সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আত্মরক্ষার কৌশল শিখে রানা জঙ্গি সংগ্রহকারী!

আপডেট : ১৫ মে ২০২৪, ০৬:৩৫ এএম

রানা শেখ ওরফে আমির হোসাইন মার্শাল আর্ট (আত্মরক্ষার বিশেষ কৌশল) শিখেছিলেন। এমনকি মার্শাল আর্টে ‘ব্ল্যাক বেল্ট’ (দক্ষতার পরিচয় নির্ধারক) পেয়েছিলেন তিনি। তবে সামাজিকভাবে স্বীকৃত আত্মরক্ষার এই কৌশল রপ্তকারী রানাই একটা সময় জড়িয়ে পড়েন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে। তিনি জঙ্গিদের কর্মকাণ্ডে দীক্ষিত হয়ে নিজেই হয়ে ওঠেন জঙ্গি নিয়োগদাতা। জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সদস্য রানাকে গ্রেপ্তারের পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এ তথ্য জানিয়েছে।

রানার সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জঙ্গি সংগঠনটির আরও দুজনকে। তারা হলেন মশিউর রহমান ওরফে মিলন তালুকদার ও হাবিবুর রহমান।

ডিবি জানিয়েছে, পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) তথ্য ও সহযোগিতায় রাজধানীর কল্যাণপুর ও গাবতলী থেকে গত সোমবার তাদের গ্রেপ্তার করে ডিবির লালবাগ বিভাগ। তাদের কাছ থেকে তিনটি স্মার্টফোন ও দুটি বাটন ফোন জব্দ করা হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের কাছে বিস্তারিত তুলে ধরেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। তিনি বলেন, রানা ২০০২ সালে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের নেতা (হুজি) ও ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আব্দুর রউফের কাছে প্রশিক্ষণের জন্য ময়মনসিংহে যান। ময়মনসিংহের ভালুকার একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করার পাশাপাশি সামরিক ও আন আর্মড কমব্যাট প্রশিক্ষণ নেন।

তিনি আরও বলেন, ২০০৩ সালে রানার বাবা, মামা, ভগ্নিপতিসহ ১৮ জন হুজি নেতা আব্দুর রউফের সঙ্গে বৈঠকের সময় ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে পুলিশের কাছে ধরা পড়েন। বর্তমানে আলফা ইসলামিক লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ইউনিট ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত রানা। চাকরির আড়ালে তিনি কাজ করছিলেন আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার নিয়োগকর্তা হিসেবে। ইতিমধ্যে তিনজনকে সংগঠনের সদস্য বানিয়ে প্রশিক্ষণের জন্য পার্বত্য অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) ডেরায় পাঠান তিনি। প্রশিক্ষণের খরচ বাবদ কেএনএফকে লক্ষাধিক টাকাও দেন এই রানা।

জেলও খেটেছিলেন মশিউর : রানার সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া বাকি দুই জঙ্গি সদস্যের মধ্যে মশিউর রহমান ইসলামী আন্দোলনের অঙ্গসংগঠন ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে জানান ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ। তিনি বলেন, ২০০২-০৩ সালে হুজির সদস্য হিসেবে ময়মনসিংহে আব্দুর রউফের মাদ্রাসায় সামরিক ও আন আর্মড কমব্যাট প্রশিক্ষণ নেন তিনি। ২০১৩ সালে অন্য হুজি নেতাদের সঙ্গে গ্রেনেডসহ ঝালকাঠিতে গ্রেপ্তার হয়ে সাড়ে চার বছর কারাগারে ছিলেন। পাহাড়ি বৈরী পরিবেশে কমান্ডো হিসেবে টিকে থাকাসহ কয়েকটি বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য ২০২১ সালে বান্দরবান চলে যান মশিউর। সেখানে দুই বছর কেএনএফ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে অবস্থান করে প্রশিক্ষণ সফলভাবে শেষ করার জন্য সমতলে ফিরে আসেন তিনি।

ডিবিপ্রধান বলেন, হাবিবুর রহমান জঙ্গি সংগঠন শারক্বীয়ার নতুন সদস্য। তিনি আলফা ইসলামিক লাইফ ইন্স্যুরেন্সে রানার সহকর্মী ছিলেন। তাকে জঙ্গি মতবাদে দীক্ষিত করে প্রশিক্ষণের জন্য কেএনএফের ডেরায় পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রানা।

‘ধর্মযুদ্ধের’ বিশ্বাস থেকে জঙ্গি সংগঠন : নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হুজি, আনসার আল ইসলাম ও জেএমবির মুক্তিপ্রাপ্ত এবং পলাতক বেশ কিছু সদস্য মিলে নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠীতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া গঠন করেছে বলে জানান ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ। তিনি বলেন, এই জঙ্গি সংগঠনের নেতা ও সদস্যরা বিশ্বাস করেন ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ নামক ধর্মযুদ্ধ হবে। এই ধর্মযুদ্ধে তারা অংশগ্রহণ করবেন। বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শহীদ অথবা গাজীদের মতো মর্যাদা পাবেন বলে বিশ্বাস তাদের।

ডিবি জানায়, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের ধারাবাহিক তৎপরতায় সফল জঙ্গি অভিযানের কারণে এই জঙ্গি সংগঠনটি সমতল এড়িয়ে পার্বত্য অঞ্চলকে প্রশিক্ষণের জন্য বেছে নেয়। একপর্যায়ে পাহাড়ের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কেএনএফের সঙ্গে যোগাযোগ হয় শারক্বীয়ার। অর্থের বিনিময়ে কেএনএফ সন্ত্রাসীরা শারক্বীয়ার সদস্যদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেন। দেশকে অস্থিতিশীল করে নিজ দেশ এবং পাশের দেশের বিরুদ্ধে ‘ধর্মযুদ্ধে’ জড়াতে রসদসামগ্রী এবং কর্মী সংগ্রহে তৎপর ছিল সংগঠনটি।

শারক্বীয়ার প্রায় সব সদস্য পুলিশের জালে : পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের অভিযানে শারক্বীয়ার অনেক সদস্যকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে জানিয়ে ডিবিপ্রধান হারুন বলেন, ‘সংগঠনটিতে ৫৩ জনের মতো সদস্য ছিলেন। ৪৯ জনই ইতিমধ্যে ধরা পড়েছেন।’

রানা সারা দেশ থেকে সদস্য সংগ্রহের পরিকল্পনায় ছিলেন জানিয়ে ডিবিপ্রধান আরও বলেন, ‘আমরা তাদের গ্রেপ্তার করতে না পারলে হয়তো আরেকটা গ্রুপকে পাহাড়ে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হতো।’ তিনি জানান, গ্রেপ্তার তিনজনকে চার দিনের রিমান্ডে চেয়ে আদালতে পাঠানো হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত