শুক্রবার, ৩১ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ষোলোয় মিলে কিংস সাফল্য!

আপডেট : ১৩ মে ২০২৪, ০৪:১৮ এএম

দেশে তারা অপ্রতিরোধ্য। গেল ছয় বছরেই সেটা প্রতিষ্ঠিত। আবির্ভাব থেকে শুরু করে টানা পাঁচ লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়া ছাড়াও তাদের সাফল্যের মুকুটে যুক্ত আছে বেশ ক’টি ফেডারেশন কাপ ও স্বাধীনতা কাপ। কেবল দেশসেরা হওয়া নয়, একটি এশীয় মানের ক্লাবে রূপ দিতে নীরবে শ্রম দিয়ে চলছেন একদল স্বপ্নবাজ মানুষ। যাদের কা-ারি হয়ে আছেন একজন ফুটবলপাগল মানুষ ক্লাব সভাপতি ইমরুল হাসান। অথচ এই করপোরেট ব্যক্তিত্ব একটা সংখ্যায় ভীষণ বিশ্বাসী। তার বিশ্বাস ১৬-র ছোঁয়ায় কিংস সাফল্য!

একটু অবাকই হবেন। তবে এই ১৬-র মাহাত্ম্য কিংসের জন্য অনেক। সাফল্যের ধারাবাহিকতায় অবাক হয়ে অনেকেই ইমরুল হাসানের কাছে জানতে চান রহস্য কী? প্রশ্নটা ছিল এই প্রতিবেদকেরও। কিংস সভাপতি যা বললেন, ‘অনেকেই জানতে চান সাফল্যে নেপথ্যে কী? আমরা বলি, ১৬-মিলেই আমরা সেরা। দেখেন মিলে কি না? মাঠে খেলে ১১ ফুটবলার, ১২ হলো সব কোচিং স্টাফ, ১৩ সব সাপোর্ট স্টাফ, ১৪ হলো আমিসহ ক্লাব ম্যানেজমেন্ট, ১৫- আমাদের মালিকপক্ষ আর সব শেষ ১৬ হলো আমাদের সমর্থকগোষ্ঠী। এই ১৬-তেই হয় সাফল্যগাথা। খেয়াল করে দেখবেন আমাদের কোনো খেলোয়াড়কেই ১৬ নম্বর জার্সি দিই না। দেবও না। ওটা সমর্থকদের শরীরেই শোভা পায়। তাছাড়া বসুন্ধরা কিংস ইংরেজিতে লিখতে লাগে ১৬টি অক্ষর। তাছাড়া আমাদের ক্লাবের আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরুও ২০১৬ সালে।’

১৬-র হিসাব না হয় মিলল, তবে কেবল সংখ্যা দিয়েই তো আর মেলেনি পাঁচ লিগ শিরোপা। মাঠে খেলেছেন ফুটবলাররা। তাদের প্রস্তুতি-পরিচর্যায় নিয়োজিত এক ঝাঁক কোচ। তাই বিজয়মাল্য বলুন কিংবা কাঁটার জ্বালা সবই বরাদ্দ কোচ-ফুটবলারদের জন্য। তবে কেবল মাঠের পারফরম্যান্সেই একটা দল সর্বজয়ী হয় না। নেপথ্যে কাজ করতে হয় অনেককে। ঠিক এখানেই অন্য সবাইকে ছাড়িয়ে বসুন্ধরা কিংস সেরা।

দেশের স্বনামধন্য শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন এই ক্লাবটি পরিচালিত হয় শতভাগ করপোরেট নিয়মে। বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকপক্ষ ক্রীড়ানুরাগী হওয়ায় ইমরুল হাসানের কাজটা সহজ হয়েছে অনেকটা। ক্লাবটিকে সেরা জায়গায় নিয়ে গেলে গ্রুপের লাভের দিকগুলোও সহজেই বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন। সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে খেলাধুলা, বিশেষ করে ফুটবল যে বড় নিয়ামক, সেটা বসুন্ধরার মালিকপক্ষ বুঝেছেন বলেই, এক্ষেত্রে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়েছেন। ইমরুল হাসানও সেটা বুঝতে পেরে গেল ছয় বছরে তিলে তিলে এই ক্লাবকে নিয়ে গেছেন শিখরে।

ইমরুল হাসান সাফল্যের অন্যতম কারণ হিসেবে দলীয় শৃঙ্খলাকে সামনে টেনে এনেছেন, ‘কেবল বড় বাজেটের দল গড়লেই শিরোপা আসবে না। আমাদের ক্লাবে খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিই। এ ব্যাপারে আমরা কিছুটা কঠোরও। তাতে খেলোয়াড়রা যেমন শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে অনেক বেশি ফিট থাকে এবং দলের প্রতি নিবেদনও থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে।’

ক্লাবের নেপথ্যে কাজ করা অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুরোপুরি করপোরেট ছাঁচে ঢেলে পরিচালিত হয় বসুন্ধরা কিংস। ইমরুল হাসানের নেতৃত্বে একটি নীতিনির্ধারণী পরিষদ সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে শুরু করে সামগ্রিক দেখভালের দায়িত্বে থাকেন। ফুটবলার-কোচদের মনোযোগ শতভাগ ফুটবলে রাখতে যেটা প্রয়োজন তার সবই পূরণ করেন এই মানুষগুলো।

কাজ বুঝে নেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার বীজটাও অনুজদের হৃদয়ে গেঁথে দিয়েছেন ইমরুল হাসান। বসুন্ধরা কিংসের নেপথ্যের কারিগরদের একজনের কথায়, ‘ইমরুল স্যারই আমাদের মধ্যে ফুটবলের নেশাটা ধরিয়ে দিয়েছেন। অথচ এই ক্লাব হওয়ার আগে আমাদের ফুটবল কিংবা ক্লাব ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না।’ বসুন্ধরা গ্রুপের ফাইন্যান্স বিভাগে কর্মরত এসএম ওয়াসিমউজ্জামান শুরু থেকেই দলের ম্যানেজারের দায়িত্বে আছেন। সংবাদ মাধ্যমের সামনে সহজে মুখ খুলতে চান না তিনি। তবে পাঁচে পাঁচ শিরোপার পর আর কথা না বলে পারলেন না। অনেক চাপাচাপির পর দেশ রূপান্তরকে বললেন,  ‘সবচেয়ে বড় কথা হলো আমরা আর দশটা ক্লাবের মতো কেবল দেশের ফুটবলেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না। আমরা চাই ক্লাবকে এশীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে।’

বসুন্ধরা গ্রুপের প্রধান কার্যালয় থেকেই মূলত পরিচালিত হয় ক্লাবের কর্মকা-। কোচ-খেলোয়াড় বাদে প্রায় ৫০ জনের একটা দল নেপথ্যে থেকে কাজ করে। এই দলের মূল দায়িত্ব খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। দেশের ফুটবল ক্লাবগুলোর বিরুদ্ধে মোটা দাগে অভিযোগ, খেলোয়াড়দের বেতন নিয়ে নয়ছয় করা। কিংস এই জায়গায়ও ব্যতিক্রম। ক্লাবের কো-ফাইন্যান্স সেক্রেটারি নুরূল আমিন শিকদার বলেন, ‘খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে আমরা শতভাগ পেশাদারি মনোভাবে কাজ করি। এখন পর্যন্ত আর্থিক লেনদেন নিয়ে কখনো কোনো খেলোয়াড় অভিযোগ তুলতে পারেনি। ইমরুল স্যারের নির্দেশনা মেনে খেলোয়াড়-কোচদের বেতন যেমন নিয়মমাফিক পরিশোধ করা হয়, আবার প্রতিদিনের ক্যাম্প খরচায়ও কোনো কার্পণ্য করা হয় না।’

সব কিছু ঠিকঠাক মিলছে বলেই শিষ্যদের নিয়ে সেরাটা দিতে আপত্তি নেই কোচ অস্কার ব্রুজনের। দেশের ফুটবলের সোনালি সময় ফেরানোর মূল লক্ষ্যে কাজ করা এই ক্লাবের সঙ্গে থাকতে পেরে ভীষণ তৃপ্ত ব্রুজোন বলেন, ‘দলের সাফল্য মূলত ক্লাব সভাপতির স্বপ্নের বাস্তব রূপ দেওয়া। এখানে এককভাবে কারও কৃতিত্ব নেই। ক্লাবটি দেশের ফুটবলের সোনালি সময় ফেরানোর ব্রত নিয়ে কাজ করছে। এতগুলো বছর কাটানোর পর এখন আমরা বুক ফুলিয়ে নিজেদের কিংস পরিচয় দিতে পারি। এটাই বলতে পারি, বসুন্ধরা কিংস এখন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বড় একটা অনুপ্রেরণার জায়গায় পৌঁছে গেছে। আর এ সব কিছুই হয়েছে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।’

ইমরুল হাসানের ১৬-তত্ত্ব থেকে শিক্ষা নিতে পারেন দেশের অন্য ক্লাবগুলো।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত