শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

চাকরির আশায় ভারত গিয়ে হারাতে হয় কিডনি

আপডেট : ১৩ মে ২০২৪, ০৪:৩৭ এএম

চাকরি দেবে বলে ভারতে পাচারের পর অস্ত্রোপচার করে একটি কিডনি বিক্রি করতে বাধ্য করে এমন অপরাধ চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। চক্রটি এখন পর্যন্ত দেশ থেকে ১০ জনকে ভারতে নিয়ে তাদের কিডনি বিক্রি করতে বাধ্য করেছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। গতকাল রবিবার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।

১১ ও ১২ মে ধানম-ির ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে থেকে ও বাগেরহাটে অভিযান চালিয়ে ওই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন মো. রাজু হাওলাদার, শাহেদ উদ্দীন ও মো. আতাহার হোসেন বাপ্পী। এ ঘটনায় জড়িত মো. মাছুম, শাহীন, সাগরসহ অজ্ঞাতপরিচয় ১০-১২ জন পলাতক রয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ড. খ. মহিদ উদ্দিন বলেন, গত বছর মিরপুর ১০ নম্বর শাহ আলী মার্কেটের পেছনে চায়ের দোকানে রবিন নামে একজন তার বন্ধুর সঙ্গে চা পান করছিলেন। এ সময় তারা সংসারের অভাব-অনটন নিয়ে কথা বলছিলেন। পাশে বসে মাছুম নামে ওই চক্রের একজন চা-পান করছিলেন।

রবিনের কথাবার্তা শুনে মাছুম বলেন, ভারতে তার ব্যবসা আছে এবং ওই প্রতিষ্ঠানে তিনি রবিনকে চাকরি দিতে পারবেন।

তারপর মাছুমের সঙ্গে মোবাইল নম্বর আদান-প্রদান করেন রবিন। এরপর মাছুমের সঙ্গে নিয়মিত কথা হতো রবিনের। পরে মাছুম রবিনকে বলেন ভারতে তার প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য যেতে হলে ডাক্তারি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভিকটিমকে নিয়ে যান মাছুম। সেখানে চক্রের রাজু হাওলাদারের সঙ্গে পরিচয় হয়। সেখানে রবিনের স্বাস্থ্যপরীক্ষার পর তার পাসপোর্ট নিয়ে নেন ভারতের ভিসার জন্য।

মহিদ উদ্দিন আরও বলেন, ভিসা পাওয়ার পর রবিনকে মাছুম ও মো. রাজু হাওলাদার গ্রেপ্তার আসামি শাহেদ উদ্দিন (২২) ও মো. আতাহার হোসেন বাপ্পীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তারা একে অপরের ব্যবসায়িক পার্টনার এবং বাংলাদেশ ও ভারতে তারা যৌথভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেন বলে জানান। পরে ভিকটিমকে ভারতের দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে রিসিভ করেন পলাতক আসামি শাহীন (৩৫) ও সাগর। তারা রবিনকে রিসিভ করে তার পাসপোর্ট হাতিয়ে নেন। পরে দিল্লি থেকে ভিকটিমকে ফরিদাবাদ এলাকায় নিয়ে আটক রাখা অবস্থায় সেখানে মাছুম ও সাগর যান। মাছুমকে পেয়ে ভিকটিম তার চাকরির কথা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বিভিন্ন রকম টালবাহানা করতে থাকেন। একপর্যায়ে আসামিরা ভিকটিমের আর্থিক অনটন, সাংসারিক দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে একটি কিডনি দেওয়ার জন্য প্ররোচিত করেন। একপর্যায়ে ভয়ভীতি দেখান যে পাসপোর্ট ছাড়া তিনি দেশেও ফিরতে পারবেন না। পরে ভিকটিমকে নয়াদিল্লির এশিয়ান হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে কিডনি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে কিছুদিন পর ভারতের গুজরাটে নিয়ে যান এবং মুক্তিনগর এলাকায় দোতলা একটি বাসায় রাখেন।

ডিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে ফুসলিয়ে কাউকে কিছু না বলার শর্তে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে গত ৪ মার্চ ভারতের গুজরাটে কিডনি অ্যান্ড স্পেশালাইজড হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করে ভিকটিমের একটি কিডনি নিয়ে নেন। অপারেশন শেষে হাসপাতাল থেকে চার দিন পরে ছাড়া পান ভিকটিম। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আসামিরা ভারতের অজ্ঞাত স্থানে প্রায় ১০-১১ দিন আটকে রাখেন তাকে।

এদিকে হাসপাতালে থাকা অবস্থায় বিভিন্ন মাধ্যমে ভিকটিম জানতে পারেন, তার কিডনি আসামিরা দালাল চক্রের কাছে প্রায় ৫০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। একপর্যায়ে দালাল চক্র ভিকটিমকে কিছু টাকা দেওয়ার কথা বলে। বাংলাদেশে অবস্থান করা চক্রের অন্য সদস্যরা ভিকটিমের স্ত্রী ইশরাত জাহানের বিকাশ নম্বরে ৩ লাখ টাকা দেন। পরে এভাবে দেশে এসে ভিকটিম বুঝতে পারেন যে তিনি বড় দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে নিজের কিডনি হারিয়েছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে খ. মহিদ উদ্দিন বলেন, চক্রটি রবিনকে ৬ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছিল কিডনির বিনিময়ে। কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত ৩ লাখ টাকা দেয়। বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যাদের কিডনি নেওয়া হচ্ছে, এসব কিডনির গ্রহীতারাও বাংলাদেশি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত