বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আন্দোলন পুনর্বিন্যাস চায় বিএনপির শরিকরা

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৪, ০২:২২ এএম

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকারবিরোধী জোরালো কোনো কর্মসূচি না থাকায় অনেকটা হতাশ বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে থাকা সমমনা দলগুলো। হতাশা কাটিয়ে কৌশল পরিবর্তনের মাধ্যমে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে চান এসব দলের নেতারা।

দীর্ঘদিন ধরে চলা সরকার পতন আন্দোলনে কাক্সিক্ষত ফল না আসায় এর মধ্যেই নিজেদের মধ্যে কৌশলগত পরিবর্তন নিয়ে চলছে নানা পর্যালোচনা। রাজপথে বিগত দিনের কর্মসূচিগুলো মূল্যায়ন এবং এর ভিত্তিতে আগামীতে জোরদার আন্দোলনে গেলে কোন ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে, কাক্সিক্ষত ফল পেতে কত সময় লাগবে, তা নিয়ে চলছে নানান বিশ্লেষণ।

সমমনা দলগুলোর নেতাদের মত হচ্ছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে আন্দোলন চাঙ্গা করতে হবে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। সেটি সম্ভব না হলে পাঁচ বছরের জন্য সরকার ক্ষমতায় থেকে যাবে। বিভিন্ন আলোচনায়, আলাপে ঘুরেফিরে সমমনা দলগুলোর নেতারা আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা বিএনপিকে এমন পরামর্শ দিচ্ছেন। তারা মনে করেন, জুনের মধ্যে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ইস্যুটি সামনে নিয়ে ছক কষা উচিত।

জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্দোলনটা পুনর্গঠন করা দরকার। আমাদের মধ্যে এটা নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। তবে চূড়ান্ত হতে সময় লাগবে। আমরা চাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন। সেটা আজ বা কাল হোক অথবা মধ্যবর্তী নির্বাচন হোক।’

জোটের এ নেতা মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে এর আগেও কথা বলেছেন। চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি ‘গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ভোটের অধিকার চাই’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে মান্না বলেছেন, ‘শুনেছি মার্কিন কর্মকর্তারা নাকি সরকারের সঙ্গে কথা বলছে মধ্যবর্তী নির্বাচন দেওয়ার জন্য। এরকম শুনলে তো ভালোই লাগে। তাই আমাদের যুগপৎ আন্দোলন চলছে, চলবে। যখন সবাই মিলে রাজপথে নামবে তখন যেতে বাধ্য হবে।’

গত ১ এপ্রিল বিকেলে রাজধানীর বিজয় নগরে বিজয়-৭১ চত্বরে এবি পার্টির গণ-ইফতারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির সমমনা আরেক দল জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মহাসচিব আহসান হাবিব লিংকন বলেন, ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি অবাধ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে হবে। আপনারা দোয়া করবেন, এ বছরই যেন এই সরকারের শেষ বছর হয়।’

বিভিন্ন সূত্র বলছে, রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ করে কূটনৈতিকপাড়ায় মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে প্রথম কিছুটা আলাপ-আলোচনা হয়। মধ্যবর্তী নির্বাচন ধারণাটি তুলে ধরেন সুশীল সমাজের কিছু ব্যক্তি। তাদের মূল দাবি হলো, গত ৭ জানুয়ারি যে নির্বাচন হয়েছে সেটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। নির্বাচনটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) ও ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিক ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) তাদের সুপারিশেও এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাই বর্তমান বাস্তবতায় একটি নতুন নির্বাচন করা জরুরি বলে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন। পশ্চিমা বিশ্বের কোনো কোনো কূটনৈতিকও এই মতের সঙ্গে একমত পোষণ করছেন। যদিও পশ্চিমা কোনো দেশই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের বক্তব্য সমর্থন করে কোনো কথা বলেননি।

গত ৭ জানুয়ারির ভোট নিয়ে ১৭ মার্চ এনডিআই-আইআরআইয়ের কারিগরি পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সংসদ নির্বাচনে দেশব্যাপী কার্যকর নির্বাচনী প্রতিযোগিতা অনুপস্থিত ছিল। নাগরিক অধিকারের চর্চা, বাক-স্বাধীনতা ও সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতার চর্চা সংকুচিত হওয়াসহ নানা কারণে ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের গুণগত মান ক্ষুন্ন হয়েছে।’ অন্যদিকে ইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘৭ জানুয়ারির নির্বাচন আন্তর্জাতিকমানের হয়নি। ছিল না কোনো প্রকৃত প্রতিযোগিতা।’

বিএনপির নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পর যতগুলো স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়েছে তাতে আন্দোলনের দুটি ধারায় মতামত দেখা গেছে। একটি ধারা চাইছে এখন এভাবেই সাধারণ কর্মসূচি দিয়ে সময়ের জন্য অপেক্ষা করা। কারণ বিএনপির অনেক নেতাকর্মী এখনো কারাগারে। তাদের মুক্তির আগে আবার বড় আন্দোলনে গেলে নতুন করে গ্রেপ্তার শুরু হবে। আরও অনেক নেতাকর্মীকে জেলে যেতে হবে। আরেকটি ধারা চাইছে, সরকারবিরোধী জোট ও জোটের বাইরে কিন্তু আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে, এমন সব দল মিলে একটি ডেটলাইন ঠিক করে সর্বাত্মক কর্মসূচিতে যাওয়া। তবে বিএনপি কোন ধারায় যাবে তা স্পষ্ট হতে অন্তত জুন-জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে ওই নেতাদের দাবি।

বিএনপি নেতারা সমমনা দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলছেন, নির্বাচনের আগের আন্দোলনে স্পষ্ট হয়েছে যে, সংগঠন শক্তিশালী করা না হলে আন্দোলনে সফল হওয়া সম্ভব হবে না। যার যার সংগঠন পুনর্গঠন ও চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন পুনর্গঠন করতে হবে। দুর্বলতা কোথায় তা খুঁজে মেরামত করা দরকার।

একটি সমমনা দলের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পেছনে নেতৃত্বে দুর্বলতা রয়েছে কি না, তা মূল্যায়ন করা দরকার। এখানে মূল দল তো বিএনপি। তাদের নেতৃত্বে কোনো সংকট রয়েছে কি না, সেটা খোলাসা করতে হবে। আমাদের মধ্যে কিছু আলোচনা হয়েছে। আরও হবে।’

অবশ্য বিএনপির দুই নেতা বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের ২০ হাজার নেতাকর্মীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ফলে আন্দোলন এগিয়ে নেওয়া কঠিন ছিল। এ ছাড়া বিএনপি বা সমমনাদের পক্ষ থেকে নির্বাচন প্রতিহত করার কথা বলা হয়নি, বর্জনের কথা বলা হয়েছিল। দেশের মানুষ নির্বাচন বর্জন করেছে বলে তারা মনে করেন।

এখন ঝড়ের পরের নীরবতা চলছে মন্তব্য করে ওই নেতারা বলেন, তারা প্রচণ্ড চাপের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। তাই এখন একটু দম নিচ্ছেন। আন্দোলন অবশ্যই পুনর্গঠন হবে। সেটা নিয়েই কাজ করছেন তারা। সাধারণ মানুষের ইস্যু নিয়ে নতুন করে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের লড়াইয়ের নতুন নতুন কৌশল খুঁজে পেতে হবে। যে কৌশলের মধ্য দিয়েই জনবিচ্ছিন্ন শেখ হাসিনা সরকারকে বিতাড়িত করে আমাদের বাঁচতে হবে, দেশটাকে এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করতে হবে। সেই জরুরি কাজটা করতে গেলে আমাদের সততা নিষ্ঠার দরকার আছে। সেই সততা নিষ্ঠা নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য সরকারকে বাধ্য করতে হবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত