শুক্রবার, ৩১ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

হালাল মাংস রপ্তানির সুযোগ নেওয়ার তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ০৫:৫৬ এএম

দেশের মানুষের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে পশুর মাংস রপ্তানি করতে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘অনেক দেশ হালাল মাংস আমাদের থেকে কিনতে চায়। সেই সুযোগ আমাদের নিতে হবে। আর সেজন্য আমাদের পশু-পাখিগুলোকে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে লালনপালন ও নিয়ম মেনে জবাই করতে হবে এবং প্যাকেটজাত করার ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে হচ্ছে কি না, সে বিষয় আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। এভাবে যদি করতে পারি তাহলে দেশের মানুষের চাহিদা মিটিয়ে আমরা বিদেশেও রপ্তানি করতে পারব।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যে কিছু কিছু রপ্তানি হচ্ছে। কিন্তু আরও বেশি রপ্তানি করার সুযোগও আমাদের আছে, অনেক দেশের কাছ থেকে আমরা সেই অনুরোধও পাচ্ছি।’ প্রধানমন্ত্রী গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের (বিআইসিসি) পাশে শেরেবাংলা নগরের পুরাতন বাণিজ্য মেলা মাঠে আয়োজিত দুদিনব্যাপী ‘প্রাণিসম্পদ সেবা সপ্তাহ ও প্রদর্শনী-২০২৪’-এর উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন।

দেশের পোলট্রি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে নিজেদেরই নিজস্ব খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমি চাই বেসরকারি খাত এগিয়ে আসুক। বেসরকারি খাতকেই উদ্যোক্তা হিসেবে দেখতে চাই। তাদের সব রকম সহযোগিতা করতে চাই। এর ফলে আমার দেশের মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে। আমরা তাই চাই।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমরা বেসরকারি খাতকেই বেশি উৎসাহিত করতে চাই। তাদেরই বেশি সুবিধা দিতে চাই। কারণ এগুলো সব সরকারিভাবে হয় না। এটা বেসরকারি খাতে হলে তাতে কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হয়। আমাদের শিক্ষিত যুবসমাজ এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসুক সেটাই আমরা চাই।’

তার সরকারের দেওয়া সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে যুবসমাজকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘শুধু একটা পাস করে চাকরির পেছনে না ছুটে যুবসমাজ যদি নিজের উদ্যোগে একটু ব্যবসা-বাণিজ্য করে, তাহলে কিন্তু আমরা যথেষ্ট এগিয়ে যেতে পারব। এসব ক্ষেত্রে আমাদের যুবসমাজকে এগিয়ে আসার জন্য আরও উৎসাহিত করতে হবে। যাতে কখনো আমাদের কারও ওপর নির্ভরশীল হতে না হয়। খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের নিজস্ব পুষ্টির ব্যবস্থা আমরা নিজেরাই করতে পারি সে বিশ্বাস আমার আছে।’

প্রধানমন্ত্রী উৎপাদন বৃদ্ধিতে গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে আমাদের গবেষণা আরও বাড়াতে হবে। আজ আমরা ৪০ ভাগের ওপরে পেঁয়াজ উৎপাদন করতে পারি। আমরা কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে চাই না। প্রতিটি পণ্য আমরা নিজেরাই উৎপাদন করব।’ তার সরকার খামারিদের সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে উৎসাহিত করে যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মো. আবদুর রহমানের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য দেন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম উদ্দিন।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইমরান হোসেন দেশের ডেইরি খাতের প্রতিনিধি হিসেবে এবং বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রি সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) যুগ্ম আহ্বায়ক মশিউর রহমান পোলট্রি খাতের প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য দেন।

শুরুতে প্রাণিসম্পদ খাতে বর্তমান সরকারের অগ্রগতি ও অর্জনের ওপর একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এ আয়োজনের এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘প্রাণিসম্পদে ভরবো দেশ, গড়বো স্মার্ট বাংলাদেশ’। উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী প্রদর্শনীর বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার একটি প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। যেসব পশু পালন করা হয় তা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পালনের ব্যবস্থা নিতে হবে। মাছ, হাঁস-মুরগি, পশু পালন এবং উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে করতে হবে। এটাও গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে আরও যত্নবান হতে হবে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে হালাল মাংস রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ আমাদের রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘আমরা যাতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারি সেজন্য কিছু আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন বুচার হাউজ (কসাইখানা) আমাদের তৈরি করা দরকার। বিশেষ করে কোরবানির সময় রাস্তাঘাটে যেখানে-সেখানে ফেলে পশু জবাই করা আমাদের বন্ধ করতে হবে। সুনির্দিষ্ট একটি স্থান থাকবে, যেখানে পশু জবাই হবে এবং যার যার চিহ্নিত পশু সে নিয়ে যাবে। তাহলে পুরো প্রক্রিয়া যেমন স্বাস্থ্যসম্মত হবে, তেমনি পশুর পরিত্যক্ত অংশ এবং চামড়া যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাবে। না হলে চামড়ার মান নষ্ট হয়, তেমনি অনেক কিছুই অপচয় হয়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘পশুর শুধু মাংসই আমাদের প্রয়োজন হয় না, এর হাড়, রক্ত, চামড়া এমনকি বর্জ্যও আমাদের কাজে লাগে। আমরা যদি এগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবহার করতে পারি, তাহলে আমাদের অনেক কাজে আসতে পারে। এগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং কাজে লাগানোর ব্যবস্থা আমাদের করতে হবে।’ এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের ব্যবস্থা নেওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার বলে আমি মনে করি এবং সংশ্লিষ্ট মহল এ উদ্যোগ নেবে বলে আমি আশা করি।’

তিনি বলেন, তার সরকার ৪৭০টি উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ পশু চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। এই ভেটেরিনারি সেক্টরটার দিকে আরও দৃষ্টি দেওয়া দরকার উল্লেখ করে তিনি আটটি বিভাগ ও ৬৪টি জেলায় ভেটেরিনারি ফার্ম, পশু চিকিৎসালয় ও সংরক্ষণাগার গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘ধান-চালের পাশাপাশি পশুসম্পদ সংরক্ষণাগার গড়ে তুলে কোনো সম্পদই যেন অপচয় না হয়, সেদিকে লক্ষ রেখে এগুলোকে যেন আমাদের আর্থিক কাজে আমরা ব্যবহার করতে পারি, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। মৎস্য ও পশুপাখির খাদ্যও যেন নিরাপদ হয় এবং এগুলো যাতে পরে মানবদেহে কোনো রোগের সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।’

বাংলাদেশে ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প অনেক দূর এগিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা পশুপাখির জন্য নিজেরাই নানা রকম ভ্যাকসিন তৈরি করে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এটা দুর্ভাগ্যের বিষয় যে বাংলাদেশ বিস্তীর্ণ সমুদ্রসীমা অর্জন করলেও এখনো গভীর সমুদ্র থেকে সম্পদ আহরণ করতে পারেনি। আসলে আমরা এই উদ্দেশ্যে কোনো উদ্যোক্তা পাচ্ছি না। এটাই বাস্তবতা।’ বাসস

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত