বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ৯ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আইনের জন্য মানুষ নাকি মানুষের জন্য আইন?

আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১০:২৪ পিএম

‘ব্রেথ’ নামে আমাজন প্রাইমে একটা ভারতীয় ওয়েব সিরিজ ২০১৮ সালে মুক্তি পায়। সবদিক দিয়েই শ্বাসরুদ্ধকর এই সিরিজের মূল থিম হচ্ছে এক বাচ্চার লাং খুব দুর্বল এবং ওকে বাঁচাতে হলে অতি দ্রুত একজম লাং ডোনার খুঁজে বের করতে হবে। বাচ্চাটির মরিয়া পিতা খবর নিয়ে জানতে পারেন, লাং রিসিভের তালিকায় বাচ্চাটি চার নম্বরে আছে। তার মানে অন্তত পাঁচজন ডোনার খুঁজে পেতে হবে। কিন্তু যদি এতদিন বাচ্চাটা না বাঁচে? তাহলে উপায়?

উপায় হচ্ছে, রিসিভার তালিকার উপরের দিকে থাকা তিনজন মরে যাওয়া। ওরা মরে গেলে বাচ্চাটা সবার আগে পাবে এবং বেঁচে যাবে। বাচ্চাটার বাবা তাই পরিকল্পনা করে ওদের মেরে ফেলার। ভারতীয় এই সিরিজের মতো দেশ-বিদেশে আরো এমন অনেক সিনেমার চিত্রনাট্য দেখা যায়। একটা চাকরির জন্য, নিজের পরিবারকে বাঁচানোর জন্য একটার পর একটা খুন করার ঘটনা। প্রচণ্ড নিষ্ঠুর এবং অবাস্তব মনে হচ্ছে? বাস্তব এরকমই। প্রয়োজনীয়তা মানুষকে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য করে তোলে।

সিনেমায় খুনের ব্যাপারগুলো হয়তো কিছুটা বাড়াবাড়ি, কিন্তু প্রতিযোগিতা যখন তীব্র হয় তখন অবস্থাটা এইরকমই দাঁড়ায়। আর দারিদ্র্যর অন্যতম অভিশাপ হচ্ছে এই প্রতিযোগিতায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলা।

মার্কিন বিহেভেরিয়াল সায়েন্টিস্ট সেন্ধিল মুলাইনাথন তার বিখ্যাত বই স্কারসিটিতে এই ব্যাপারটাকেই বলেন ‘টানেল ভিশন’। একটা আধুনিক রাষ্ট্র কিংবা সুশাসনের সমাজের মূল কাজই হচ্ছে এই প্রতিযোগিতাকে কমিয়ে আনা। সকলের জন্য নায্যতা নিশ্চিত করা, নাগরিকের জন্য যথেষ্ঠ পরিমাণ সুযোগ রাখা যাতে সে আইন ভাঙতে উদবুদ্ধ না হয়। 

কিছুদিন আগে গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক ছবিতে দেখা যায়, উঁচু রাস্তা পারাপারের জন্য কিছু লোক মই ভাড়া দিচ্ছে। খবরটা দেখে, তথাকথিত সচেতন নাগরিকেরা ক্ষেপে-টেপে অস্থির। কেন লোকজন ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার করছে না, কেন এইভাবে ‘আইন ভাঙছে’। 

পরে দেখা গেল যে ফুটওভারব্রিজ অনেকটাই দূরে। আর বাসগুলো এমন যথেচ্ছাচার করে যে লোকজন বাধ্য হয়েই ওভাবে পার হয়। তর্কের খাতিরে ধরেই নিলাম ‘সুনাগরিকরা’ অনেক দূরের ঐ ফুটওভারব্রিজ দিয়েই পার হবেন। যেমনটা এদেশের শারীরিক প্রতিবন্ধী, বয়স্ক মানুষ, শিশু এবং গর্ভবতীদের থেকেও আশা করা হয়। সুনাগরিক হবার দায় যেন শুধু নাগরিকের, ব্যাপারটা যেন যান্ত্রিক, একপেশে।

বরং প্রশ্নটা হওয়া উচিত, আইনের জন্য মানুষ নাকি মানুষের জন্য আইন? পরেরটা যদি হয়, তবে সুনাগরিক হতে পারাটাও অনেক সহজ। আর যদি মানবিক বিবেচনা, মানুষের সুবিধা অসুবিধা চিন্তা না করে যন্ত্রের মতো মুখস্থ আইন বানানো হয় তবে মানুষ তা ভাঙতে যাবেই।

কারণ সেই আইন মানায় না আছে পুরস্কার না আছে আইন ভাঙায় কোনো শাস্তি। এমনকি আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের কলকাতায় যারা গেছেন তারা জানেন যে, নো এন্ট্রি লেখা রাস্তায় গভীর রাতেও ট্যাক্সিচালকেরা প্রবেশ করেন না। অন্যদিকে আমাদের এইখানে ট্রাফিক আইন ভাঙা একটা ‘হেডমের’ ব্যাপার। ‘আমি কে চিনস’? বলে ট্রাফিকের সঙ্গে চোটপাট করা ক্ষমতা প্রদর্শনের নিয়মিত চিত্র। 

অবশ্য এই ‘আমি কে চিনস’ মনোভাব শুধু রাস্তায় নয়, তা সর্বত্রই। কেতাবে প্রচুর শক্ত শক্ত আইনের কথা থাকলেও প্রয়োগের বেলায় ঠনঠন। সোজা কথায় বললে, জংগুলে ব্যবস্থা, জোর যার মূলুক তার। ফলে যার জোর নাই সে সুড়ুৎ করে ভিড়ের রাস্তার মাঝখান দিয়ে দৌড় দেবে। ভিড়ে বাসে নারী, শিশুর ও প্রতিবন্ধীদের আসন দখল করে বসে পড়বে। চরদখল বা দেশলুটের ক্ষমতা নাই বলে যে হতাশা তা হয়তো একটু মিটিয়ে নিবে।

গতকাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের এক দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে আবারো সামাজিকমাধ্যম উত্তপ্ত। উনি স্টপেজ ছাড়া এক স্টেশনে নামতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন। যদিও যারা ওই এলাকার মানুষ বা নিয়মিত রেলে চড়েন তারা সকলেই জানেন যে, ওই জায়গাটা অলিখিত স্টপেজ। ট্রেন নিয়মিত অল্প সময়ের জন্য থামে। প্রফেসর আনু মুহাম্মদ অন্য অনেকের মতোই সেই সুযোগটাই নিতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছেন। 

অবশ্য উনার বিরোধীরা ব্যাপারটাকে নিয়ে জঘন্য তামাশায় লিপ্ত হয়েছেন। সফেদ পোশাকে হালকা দাগ পড়লেই তা বোঝা যায়, প্রফেসর আনুর বেলাতেও তা-ই হয়েছে। উনার নির্লোভ জীবন ও আদর্শের কারণে তার মলিনতা না পেয়ে সামান্য এই বিচ্যুতিকেই বড় করে দেখানোর জংলি উৎসব চলছে। অবশ্য এদের ব্যাপারটাও বুঝতে হবে, প্রফেসর আনু বড়মাপের মানুষ হলেও উনাকে আক্রমণ করলে কোনো ভয় নাই। দেশ লুট যারা করে, যারা সবসময় আইনকে বৃদ্ধাংগুলি দেখায়, তাদের আক্রমণ করলে পাল্টা আঘাতের ভয় তো থাকেই। আবার এইসব সমালোচনাকারীদের মনের গহীনে হয়তো ঐসব লুটেরাদের পায়ের তলায় গড়িয়ে কিছুমিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে। মুল্লাইনাথনের স্কারসিটির উল্লেখ করেছি, সেখানে তিনি দেখান যে অভাব গরীবের সাথে স্বভাব গরিবীও বাজে একটা অভিশাপ। 

তবে প্রফেসর আনু মুহাম্মদের দুর্ঘটনায় এই বমন উদ্রেককারী আক্রমণের বাইরেও কিছু ব্যাপার সামনে তুলে আনে। রেলের স্টপেজ কি মান্ধাতার আমলের হিসাবে হওয়া উচিত নাকি মানুষের সুবিধার কথা ভেবে? আমাদের রাস্তাগুলো কি পথচারী এবং প্রান্তিক মানুষদের সুবিধার কথা ভেবেই বানানো উচিত না? সর্বোপরি আইন হওয়া উচিত দুর্বলকে রক্ষা এবং সকলের জন্য ন্যায্যতা নিশ্চিত করার জন্য। তাহলে দুর্ঘটনা কিংবা আইন ভাঙা দুই-ই অনেকাংশ কমিয়ে আনা যাবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত