শুক্রবার, ৩১ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

রিকশার পক্ষ বিপক্ষ

আপডেট : ১৭ মে ২০২৪, ০৩:০০ এএম

রাজধানী ঢাকায় ব্যাটারিচালিত বা যান্ত্রিক রিকশার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশাকে দায়ী করে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা নিষিদ্ধ ছাড়াও ঢাকায় চলাচল করা লক্কড়ঝক্কড় ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকার। বুধবার রাজধানীর বনানীতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ভবনে সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম সভায় এই নির্দেশনা দিয়েছেন মন্ত্রী। মন্ত্রী বলেন, ‘ইজিবাইকে ৮-১০ জন থাকে, বড় গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগলে ইজিবাইকের সবাই শেষ। তখন ক্যাজুয়ালটি বেড়ে যায়। মোটরসাইকেলও এখন আরেক উপদ্রব।’ সন্দেহ নেই, ব্যাটারিচালিত রিকশা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ একটি যানবাহন। এর যাত্রীদের দুর্ঘটনায় পড়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষত মহাসড়কে এই যান চলতে দেওয়া অনুচিত।

অন্যদিকে, বহু বছর ধরেই ঢাকা শহরে চলাচলরত ব্যাটারিচালিত এবং সাধারণ রিকশা উঠিয়ে দেওয়া নিয়ে চলছে বিতর্ক। নানা কারণে ঢাকা শহরে রিকশা উঠিয়ে দেওয়া কঠিন। উন্নত দেশের সঙ্গে তুলনা দিয়ে রিকশার বিরোধিতা করলেও, এখানকার বাস্তবতা ভিন্ন। এই শহরে গণযোগাযোগের ব্যবস্থা অপ্রতুল। সরকারি বা বেসরকারি বাসের অবস্থা তথৈবচ। মালিক ও শ্রমিকদের সিন্ডিকেটের শিকার হন যাত্রীরা। ক্ষমতার উচ্চপর্যায়ে সংযোগ থাকার জন্য এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া যায় না। বাস্তবতা হচ্ছে, শহরে হাঁটার মতো রাস্তাও নেই। ফুটপাতগুলো নানাভাবে দখল হয়ে আছে। ফলে, অলিগলি এবং স্বল্প দূরত্বের জন্য রিকশা প্রয়োজনীয়। দেশে রিকশা খাতে কয়েক লাখ পরিবারের জীবিকা নির্ভর করে। হঠাৎ করে এদের উচ্ছেদ করলে আর্থিক সমস্যা ছাড়াও সামাজিক সমস্যা তৈরি হবে।

মন্ত্রী ছাড়াও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলামও অনেক দিন যাবৎ ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে কথা বলছেন। এইসব রিকশা প্রচুর বিদ্যুৎ অপচয় করে বলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বাস্তবে, এইসব রিকশা কতটুকু বিদ্যুৎ অপচয় করে এই নিয়ে পরিসংখ্যান নেই। তবে, আলো ঝলমলে বিপণিবিতানগুলোর তুলনায় কম তা নিয়ে একটা সাধারণ ধারণা আছে। মেয়র একই সঙ্গে প্যাডেলে চলা রিকশার পক্ষে মতামত দিয়েছেন। কিন্তু, প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও পায়ে চলা রিকশার মতো অমানবিক একটা ব্যবস্থা জারি রাখা আধুনিক যুগে বেমানান। মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি আবিষ্কারের অন্যতম কারণ হচ্ছে মানুষের কষ্ট কমানো। গরিব হওয়ার ফলে রিকশাচালকরা সেই সুবিধা পাবেন না, এই ধরনের যুক্তি নিষ্ঠুর ও সামন্তবাদী।

ফলত, রিকশার সমস্যার সমাধান দুভাবে হতে পারে। এক, শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থার সমাধান। আমরা গত কয়েক মাসে দেখেছি, মেট্রোরেলের মতো আধুনিক ও গণবান্ধব পরিবহন শহরের যানজটের বেশ খানিকটা অংশ নিরসন করেছে। একই সঙ্গে দেশের জনগণ প্রমাণ করছেন যে, উপযুক্ত সুবিধা পেলে তারা নিয়মনীতি মেনে চলেন। ফলে, বাস বা অন্যান্য পরিবহনে গণবান্ধব ও সুষ্ঠু ব্যবস্থা কায়েম হলে ধীরে ধীরে রিকশার উপযোগিতা কমে আসবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাটারিচালিত রিকশার উন্নয়ন। এই খাতে বিনিয়োগ করলে দেশি প্রকৌশলীরা এই যানের ত্রুটি সারিয়ে একে আরও নিরাপদ করে তুলতে পারেন। বিশ্ব জুড়ে পরিবেশ বিপর্যয় এখন আলোচিত বিষয়। রিকশার মতো পরিবেশবান্ধব যন্ত্র জ্বালানির সাশ্রয় করে। ফলে, রিকশাকে যদি নিরাপদ এবং গতিশীল করে তোলা যায় তবে বাইরে থেকে গাড়ি আমদানির খরচ যেমন কমবে, সেই প্রযুক্তি বিদেশে রপ্তানিও করা যাবে।

ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত বা পায়ে চালিত রিকশা উচ্ছেদের আলোচনা বহু বছর ধরেই হচ্ছে। প্রতিবারই দেখা যায়, অনেক কড়া নীতি নেওয়া হলেও শেষতক নানা সিন্ডিকেট আর চাঁদাবাজি করে সেগুলো বহাল রাখা হয়। তবে, ব্যাটারিচালিত রিকশাকে মূল সমস্যা না ধরে, জনমুখী ও বাস্তব চিন্তা করলেই কেবল সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত