শুক্রবার, ৩১ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কোন পথে ভারত?

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:০০ এএম

ভারতের সংবিধান বাঁচানোর মহাসংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে। মাসব্যাপী গণতন্ত্রের উৎসবে আজ ভোট হচ্ছে একুশটি রাজ্যের ১০২টি আসনে। বলা হয়, ভারত পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ। অথচ সেই গণতান্ত্রিক দেশেও এবার ভোট কতটা নির্বিঘ্নে, নিরপেক্ষতা মেনে পরিচালিত হবে তা নিয়ে বিস্তর সন্দেহ আছে। এমনিতেই নরেন্দ্র মোদির শাসনকালে দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা বলে যে কিছু আছে তা আতশি কাচ দিয়ে খুঁজলেও টের পাওয়া যায় না। আমি তার দলকে সমর্থন করি না বলেই এমন বিষোদগার করছি তা ভাববেন না। অনেক বিষয়ে মোদি সরকারকে নিশ্চিত প্রশংসাই করব। করিও।

যে কৌশলেই হোক কিছু ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদির সরকার যে আন্তর্জাতিক স্তরে ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি করতে পেরেছে তা তো বলতেই হবে। ভারতের এলিট মধ্যবিত্তদের মধ্যে মোদি সরকার আস্থাভাজন হয়ে উঠেছে। এর পেছনে নিঃসন্দেহে বাকচাতুর্য বেশি হলেও, এই আস্থা তৈরি হয়েছে এটাই ঘটনা। অন্যদিকে, বিজেপির নেতা থেকে নরেন্দ্র মোদির দেশনেতা হয়ে ওঠা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। মোদির ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব বিজেপির ভোটে জিততে একমাত্র তুরুপের তাস। একমাত্র শব্দটি ভেবেচিন্তেই ব্যবহার করছি। মোদি ছাড়া অন্য কোনো নেতা আজ আর বিজেপিতে নেই, যার একক শক্তি দলকে জেতাতে পারে। রাজনাথ সিং, অমিত শাহ বা যোগী আদিত্যনাথ আপাত শক্তিশালী নেতা সব নামেই। তাদের আলাদা কোনো অস্তিত্ব নেই। এটাই বিজেপির প্লাস পয়েন্ট আবার এটাই মাইনাস। একদা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপি ছিল রেজিমেন্টেড দল। ক্যাডারনির্ভর দলের কাঠামোয় আজ ঘুণ ধরেছে। নরেন্দ্র মোদির ইমেজ ছাড়া বিজেপির পক্ষে সাফল্য পাওয়া অসম্ভব। ফলে যে সংগঠনের ভেতরেই গণতন্ত্রের অকাল মৃত্যু ঘটেছে সে দেশে গণতন্ত্র বজায় রাখতে সক্রিয় থাকবে এ হতে পারে না।

নরেন্দ্র মোদি হুঙ্কার দিচ্ছেন যে এবার দল ৪০০ সিট পাবে। পেতে হবেই। ওই পেতে হবেই কথাটা যথেষ্ট সন্দেহজনক। নরেন্দ্র মোদির আর যাই গুণ থাক, তিনি গণতন্ত্রের প্রতি প্রবল আস্থাশীল তা মোদিজির অতি বড় যে ভক্ত, সেও শুনলে আড়ালে হাসবে। আন্তর্জাতিক স্তরে নরেন্দ্র মোদির বন্ধু তালিকা দেখুন। আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইসরায়েলের নেতানিয়াহু। ব্রাজিলের বলসোনারো। কেউ বর্তমান, কেউ প্রাক্তন। কিন্তু সবাই স্বৈরাচারী তা নিয়ে সন্দেহ নেই। আমাদের মোদিজির, নিজেরও গণতন্ত্র শব্দে বেজায় অ্যালার্জি।

ছলে-বলে-কৌশলে দিল্লির তখত দখল যদি একমাত্র এজেন্ডা হয়, তাহলে বিপদ আছে। যে যাই বলুক ইভিএম মেশিন হ্যাক করা এখন কোনো সমস্যাই নয়। ভারতের মতো বিশাল দেশে নির্বাচন জিততে মানি, মাসল পাওয়ার আর মাফিয়া এই তিনের গুরুত্ব অপরিসীম। তিনটি ক্ষেত্রেই বিজেপির ধারেকাছে অন্য কোনো দল নেই। মোদি সরকার এই কয়েক বছরে গণতন্ত্রের সমস্ত কাঠামো সযত্নে এমনভাবে ভেঙেছেন যাতে মিডিয়া, বিচারব্যবস্থা, এমনকি নির্বাচন কমিশন পুরোপুরি নিরপেক্ষ, তা হলপ করে বলতে পারব না। ভোটে জিততে আরএসএস, বিজেপি কখন কী কৌশল নেবে তা আন্দাজ করা ঈশ্বরের অসাধ্য। উগ্র জাতীয়তাবাদের আবেগ থেকে নির্দিষ্ট এলাকায় অশান্তি সৃষ্টি করা, কোনো কিছু ঘটলেও অবাক হব না। আজ যে ১০২টি আসনে নির্বাচন হচ্ছে, তার মধ্যে দক্ষিণ ভারত নেই বললেই চলে। তার কারণ বিজেপি জানে এখানে তাদের শক্তি সামান্য। ফলে কম জোর কেন্দ্রে পরীক্ষায় বসে, আগে নিজেদের শক্তিশালী জায়গায় পরখ করতে সক্রিয় আমাদের শাসকরা।

কিন্তু আলোচনা করতে করতে এই আমরাও যে মোদি চর্চায় চলে যাচ্ছি এর থেকে একটা সন্দেহ চলে আসেই যে, বিরোধী দল ধারে-ভারে দুর্বল বলেই অবচেতনে মোদিজির কথাই সামনে চলে আসছে। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে যে ইনডিয়া জোট তার পক্ষে কি আদৌ নরেন্দ্র মোদির হেভিওয়েট ক্যারিশমার মোকাবিলা করা সম্ভব! ধরেই নেওয়া হয়েছে ভোটে এবার সহজেই বিজেপি জিতবে। বিষয়টির অতি সরলীকরণ এখনই করবেন না। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে যেভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাতেও স্পষ্ট যে নরেন্দ্র মোদি কিঞ্চিৎ দুশ্চিন্তায় আছেন নিরঙ্কুশ সাফল্য নিয়ে।

প্রথম পর্যায়ে ভোটের আগে টিভি চ্যানেলগুলো যে সমীক্ষা দেখাচ্ছে তাতেও সেভাবে বিজেপির জয়জয়কারের ঘোষণা নেই। বলা হচ্ছে, বিজেপি কোনোভাবেই ২২০ আসনের বেশি পাবে না। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ২৭৩ সিট পেতেই হবে। আসলে বিরোধী দলকে দুর্বল মনে হলেও রাজ্যে রাজ্যে জোট কার্যকর হতে পারে। লড়াইটা মূলত এবার বিজেপি বনাম ইনডিয়া জোটের। বলতে পারেন একক দল বনাম জোট রাজনীতির। বিজেপি জিতলে ভারতের ফেডারেল কাঠামো বিপন্ন হতে পারে। শাসক দলের আর একটি সমস্যা, বিভিন্ন প্রদেশে তাদের অন্তর্কলহ।

ছলে-বলে-কৌশলে বিজেপি জিততে কোন পথ নেবে বলা মুশকিল। হারের সম্ভাবনা দেখলে সে সব করতে পারে। কিন্তু এখনই ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলা মূর্খামি। তবুও ৪০০ দূরে থাক, বিজেপির জয়রথ ২০০/২৫০-এ থেমে গেলে অবাক হব না। দক্ষিণ ভারতে এমনিতেই বিজেপি কোণঠাসা। গো-বলয়ে, বিজেপির শক্ত ঘাঁটিতে ইতিমধ্যেই তাদের অন্তর্কলহ চরম আকার নিয়েছে। পশ্চিম ভারতে জাঠ, উত্তর প্রদেশের কিছু জায়গায়, গুজরাট, মহারাষ্ট্র ও অন্যান্য কিছু রাজ্যে জাঠ, ক্ষত্রিয়রা বিজেপি হটাও আওয়াজ তুলেছে। ফলে মেইনস্ট্রিম মিডিয়া যাই বলুক, বিজেপি খুব একটা স্বস্তিতে নেই।

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত