বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

রাসুলের জীবনধারা অনুসরণের লাভ

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৪, ১২:২৫ এএম

মানুষের জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা খুবই জরুরি। লক্ষ্য নির্ধারণের আগে আরও বেশি জরুরি হলো অনুসরণ-অনুকরণের জন্য কোনো আদর্শ ব্যক্তিকে বেছে নেওয়া। আমাদের দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অপরিণামদর্শী যুব সমাজ অনুকরণীয় আদর্শ ব্যক্তিত্ব বেছে নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। আমাদের সমাজের অনেক তরুণ-তরুণীকে প্রশ্ন করা হলে তাদের কেউ কেউ বলেন যে, অমুক চিত্রতারকা বা খেলোয়াড় তার আদর্শ এবং তিনি বড় হয়ে সে রকম কিছু হতে চান!

অন্যদিকে মাইকেল এইচ হার্টের মতো পশ্চিমা চিন্তাবিদরা স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন যে, রাসুল (সা.) ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী মহামানব। তাই তরুণ ও যুব সমাজের সামনে অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে সর্বকালের সর্বসেরা মহামানব মুহাম্মদ (সা.) এবং তার জীবনের নানা দিক যথাযথভাবে তুলে ধরতে হবে। রাসুল (সা.) কেবল জীবনের কোনো একটি অংশ বা দিকের জন্য আদর্শ ছিলেন না, বরং তিনি শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও সব পর্যায়ের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ।

শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) যেমন ছিলেন পরিপূর্ণ মানুষ, তেমনই ছিলেন একজন পরিপূর্ণ আদর্শ যুবক। পৃথিবীতে যত ভালো গুণ আছে এর সব গুণের সমাবেশ ঘটেছিল মুহাম্মদ (সা.)-এর মধ্যে। এক কথায়, তিনি ছিলেন সর্বগুণের আধার। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।’ -সুরা কালাম ৪

ফরাসি লেখক আলফ্রেড তার তুর্কির ইতিহাস বইয়ের প্রথম খণ্ডে লিখেছেন, ‘দার্শনিক, বক্তা, ধর্ম প্রচারক, যোদ্ধা, আইন রচয়িতা, ধর্মমত ও ধর্ম পদ্ধতির সংস্থাপক মুহাম্মদ (সা.)-কে মানুষের মহত্ত্বের যতগুলো মাপকাঠি আছে তা দিয়ে মাপলে, কোনো লোক তার চেয়ে মহৎ হতে পারবে না।’ পূর্ণতা পেতে হলে যুব সমাজকে অবশ্য অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে মহানবীর জীবনধারা।

দেখুন, মুহাম্মদ (সা.) যৌবনে পদার্পণ করে চরম নোংরা পরিবেশে লালিত-পালিত হয়েও নিজের যৌবনকে কলঙ্কমুক্ত রাখতে সক্ষম হন। যে সমাজে অবৈধ প্রেম, কুদৃষ্টি বিনিময় ও ব্যভিচার যুবকদের জন্য ছিল গর্বের ব্যাপার, সে সমাজে এ অসাধারণ যুবক নিজের দৃষ্টিকে কলুষিত হতে দেননি। যেখানে অলিগলিতে ছিল মদ তৈরির কারখানা এবং ঘরে ঘরে ছিল পানশালা, বসত মদ পরিবেশনার মাধ্যমে জমজমাট কবিতা পাঠের আসর, সেখানে এ যুবক কখনো এক ফোঁটা মদও মুখে তোলেননি। যেখানে জুয়া জাতীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল, সেখানে আপাদমস্তক পবিত্রতায় মণ্ডিত এ যুবক জুয়া স্পর্শ করেননি। নষ্ট গান-বাজনা যেখানে সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেখানে তিনি এসব অপসংস্কৃতির ধারেকাছেও ঘেঁষেননি। তাই তার জীবনের শৈশব-কৈশোর, যৌবন-বার্ধক্য প্রতিটি মুহূর্তেই তিনি ছিলেন সমগ্র মানবতার জন্য উত্তম আদর্শ। তাইতো মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসুলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।’ -সুরা আহজাব ২১

ইতিহাস সাক্ষী, কোনো একটি দেশের যুব সমাজকে যথাযথভাবে দিকনির্দেশনা দেওয়া হলে তারা সেই দেশের সবক্ষেত্রেই গড়ে তুলতে পারে সাফল্যের অনন্য কীর্তিগাথা। সমাজ সংস্কারেও যুব সমাজ রাখতে পারে অগ্রণী ভূমিকা। যেমনটি মুহাম্মদ (সা.) তরুণ বয়সেই হিলফুল ফুজুল নামক সংগঠনে যোগ দিয়ে সমাজ সংস্কার ও সমাজ সেবায় অসাধারণ ভূমিকা পালন করে সবার শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। ওই সংগঠনের সদস্যরা দেশ থেকে অশান্তি দূর করার, পথিকের জানমালের হেফাজত করার, অভাবগ্রস্তদের সাহায্য দেওয়ার, অত্যাচারিতের সহায় হওয়ার এবং কোনো অত্যাচারীকে মক্কায় আশ্রয় না দেওয়ার অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়েছিলেন। হিলফুল ফুজুল গঠন এবং তার পরই কুরাইশ নেতার কাছ থেকে বহিরাগত এক অত্যাচারিতের অধিকার আদায়ের ঘটনায় চারদিকে তরুণ মুহাম্মদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সবার মুখে মুখে তিনি ‘আল আমিন’ তথা বিশ্বস্ত ও আমানতদার বলে অভিহিত হতে থাকেন। অল্পবয়সী হওয়া সত্ত্বেও কেউ তার নাম ধরে ডাকত না। সবাই শ্রদ্ধাভরে তাকে ‘আল আমিন’ বলে ডাকত।

রাসুল (সা.) যুবক বয়সেই সমাজে ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন। ব্যবসায়ী হিসেবেও তিনি আদর্শ সৎ হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। যৌবনেই তিনি হয়েছিলেন আদর্শ স্বামী এবং কোনো অসৎ ব্যক্তিকে কখনো বন্ধু হিসেবে বেছে নেননি। রাসুল (সা.) তার অনুপম চরিত্র, ন্যায়বিচার ও সংগ্রামী জীবনধারার মাধ্যমে আদর্শ ইসলামি সমাজের ভিত গড়ে দিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। কিন্তু আমাদের জন্য রেখে গেছেন জীবন বিধান হিসেবে ইসলাম, আর পাথেয় হিসেবে কোরআন ও সুন্নাহ।

দুনিয়ায় মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি। এ হিসেবে আদর্শ মানব সমাজ গড়া ও ইসলামি শিক্ষাকে তুলে ধরার দায়িত্ব সবাইকে পালন করতে হবে। জনগণকে চিন্তাগত ও নৈতিক বিচ্যুতি থেকে মুক্ত রাখার জন্য খাঁটি ইসলামি আদর্শের কোনো বিকল্প নেই। যুব সমাজও এর ব্যতিক্রম নয়। যুব সমাজসহ আমাদের সবার প্রতিটি আচার-আচরণ, সামাজিক প্রথা ও কর্মকাণ্ডকে গড়ে তুলতে হবে ইসলামি আদর্শের আলোকে। পার্থিব জীবনের সমস্ত অনিষ্টতা, অনাচার, দোষত্রুটি, কলঙ্ক ও কদর্যতা থেকে বেঁচে থাকতে হবে।

মনে রাখতে হবে, ইসলামি আদর্শ বিশেষ কোনো যুগ ও দেশের জন্য সীমিত নয়। সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিসহ জীবনের সবক্ষেত্রে রয়েছে ইসলামের শ্রেষ্ঠ দিকনির্দেশনা। যুব সমাজের কাছে এসব বিষয়ে ইসলামের দিকনির্দেশনা শৈশব থেকেই পর্যায়ক্রমে তুলে ধরতে হবে। ইসলামের নানা দিক সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে হবে। সামাজিক মাধ্যমসহ হাজারো মাধ্যম যখন যুব সমাজের মন মগজ বিগড়ে দেওয়ার জন্য কাজ করছে, তখন শান্তির বার্তা নিয়ে পরকালে মুক্তির লক্ষ্যে এসব মাধ্যমকেও ইসলাম তথা রাসুল (সা.)-এর আদর্শ ও শিক্ষা প্রচারে সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগাতে হবে। এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে প্রতিটি মুমিন মুসলমানকে। আল্লাহ সবাইকে সেই তওফিক দান করুন। আমিন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত