়। সে সময়কার স্বনামধন্য শব্দের নামে বিড়াল ছানাদের নাম লকডাউন, জিঞ্জার এবং এঞ্জেলা রাখা হয়। করোনাকালে তাদের করুণ জীবন কাহিনি নিয়ে নাকি চলচ্চিত্র নির্মাণের ভাবনা ভেবেছিলেন এক পরিচালক। পরে ওই পরিচালক নিজেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে পরপারে চলে গিয়েছেন।

বিড়ালটি অনেক ভেবেচিন্তে ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সভাপতির বাড়ির আঙিনায় আশ্রয় নিয়েছে এবার। কেননা চারধারে এত জটলা যে, ইদানীং নিজেদের আত্মপরিচয় ও মর্যাদা বজায় রেখে চলাচল করা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। লকডাউনে একবার তার মায়ের কাছে জানতে পেরেছিল মালিক সমিতির সভাপতি একজন অনারারি কনসাল কোনো দেশের। তার গাড়িতে পতাকা আছে। ‘পতাকাওয়ালা গাড়ির নিচে কখনো পড়িস নে যেন’ বিড়ালদের মাস্টারমশাই প্রায়ই সাবধান করতেন।  খেজুরগাছের রস খাওয়া নিয়ে বংশীয় বাদুড়দের নানান ধারায় আটকিয়ে কোর্টকাচারি পর্যন্ত গড়িয়েছে নিপাহ ভাইরাস নামের কেসটি। এখন চেম্বার আদালতে আছে। কোর্টকাচারি হয়তো অবজারভেশনে একপর্যায়ে সব বাদুড়কে একঘরে আটকিয়ে বাইরে কড়া প্রহরার ব্যবস্থার কথা বলা হতে পারে। সবাই যেন বলতে পারে ‘বাদুড়দের নামতেই দেওয়া হয়নি’। আরেক বিশেষভাবে অজ্ঞ বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি পরামর্শ দিয়েছেন এটিএম বুথে যেমন করে একজন পাহারাদার থাকে তেমনটি প্রতিটি খেজুরগাছে একজন করে বাদুড় পাহারাদার নিয়োগ করা যায়। সুন্দরবনের বাদুড় সম্প্রদায়ের বর্ষীয়ান নেতা বাদুড়িয়া বাদাবান এটাকে নিদারুণ রসিকতা বলে কড়া সমালোচনা করে একটি বিবৃতি দিয়েছেন কাটাখালী কেন্দ্র থেকে।

ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক, যার নামের সঙ্গে অতীতের মশহুর এক মহামান্যের আদ্যক্ষরের সঙ্গে মিল থাকায় তিনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন। তিনি আজ এক বিবৃতিতে ক্যাম্পাসের বিড়াল প্রেমিকদের সতর্ক-সাবধান করে দিয়েছেন। কলোনির ভেতরে বহিরাগত বিড়ালরা এসে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাতে পারে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে। বিজ্ঞপ্তির ওপর মিশ্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন ফ্ল্যাট বিড়াল প্রেমিক সংঘের প্রধান, যিনি নীতিনির্ধারকদের নেত্রী। তার অভিমত হলো অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদের গুরুত্ব ও তাৎপর্য উপলব্ধির কথাটা ভুলে গেলে চলবে না। প্রাণিসম্পদ পরিবারভুক্ত ছোট হোক বড় হোক সবাই পরস্পর প্রযুক্ত অবদান রেখে চলেছেন। বিড়ালরা আছেন বলেই ইঁদুরের উপদ্রব সীমিত অবয়বে রয়েছে। বিড়ালদের আচার-আচরণ নিয়ে কাউন্সিলিং তথা সংস্কারের কোনো কর্মসূচি না নিয়ে বিড়ালদের বিরুদ্ধে তো বটেই, বিড়াল পরিপালন ও পরিচর্যাকারীদের পর্যন্ত কূট-সমালোচনা করা হচ্ছে। খোদ বিড়াল সম্প্রদায় তো বটেই, তাদের নিরাপত্তা ও বিকাশপন্থিদের প্রতিও কটাক্ষ করা হচ্ছে। উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর এই প্রয়াস প্রচেষ্টা থেকে সরে আসার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্তদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।

এদিকে বিড়াল সম্প্রদায়ের প্রতি ফ্ল্যাট মালিক সমিতির কর্তাব্যক্তিদের নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে বাবাহকুর আইন পরিষদ ‘বনজঙ্গলে’ একটি দৃষ্টি আকর্ষণ প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য কচিখালির বর্ষীয়ান নেতা বিড়ালীধরন নোটিস জমা দিয়েছেন। বনজঙ্গলের অধ্যক্ষ শিয়ালেন্দু মামাইয়া নোটিসটি গ্রহণ করে আগামী অধিবেশনের কার্যতালিকায় রাখতে অনুমোদন দিয়েছেন। আজকাল যে কোনো বিষয়ে বিচারালয়ের দ্বারস্থ হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বনেজঙ্গলের অধ্যক্ষের কার্যালয় থেকে বিচারালয়ের আগাম মতামত নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে বলে সেখানকার মুখ্য শলাপরামর্শক ধারণা দিয়েছেন। সাংবাদিককর্মীদের সঙ্গে গতকাল বিকালে তিনি বলেন, আজকাল নিজেদের মুক্তবুদ্ধি বিচার-বিবেচনাপ্রসূত এখতিয়ারে থাকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সৎসাহস না থাকায় নিজেদের নিষ্ক্রিয় কর্মকান্ডকে বিচারালয়কে দিয়ে কাঁপানো সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী হয়ে উঠছে। সব কিছু এভাবে আরোপিত হওয়ার পথে থাকলে নিজেদের দায়িত্বশীলতার সঙ্গে নেতিবাচক অভীপ্সা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাকেও বন্দিত্ব বরণ করতে দেওয়ার শামিল। মুখ্য শলাপরামর্শক বরাবরই বেশ সতর্কতার সঙ্গে কথা বলার পক্ষপাতী। সে কারণে মিডিয়াকর্মীদের অনেক পুষ্টিকর প্রশ্ন তিনি এড়িয়ে যান। তিনি সর্বশেষ মন্তব্য রাখেন আকাশ থেকে নিয়মমাফিকভাবে প্রাকৃতিকভাবে যে বর্ষণ হয় তার মধ্যেও সন্দেহ ও ষড়যন্ত্র খোঁজার কাজ যখন শুরু হয় তখন প্রকৃতিও বিরূপ হয়ে উঠবে। প্রকৃতির প্রতিশোধ বা  বিচারকে ত্বরান্বিত করা সমীচীন নয় কারও পক্ষে।

বিউটির বাচ্চারা একটু চটফটে হয়েছে। তারা খেলাধুলায় মেতে উঠছে। ছানা বিড়ালদের সবাই আদর করতে চায়। তারা নিষ্পাপ নিরীহ তাই। এরা যখন গ্যাং সদস্য হয়ে উঠছে তখন তাদের বলা হয় ছিচকে কাঁদুনে বিড়াল। রবীন্দ্রনাথ তার বলাই গল্পে যেমনটি বলেছেন বারো-তেরো বছরের বালকের মতো বালাই আর নেই। না তাদের আদর করা যায়, না তাদের জ্বালাতন সহ্য করা যায়। ফ্ল্যাট মালিক সমিতির বিড়ালদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই বহিরাগত বিড়ালদের আসা-যাওয়া বেড়েছে। ভেতরের উঠতি বেড়ালরাও গ্যাং কালচার ও নানান বাজে স্বভাবের হয়ে উঠছে। আজকাল সবাই কাজ আর ইফেক্টর মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক যাচাই ব্যতিরেকে ইফেক্ট নিরাময় নিয়ে মাথাব্যথার কারণ সৃষ্টি করে। সমস্যার মধ্যেই সমস্যারা জন্ম নেয় সমস্যাকে আড়ালে রেখে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানে মাতামাতি করলে আখেরে কোনো লাভ হয় না। মূল সমস্যা একদিন না একদিন মাথাচাড়া দিয়ে উঠবেই। সমস্যা পুষে রেখ নয়, সমাধানের পথ পেতে হবে। স্থান, কাল, পাত্রে সমস্যারা যেসব ডিম পাড়বে তা ফুটতে শুরু করলে আত্মরক্ষার পথ খোঁজা শুরুর মতো বোকামি আর নেই, যে ফ্ল্যাট থেকে বিড়ালরা বেশি সমর্থন পায় সেই বাসার মালিকের ইদানীং বেজায় মন খারাপ। তিনি একটা বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। ব্যাংকের ধুরন্ধর পরিচালক কাম মালিক পক্ষ টাকা আত্মসাৎ করে ব্যাংকটাকে পথে বসিয়েছে। যারা টাকা আত্মসাৎ করল তাদের বিচারের আওতায় এনে প্রতিবিধানসহ টাকা উদ্ধারের ব্যবস্থায় না গিয়ে পথে বসা ব্যাংকটির সমুদয় দায়দেনাসহ মোটমুটি সুস্থ ব্যাংকের ঘাড়ে তা চাপিয়ে দেওয়া চলছে। অন্যায়-অনিয়মকারীকে এভাবে প্রশ্রয় দিতে এ ধরনের উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে। বিড়াল সম্প্রদায় চোখের সামনে দেখছে নতুন নতুন ধান্দাবাজ নতুন নতুন সমস্যার ঝুড়ি নিয়ে তুড়ি মেড়ে  এগোচ্ছে। নানা মুণির নানান মতের মধ্যে আসল সমস্যা হারিয়ে যাচ্ছে। সমাধান দিল্লিকা দুরস্থ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত