মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

রাফায় পরাজয় হবে নেতানিয়াহুর!

আপডেট : ১৩ মে ২০২৪, ১২:১১ এএম

৩৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেও থামছেন না নেতানিয়াহু। বিশ্লেষকরা বলছেন এখন যুদ্ধ থামালে নির্বাচনে হেরে যাওয়ার ভয় আছে তার। এ অবস্থায় কী করবেন বাইডেন? বিভিন্ন সূত্র অবলম্বনে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

সাত মাসের বেশি সময় ধরে গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। ৩৪ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে তাদের হামলায়। উদ্বাস্তু হয়েছে আরও। বোমা ফেলতে ফেলতে অসহায়, নিরস্ত্র গাজার নারী-শিশুসহ লাখো মানুষকে তারা ঠেলে দিয়েছে সীমান্ত এলাকা রাফার দিকে। কিন্তু এখন নেতানিয়াহু বলছেন, সেখানেও হামলা চালাবে ইসরায়েল। তার এমন উন্মত্ত আচরণ ক্ষেপিয়ে তুলেছে বিশ্ববাসীকে। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নেমে এসেছেন রাস্তায়। ইসরায়েলের হামলা বন্ধের দাবিতে তারা প্রাণপণ লড়াই করে যাচ্ছেন। স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ তাদের বহিষ্কার করছে। তারপরও থামছেন না শিক্ষার্থীরা। বিশ দিনেরও বেশি সময় ধরে তারা বিক্ষোভ করছেন। এ অবস্থায় বেঁকে বসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও। তিনি বলেছেন, রাফায় ইসরায়েলে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো অস্ত্র সহায়তা দেবে না তাদের। তবে এ হুমকিতেও নরম হচ্ছে না নেতানিয়াহুর সুর। ইসরায়েলে তার নিজস্ব অস্ত্র দিয়ে হামলা অব্যাহত রাখবে বলে ঘোষণা তার প্রশাসনের। গত শুক্রবারও তিনি বলেছেন, রাফায় হামলার বিষয়ে তিনি বাইডেনকে বোঝাবেন।

নেতানিয়াহুর এ অবস্থানের সমালোচনা করেছেন দ্য গার্ডিয়ানে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতার অধ্যাপক মোহাম্মাদ বাজি। তার মতে, যুদ্ধ নেতানিয়াহুকে বাঁচিয়ে রাখছে। যুদ্ধ বন্ধ হলে শুধু নির্বাচনে হার নয়, ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলা, ঘুষ-দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে তাকে।

নেতানিয়াহুর ভয়

মোহাম্মাদ বাজি লিখেছেন, গত সোমবার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বিমান হামলার আগে রাফায় শহরে অবস্থানরত ফিলিস্তিনিদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। যার অর্থ দাঁড়ায় ইসরায়েল গাজার দক্ষিণতম শহরটিতে স্থল আক্রমণ শুরু করতে যাচ্ছে।  ইসরায়েলি হামলার মুখে এক প্রান্ত থেকে পালাতে পালাতে এ শহরে এসে আশ্রায় নিয়েছে এক দশমিক চার মিলিয়ন ফিলিস্তিনি। ইসরায়েলের ওই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর হামাস যে তারা মিসর এবং কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে সম্মত। কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং রাফায় আক্রমণের ও হামাসের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ বিজয় অর্জনের পরিকল্পনার দ্বিগুণ করেন। বাজির মতে, এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার, নেতানিয়াহু যুদ্ধের অবসান ঘটাতে চান না। তিনি ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার পর হামাসের হাতে বন্দি অবশিষ্ট জিম্মিদের মুক্তি এবং যুদ্ধবিরতির আলোচনা দুর্বল করতে চাইছেন। নেতানিয়াহু এবং তার চরমপন্থি সহযোগীরা ভয়ে আছে যে, একবার যুদ্ধ শেষ হলে হামাসের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার দায়ে সরকারি গোয়েন্দারা একাধিক তদন্তের মুখোমুখি হবে। বাজির মতে, নেতানিয়াহু এবং তার লিকুদ পার্টি আসন্ন নির্বাচনে হারতে পারে। একবার ক্ষমতার বাইরে চলে গেলে তাকে ঘুষ, জালিয়াতি এবং আস্থা লঙ্ঘনের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আগের সরকারের সময়ে দুর্নীতির অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। নেতানিয়াহু তার ব্যক্তিগত স্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রেখেছেন। তিনি ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী। ১৯৯৬ সাল থেকে একাধিক মেয়াদে ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করেছেন।

অবশ্য বাজি বলছেন, নেতানিয়াহু কেন ক্ষমতা আঁকড়ে ধরা এবং জবাবদিহি এড়াতে নির্মম যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করতে চাইছেন তা স্পষ্ট। কিন্তু নেতানিয়াহু এবং তার চরমপন্থি সরকারকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে জো বাইডেন কেন তার নিজের রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছেন তা কম স্পষ্ট। ৭ অক্টোবরের পর  মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলের প্রতি তার নিরঙ্কুশ সমর্থন ঘোষণা করেন এবং তেল আবিব সফরে নেতানিয়াহুকে উষ্ণ আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেন। তারপর থেকে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে ক্রমাগত বিব্রত এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। কয়েক মাস ধরে বাইডেন এবং তার শীর্ষ সহযোগীরা হতাহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যার বিষয়ে অভিযোগ করে জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু ইসরায়েল কূটনৈতিক বুদ্ধি খাটিয়ে মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত ও যুদ্ধ টিকিয়ে রাখে।  শেষ পর্যন্ত মনে হচ্ছে, নেতানিয়াহু বাইডেনের সব অনুরোধ অস্বীকার করতে প্রস্তুত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কতার পরও যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হয়ে রাফায় বড় স্থল আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েল। নেতানিয়াহু এবং তার মিত্ররা বিশ্ববাসী ও ইসরায়েলি জনসাধারণের কাছে এ মিথ বিক্রি করছে যে, তারা গাজায় সম্পূর্ণ বিজয় অর্জন করতে পারবে যদি চারটি হামাস ব্যাটালিয়নকে ধ্বংস করতে পারে। যারা রাফায় লুকিয়ে আছে। নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে বলেছিলেন, ‘আমরা রাফায় প্রবেশ করব এবং সেখানে হামাস ব্যাটালিয়নদের নির্মূল করব’।

বাইডেনের লাভ কী

বাইডেন নেতানিয়াহুর বেপরোয়া এবং অমানবিক নীতিকে আর সমর্থন করতে চান না বলে বাহ্যিকভাবে মনে হয়। শনিবার সর্বশেষ খবরে দেখা যায়, রাফায় হামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে ইসরায়েল। তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে না। শনিবার নিউ ইয়র্ক টাইমস জানাচ্ছে, ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারছে না তারা। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে মানবাধিকার রক্ষায় ইসরায়েলের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা রয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘে ফিলিস্তিনকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও অস্বীকার করেছে তারা। যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই ইসরায়েলকে সহায়তা করে আসছে। যার প্রেক্ষিতে ৩৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। অন্তত দেড় মিলিয়ন গাজাবাসী পালিয়ে অবস্থান করছে রাফায়। সেখানেও এখন হামলা করতে যাচ্ছে ইসরায়েল। মোহাম্মাদ বাজি বলেছেন, সাত মাস ধরে এই মৃত্যু এবং ধ্বংসকে সমর্থনের পর বাইডেন অবশেষে ইসরায়েলে মার্কিন অস্ত্রের চালান বন্ধের হুমকি দিয়েছেন এবং নেতানিয়াহুকে যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য করতে পারেন। নেতানিয়াহু প্রতিবার তাকে অবজ্ঞা এবং অপমান করা পরও বাইডেন অক্টোবর থেকে মার্কিন নীতি অপরিবর্তিত রাখেন। এমনকি তিনি কৃষ্ণাঙ্গ এবং আরব-আমেরিকান ও তরুণ প্রগতিশীল ভোটারদের সমর্থন হারানোর ভয়ও উপেক্ষা করেন। বাইডেন এই চক্র থেকে বের হতে পারবেন কি না তা সময়েই বলে দেবে।

এ বিষয়ে সিএনএন জানাচ্ছে, রাফায় ইসরায়েল হামলা করলে মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আলটিমেটাম হালকাভাবে আসেনি। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বাইডেনের কয়েক দফা ফোনালাপের পর এ ঘোষণা এসেছে। বাইডেনের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং তাদের ইসরায়েলি সমকক্ষদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভার্চুয়াল এবং ব্যক্তিগত বৈঠক হয় এ নিয়ে। বাইডেন এবং তার দল নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে বলেছিল যে, রাফায় মার্কিন অস্ত্র দিয়ে হামলা করা যাবে না। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা বলেন, এটি এমন একটি বার্তা, যা হোয়াইট হাউজ বিশ্বাস করে যে, ইসরায়েল ভালোভাবে বুঝতে পেরেছিল।

যদিও নেতানিয়াহু পাল্টা বলেন, আমাদের যদি একা দাঁড়াতে হয়, আমরা একাই দাঁড়াব। আমি বলেছি যে, প্রয়োজনে আমরা আমাদের নিজের শক্তিতে লড়াই করব। ইসরায়েলি কর্মকর্তারাও বাইডেনের ঘোষণার গুরুত্ব কমিয়ে আনার চেষ্টা করে। তাদের এক মুখপাত্র ড্যানিয়েল হাগারি বলেন, ইসরায়েলের কাছে ইতিমধ্যেই মিশনের জন্য (রাফায় হামলা) প্রয়োজনীয় অস্ত্র রয়েছে।

রাফায় পরাজয়?

রাফায় ইসরায়েল যখন হামলা করতে যাচ্ছে, তখন জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদের দাবিদার হিসেবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার সাধারণ পরিষদে এ প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি হয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১৯৩টি সদস্য দেশ রয়েছে। এর মধ্যে ১৪৩ দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। আর বিপক্ষে ভোট দেয় যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলসহ নয় দেশ। ভোটদানে বিরত ছিল ২৫ দেশ। আরেকটি আশার খবর জানাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা। দক্ষিণ গাজার রাফায় ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসন চলাকালে দক্ষিণ আফ্রিকা জাতিসংঘের শীর্ষ আদালতকে ইসরায়েলের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের দাবি জানিয়েছে। শুক্রবার হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দক্ষিণ আফ্রিকা ইসরায়েলকে অবিলম্বে রাফায় থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিতে আহ্বান জানিয়েছিল আদালতকে। 

তবে জাতিসংঘে এ প্রস্তাব পাস হওয়ার দিনে শুক্রবার সন্ধ্যায় উত্তর ও মধ্য গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় শিশুসহ অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়। উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরের কাসাসিব পাড়ায় বিমান হামলায় নিহতদের মধ্যে সাংবাদিক বাহা ওকাশা, তার স্ত্রী এবং ১২ বছর বয়সী ছেলে ছিলেন। সেখানকার এক হাসপাতালের পরিচালক হুসাম আবু সাইফিয়া সিএনএনকে জানান, জাবালিয়ায় পৃথক বিমান হামলায় আরও তিনজন নিহত হন। এরপর রাফায় হামলা চালাতেও উদ্যত ইসরায়েল।

আলজাজিরা জানাচ্ছে, কাতার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মিসরের মধ্যস্থতায় সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি আলোচনার পর ইসরায়েল ও হামাসের প্রতিনিধি দল কায়রো ছেড়ে যায়। হামাস যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। শুক্রবার তারা বলে, ‘বল এখন পুরোপুরি ইসরায়েলের হাতে’। আর ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি দেয়নি। হামাস শর্ত দেয় যে, একটি চুক্তির মধ্যে গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার, যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের প্রত্যাবর্তন এবং একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে বন্দি বিনিময় চুক্তি হবে। তবে তাদের এসব শর্ত ইসরায়েলের বেশ কয়েকটি ইস্যুর সঙ্গে বিরোধাত্মক।

তবে ইসরায়েল যে কারও আপত্তি আমলে নিতে চাইছে না তা এখন পরিষ্কার। শেষ পর্যন্ত যদি তারা রাফায় নির্বিচার হামলা চালায়, তাহলে কী ঘটবে। রাফায় এসে কি শেষ হবে না ইসরায়েলের হামলা? এরপর কোথায় তারা বোমাবর্ষণ চালাবে? শেষ পর্যন্ত এ যুদ্ধ থামাতে হবে তাদের। আরও অসংখ্য গাজাবাসীর মৃত্যু ছাড়া ইসরায়েলের প্রাপ্তি কী হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধ থামলেই বিপদে পড়বেন নেতানিয়াহু। এখানেই হয়তো তার পরাজয় লুকিয়ে আছে। নাকি নেতানিয়াহুর আস্তিনে আরও কোনো ঘটনা লুকিয়ে আছে, তা সময়েই বলে দেবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত