রবিবার, ২৬ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ফরিদপুরে ২ শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:২৭ এএম

ফরিদপুরের মধুখালীতে একটি মন্দিরের প্রতিমায় আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে জড়িত সন্দেহে কয়েকজন নির্মাণশ্রমিককে মারধর করেছে গ্রামবাসী। তাতে দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া পিটুনিতে গুরুতর আহত হয়েছেন আরও পাঁচ নির্মাণশ্রমিক, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ডুমাইন ইউনিয়নের পঞ্চপল্লী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, পঞ্চপল্লী গ্রামের মন্দিরে প্রতিমার শাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। মন্দিরের পাশেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শৌচাগার নির্মাণের কাজে নিয়োজিত ছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। শাড়ি পোড়ানোর ঘটনা ওই শ্রমিকরা ঘটিয়েছেন এমন সন্দেহের বশে তাদের ওপর হামলা হয়।

তবে এ ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকীকে আহ্বায়ক করে তিন সদসের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে তিন দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

নিহত শ্রমিক আশরাফুল (২১) ও আশাদুল (১৫) আপন দুই ভাই। তারা মধুখালী উপজেলার নওয়াপাড়া ইউনিয়নের চোপেরঘাট গ্রামের শাহজাহান খানের ছেলে।

এ ঘটনায় গোটা এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় বিপুলসংখ্যক আর্মড পুলিশ, পুলিশ ও র‌্যাব মোতায়েন রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ফরিদপুরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে চার প্লাটুন বিজিবি ও আর্মড পুলিশ টহলে রয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ডুমাইন ইউনিয়নের নিভৃত গ্রাম পঞ্চপল্লী। এই গ্রামের পঞ্চপল্লী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সম্প্রসারণকাজে নিয়োজিত ছিল বেশ কয়েকজন নির্মাণশ্রমিক। তারা স্কুলের দুটি বাথরুম নির্মাণের কাজ করছিল। স্কুলের পাশের একটি কালীমন্দিরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর প্রতিমার গায়ে আগুন দেওয়ার অভিযোগে স্কুলে থাকা নির্মাণশ্রমিকদের ওপর বিক্ষুব্ধ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায়। এ সময় শ্রমিকেরা প্রাণ বাঁচাতে স্কুলের একটি কক্ষে আশ্রয় নিলে স্কুলের গ্রিল ও দরজা ভেঙে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা নির্মাণকাজের মালামাল আনার জন্য একটি নসিমন আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।

হামলার খবর পেয়ে প্রথমে মধুখালী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করলে গ্রামবাসী তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও মাগুরা জেলা পুলিশ এবং র‌্যাবের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে গেলে তাদের ওপরও চড়াও হওয়ার চেষ্টা করে গ্রামবাসী। এ সময় গ্রামবাসী পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হন। সন্ধ্যার পর থেকে টানা ৬ ঘণ্টা পুলিশ সদস্যদের অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে রাত ১টার দিকে জেলা প্রশাসক কামরুল আহসান তালুকদার ও পুলিশ সুপার মোর্শেদ আলমের নির্দেশে পুলিশ ২৩৭ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে গ্রামবাসীদের সরিয়ে দিয়ে স্কুলের ভেতর থেকে ৭ নির্মাণশ্রমিককে উদ্ধার করে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মধুখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায়। হাসপাতালে আনার পথে আশাদুল ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার ভাই আশরাফুল মারা যায়।

আহত ৫ শ্রমিকের মধ্যে দুজনকে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও অপর তিনজনকে মধুখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রাখা হয়েছে। এ ঘটনার পর পঞ্চপল্লী গ্রামে বিপুলসংখ্যক পুলিশ-র‌্যাব মোতায়েন রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে পুলিশ, র‌্যাব ও আর্মড পুলিশের পাশাপাশি চার প্লাটুন বিজিবি টহলে রাখা হয়েছে।

কালীমন্দিরের নারী সেবাইত তপতী মন্ডল বলেন, ‘সন্ধ্যায় কালীমন্দিরে আলো জ্বালিয়ে বাড়ি চলে যাই। যাওয়ার সময় দেখি মন্দিরের পাশে স্কুলের শ্রমিকেরা নিজেদের মধ্যে চিৎকার-চেঁচামেচি করছে। পরে শুনি মন্দিরে আগুন লেগেছে। দ্রুত এসে কালী মায়ের শরীরে থাকা কাপড়ের আগুন নেভাই। পরে গ্রামবাসী জড়ো হয়ে শ্রমিকদের ওপর হামলা চালায়। এরপর কী হয়েছে, আমি জানি না। কারা আগুন দিয়েছে তা-ও আমি দেখিনি।’

স্কুলের নির্মাণকাজের ঠিকাদার মনজিল শেখ বলেন, ‘সন্ধ্যার পর শ্রমিকেরা আমাকে ফোন করে জানায়, স্কুলের পাশে মন্দিরে কে বা কারা আগুন দিয়েছে। তারা মন্দিরে গিয়ে আগুন নেভানোর কাজ করে। এরপর উত্তেজিত গ্রামবাসী শ্রমিকদের স্কুলকক্ষে আটকে রেখেছে বলে জানানো হয়।’

ডুমাইন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান তপন জানান, পাঁচ গ্রাম নিয়ে পঞ্চপল্লী। এলাকাটি হিন্দু-অধ্যুষিত।

ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. মোর্শেদ আলম বলেন, ‘কালীমন্দিরে আগুন দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগে স্কুলের নির্মাণকাজে থাকা শ্রমিকদের ওপর হামলা চালানো হয়। পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। কিন্তু গ্রামবাসী পুলিশকে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে ফরিদপুর, মাগুরা, রাজবাড়ী থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ও র‌্যাব পাঠানো হয়। পুলিশ বেশ কিছু ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরিস্থিতির যাতে অবনতি না হয়, সে জন্য ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।’

জেলা প্রশাসক মো. কামরুল আহসান তালুকদার বলেন, ঘটনাটি কেউ যাতে ভিন্ন খাতে না নিতে পারে, সে জন্য প্রশাসন সতর্ক রয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত