শুক্রবার, ৩১ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

লিফটে ৪৫ মিনিট আটকে রোগীর মৃত্যু

আপডেট : ১৩ মে ২০২৪, ০৪:২৭ এএম

বুকে ব্যথা নিয়ে গতকাল রবিবার সকালে গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়েছিলেন মমতাজ বেগম (৫০)। হাসপাতালের ১১তলায় মেডিসিন বিভাগে বুকের ব্যথায় কাতর তিনি। বেলা পৌনে ১১টার দিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ওই বিভাগের চিকিৎসকরা তাকে ৪তলায় হৃদরোগ বিভাগের সিসিইউতে পাঠান।

পরিবারের সদস্যরা মমতাজ বেগমকে নিয়ে দ্রুত লিফটে ওঠেন। কিন্তু লিফট ৯তলার মাঝামাঝি নামতেই বন্ধ হয়ে যায়। তারা ছাড়াও লিফটে ছিল শিশুসহ আরও ১০ থেকে ১২ জন। বন্ধ লিফটৈর ভেতর তখন বিভীষিকা। মমতাজ বেগম নিশ^াস নিতে না পেরে ছটফট করছেন। শিশুরা ভয়ে চিৎকার করছে।

লিফটে থাকা মমতাজ বেগমের মেয়ে মাকে বাঁচাতে লিফটম্যানদের ফোন দেন। কিন্তু লিফটম্যানরা উল্টো খারাপ ব্যবহার করেছেন বলে জানান তিনি। জানতে পেরে লিফটের বাইরে থাকা মমতাজের স্বামী সিঁড়ি বেয়ে একবার তিনতলা, আরেকবার পাঁচতলা গিয়ে সংশ্লিষ্টদের লিফট খুলতে কাকুতি-মিনতি করেন। কিন্তু কেউ কথা শোনেনি। নিরুপায় হয়ে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিলে ফায়ার সার্ভিস এসে উদ্ধার করে। কিন্তু ততক্ষণে বন্ধ লিফটে টানা ৪৫ মিনিট থাকার পর মৃত্যুবরণ করেন মমতাজ বেগম।

৪ মে গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক রোগী ১২তলা থেকে পড়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। এর ৮ দিন পর গতকাল লিফট বন্ধ হয়ে প্রাণ হারালেন মমতাজ বেগম। তিনি গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার বারিগাঁও গ্রামের শরীফ উদ্দীনের স্ত্রী।

এদিকে ঘটনা তদন্তে মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক রুবিনা ইসলামকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তিন কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া অধিকতর তদন্তের জন্য গাজীপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মতিউর রহমানকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটিকে এক কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

রোগী মমতাজ বেগমের স্বামী শরীফ উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, ‘শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১১তলায় মেডিসিন বিভাগ থেকে নামার সময় আমি লিফটের বাইরে ছিলাম। পরে যখন লিফট আটকে যায়, তখন একবার তিনতলায় (প্রশাসনিক ভবন), একবার পাঁচতলায়, একবার সাততলায় বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছে দৌড়াদৌড়ি করি। রোগীকে উদ্ধার করার জন্য, বাঁচানোর জন্য তাদের কাছে আবেদন-নিবেদন করি। কিন্তু তারা আমার আবেদনে সাড়া দেননি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীকে দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসা দিলে আমার রোগী হয়তো বেঁচে যেতে পারত।’

মমতাজের মেয়ে শারমিন বলেন, ‘আমার মা সকালে অসুস্থ হয়ে যায়। পরে সকাল ৬টায় তাজউদ্দীন হাসপাতালে নিয়ে আসি। প্রথমে মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করে পরীক্ষা করা হয়। সেখানে পরীক্ষার পর জানা যায় তার হার্টে সমস্যা। পরে ১১তলা থেকে লিফটে ৪তলার হৃদরোগ বিভাগে পাঠানো হয়। তাদের কথামতো লিফটে উঠলে ৯তলার মাঝামাঝি হঠাৎ লিফট বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় আমি, আমার মামা, ভাইসহ কয়েকজন মাকে নিয়ে ভেতরে ছিলাম। আমাদের দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। আমরা লিফটে থাকা তিন লিফটম্যানকে ফোন দিই। কিন্তু তারা গাফিলতি করে। ফোনে আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। ৪৫ মিনিট আমরা ভেতরে অবস্থান করেছি, উপায় না পেয়ে ৯৯৯ ফোন দিই। ফোন পেয়ে ফায়ার সার্ভিস এসে উদ্ধার করে। লিফটম্যানদের গাফিলতির কারণে আমার মায়ের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে কোনো দায়িত্ববোধ নেই।’

মমতাজ বেগমের ভাগিনা সেলিম প্রধান বলেন, ‘আমরা দ্রুত রোগীকে নিয়ে লিফটে নিচে চারতলায় নিয়ে যাওয়ার জন্য লিফটে উঠি। এরপর হঠাৎ ১০ ও ৯তলার মাঝামাঝি এসে লিফট আটকে যায়। এ সময় ভয়ে আমাদের মধ্যে এক বিভীষিকাময় অবস্থায় সৃষ্টি হয়। লিফটে আমাদের সঙ্গে ১২-১৪ জন আটকা পড়েছিল। এ সময় ভয়ে নারী ও শিশুরা কান্না শুরু করে। আমাদের উদ্ধারের জন্য ডাকাডাকি করি, কিন্তু কেউ কোনো সাড়া দেয়নি। পরে লিফটের ভেতর থেকে ফায়ার সার্ভিসকে ফোন দিলে তারা গিয়ে লিফট বলপূর্বক ফাঁকা করলে আমরা সেখান থেকে বের হয়ে আসি। ততক্ষণে আমাদের রোগী মৃত্যুবরণ করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা লিফটে প্রায় ৪৫ মিনিট আটকা পড়েছিলাম। হাসপাতালের লোকজন যদি আমাদের দ্রুত উদ্ধারের ব্যবস্থা নিত এবং সিসিইউতে নিয়ে আমার রোগীকে চিকিৎসা দিতে পারতাম, তাহলে রোগী বেঁচে যেত।’

হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ডা. কামরুল ইসলাম বলেন, সম্ভবত কয়েক দিন আগে তার (মমতাজের) হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। এ অবস্থায় তিনি রবিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এলে তাকে ১১তলার মেডিসিন বিভাগের মহিলা ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার শারীরিক পরীক্ষার পর হার্ট অ্যাটাকের বিষয়টি ধরা পড়ে। তার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এই রোগীকে হাসপাতালের চতুর্থ তলায় কার্ডিওলজি বিভাগের সিসিইউতে রেফার্ড করা হয়। পরে তাকে ওয়ার্ড থেকে সিসিইউতে নেওয়ার জন্য লিফটে তোলা হয়। লিফট অজ্ঞাত কারণে আটকে যায়। সেখানে প্রায় ৪৫ মিনিট আটকে থাকার পর লিফট থেকে তাকে উদ্ধার করা হলে মৃত পাওয়া যায়।

হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (উপপরিচালক) ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঘটনাটি দুঃখজনক। চিকিৎসার অভাবে রোগী মারা যায়নি। লিফটের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রোগী আটকে গিয়ে মারা গেছে। এ ঘটনা তদন্ত করার জন্য চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি আগামী তিন দিনের মধ্যে লিফট আটকে যাওয়া ও রোগী মৃত্যুর কারণ উদঘাটন করে প্রতিবেদন দেবে। প্রতিবেদন পেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে ৪ মে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগী হাসপাতালের ১২তলা থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মারা যাওয়া রোগীর নাম জিল্লুর রহমান (৭০)। তিনি গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার দরদরিয়া এলাকার কাসেম আলীর ছেলে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত