শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

৩৪০ কোটি আত্মসাৎ

বেসিকে বাচ্চুর পরও লুটপাট

আপডেট : ২০ মে ২০২৪, ১১:৪২ এএম

দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে কলঙ্কের আরেকটি অধ্যায় রচনা করেছিলেন রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু। তার আমলে ব্যাংকটির অর্থ লুটপাটে অনন্য নজির তৈরি হয়েছিল। তবে তাকে সরিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন, ঋণ বিতরণে সীমাবদ্ধতা আরোপের পরও থামেনি অনিয়ম। আবদুল হাই বাচ্চু-পরবর্তী পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের আমলেও ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে বেসিক ব্যাংকের শত শত কোটি টাকা লুট করা হয়েছে। ব্যাংকটিকে আরও দুর্বল বানিয়ে ‘নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)’ পাঠানো হয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান মহানিরীক্ষকের কার্যালয়ের এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আবদুল হাই বাচ্চু-পরবর্তী নানা অনিয়মের চিত্র। নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের ঋণ অধিগ্রহণ, রপ্তানির ঋণপত্র (এলসি) খুলে অর্থ আত্মসাৎ, ঋণ পুনঃতফসিলীকরণে অনিয়ম, জামানত জালিয়াতিসহ নানা অনিয়মে বেসিক ব্যাংকের প্রায় ৩৪০ কোটি টাকা আত্মসাৎ হয়েছে।

আবদুল হাই বাচ্চুকে অপসারণের পর ২০১৪ সালের ৬ জুলাই বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক ব্যাংকার আলাউদ্দিন আবদুল মজিদ, যিনি একসময় বেসিক ব্যাংকেরই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে ছয় বছর কাজ করেছিলেন। এ ছাড়া ২০১৪ সালের ১ অক্টোবর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় খন্দকার মো. ইকবালকে, যিনি এর আগে কর্মসংস্থান ব্যাংকের এমডি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বাচ্চু-পরবর্তী নতুন পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের আমলেই ঋণ অনিয়মের আরও বেশ কিছু চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে।

বেসিক ব্যাংক নিয়ে সিএজির প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত অন্য ব্যাংকের ঋণ অধিগ্রহণ, আমদানি-রপ্তানির এলসির দায় পরিশোধ না হওয়াসহ বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মে ব্যাংকটি ৩৪০ কোটি টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, অন্য ব্যাংকের দায় অধিগ্রহণের পর ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে আমদানি করা মালামাল রপ্তানি করা হয়নি। যে কারণে ব্যাংকের ডিমান্ড লোনের ১০৩ কোটি ২১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা অনাদায়ী রয়ে যায়।

বংশাল শাখার গ্রাহক মেসার্স ঝিল ওয়্যারস লিমিটেডের ঋণ নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গ্রাহকের অনুকূলে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা ব্যাংকের দায় অধিগ্রহণের জন্য বেসিক ব্যাংকের পর্ষদ টার্ম লোন ১৫ কোটি ৩০ লাখ ৩৮ হাজারসহ মোট ১১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঋণ অনুমোদন দেয়। এ ঋণের মধ্যে কম্পোজিট লিমিট, স্বল্পমেয়াদি চলতি মূলধন, ওভার ড্রাফট ও ব্যাক টু ব্যাক এলসি লিমিট ছিল। অথচ কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন মাত্র ১০ লাখ এবং প্রস্তাবিত জামানতের মূল্য ছিল প্রায় ২১ কোটি টাকা। স্বল্প জামানতের পরও ঝিল ওয়্যারস লিমিটেডের নামে এ পরিমাণ ঋণ মঞ্জুর করে তৎকালীন পর্ষদ।

শর্ত অনুযায়ী, বিতরণ করা টার্ম লোন, রপ্তানি এলসির বিপরীতে কাঁচামাল কেনার জন্য ঋণ এবং চলতি মূলধন ঋণ সমান মাসিক কিস্তিতে, বিক্রি বা রপ্তানি আয় থেকে এবং পরিচালকের নিজস্ব উৎস থেকে আদায় করার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এসব ঋণের কোনো অর্থ গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করতে পারেনি। তারপরও ঋণের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে ২০১৮ সালের ১৪ জুন ওভার ড্রাফট সীমা ৬ কোটি টাকা, স্বল্পমেয়াদি ঋণসীমা ১২ কোটি ৫০ লাখ এবং ব্যাক টু ব্যাক এলসি সীমা ৬৫ কোটি টাকা এক বছরের জন্য নবায়ন করা হয়। ওই ঋণসীমার আওতায় বিক্রয় চুক্তির বিপরীতে বেসিক ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা কর্তৃক গ্রাহকের আবেদন এবং প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদনের পরিপ্রেক্ষিতে ক্রমাগত ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলে।

কিন্তু মঞ্জুরিপত্রের শর্ত অনুযায়ী গ্রাহক বিক্রয় চুক্তির পরিবর্তে এলসি অথবা রপ্তানি-সংক্রান্ত নথি শাখায় জমা দেয়নি। গ্রাহক রপ্তানি থেকে আমদানি দায় পরিশোধ না করায় বেসিক ব্যাংককে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইডিএফ ঋণ পরিশোধের জন্য ব্যাংক গ্রাহকের অনুকূলে মোট ৪৮ কোটি ১১ লাখ ৩৪ হাজার টাকার ডিমান্ড লোন সৃষ্টি করে। গ্রাহক ব্যাক টু ব্যাক এলসি-সংক্রান্ত আমদানি পণ্য রপ্তানি অথবা বিক্রি করে সেই অর্থ বেসিক ব্যাংকে তার ঋণ হিসাবে জমা দেয়নি। ফলে সহজামানত নগণ্য হওয়ায় ঝিল ওয়্যারস লিমিটেডের বর্তমানে মন্দমানে শ্রেণিকৃত পাওনা ১০৩ কোটি ২১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা আদায় করতে পারেনি বেসিক ব্যাংক।

একইভাবে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের নবাবপুর শাখার গ্রাহক মেসার্স নাসিম প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান এনজি কম্পোজিট লিমিটেডের ৩৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকার ঋণ অধিগ্রহণ করে বেসিক ব্যাংক। দায় অধিগ্রহণসহ ২০১৫ সালের অক্টোবরে প্রতিষ্ঠান দুটির নামে মোট ৮৪ কোটি ২৬ লাখ ৯১ হাজার টাকার কম্পোজিট ক্রেডিট লিমিট মঞ্জুর করে বেসিক ব্যাংকের পর্ষদ। শর্ত অনুযায়ী, বিতরণ করা সিসি (হাইপো), দায় অধিগ্রহণে টার্ম লোন ও ওভারড্রাফটসহ অন্যান্য টার্ম লোন (মেয়াদি ঋণ), রপ্তানি এলসির বিপরীতে ঋণ এবং চলতি মূলধন ঋণ মাসিক কিস্তিতে, বিক্রয়/রপ্তানি আয় এবং পরিচালকের নিজস্ব উৎস থেকে পরিশোধ বা সমন্বয়ের নির্দেশনা ছিল। ঋণ অনুমোদনের এক বছরের মধ্যেই ২০১৬ সালের জুন থেকে তা অনিয়মিত হয়ে পড়ে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, কার্যকরী মূলধন ঋণ হিসাব সিসি (হাইপো) ও ওভারড্রাফটের সীমা অতিরিক্ত দায় থাকায় গ্রাহককে ২০১৭ সালের জুন মাসের মধ্যে সীমার অতিরিক্ত দায় পরিশোধের শর্ত দেওয়া হয়। এ শর্তে বেসিক ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে নির্দেশনায় নাসিম প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ ও এনজি কম্পোজিটের ঋণসীমা নবায়ন করা হয়।

কিন্তু ২০১৭ সালের জুন মাসের মধ্যে ব্যাংক সীমা অতিরিক্ত দায় আদায় করতে না পারায় ওই নবায়ন কার্যকর হয়নি। তারপরও গ্রাহক ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে অনিয়মিতভাবে ২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত ২৮টি এলসি খোলা হয়। গ্রাহক আমদানিমূল্য পরিশোধ না করায় ব্যাংক মেয়াদোত্তীর্ণ সীমার আওতায় এলটিআর এবং ডিমান্ড লোন সৃষ্টি করে আমদানিমূল্য পরিশোধ করতে বাধ্য হয়। এমনকি গ্রাহক আমদানি করা কাঁচামালে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করেও ব্যাংকের দায় পরিশোধ করেনি। বর্তমানে ব্যাংকের সঙ্গে গ্রাহকের ব্যবসা বন্ধ এবং ক্ষতিমানে শ্রেণিকৃত দায় আদায় না হওয়ায় ব্যাংকের ৬৪ কোটি ৫৮ লাখ ৯২ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে।

এ বিষয়ে বেসিক ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আনিসুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ব্যাংকটির রিকভারি শাখার প্রধান ও জেনারেল ম্যানেজার সুমিত রঞ্জননাথ দেশ রূপান্তরকে জানান, এসব ঋণের কোনোটিই আদায় হয়নি, বর্তমানে খেলাপি অবস্থায় আছে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসবের মূল কারণ হচ্ছে অনিয়ম করে যদি কেউ পার পায়, তখন তো অনিয়মটাই একটা নিয়ম হয়ে যায় এবং এর মাধ্যমে যারা অপকর্ম করে, তারা উৎসাহিত হয়। সেটারই প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি। হাজার হাজার কোটি টাকা কেউ নিয়ে যায় এবং তাকে যদি ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখা হয়, অন্যরাও তো সেই কাজ করবে। এর প্রভাব ভালো ব্যাংকগুলাতেও পড়বে। আর্থিক খাতের বিষয়ে সরকার এখনো সিরিয়াস নয়। কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ বা রোডম্যাপ আমরা এখনো দেখিনি।’

শুধু অন্য ব্যাংকের ঋণ অধিগ্রহণ নয়, অপর্যাপ্ত জামানত ও অনিয়মিতভাবে ঋণসীমা বৃদ্ধি, বিশ্বাসের ঋণ (এলটিআর), সিকিউরড ওভারড্রাফট (এসওডি) ছাড়াও বিভিন্ন অনিয়মের ঋণের ব্যাংকটির আরও প্রায় ১৮০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। সিএজির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারওয়ান বাজার শাখার গ্রাহক মেসার্স কোয়ান্টাম করপোরেশন লিমিটেডকে অপর্যাপ্ত জামানতের বিপরীতে প্রকল্প ও সিসি (হাইপো) ঋণ মঞ্জুর ও বিতরণের পর অনিয়মিতভাবে ঋণসীমা বৃদ্ধি করায় ব্যাংকের ৪০ কোটি ৬১ লাখ ৭৩ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। এ ঋণের অর্থ আদায় করতে পারেনি ব্যাংক। এ ছাড়া ব্যাক টু ব্যাক এলসি স্থাপনের পর রপ্তানি ব্যর্থতায় সৃষ্ট ডিমান্ড লোন বাবদ ব্যাংকের অনাদায়ী ১০ কোটি ১৬ লাখ, ঋণ বিতরণের পর প্রকল্প চালু না হওয়া সত্ত্বেও পুনঃতফসিলীকরণে ব্যাংকের অনাদায়ী ৩ কোটি ৬৩ লাখ, মেয়াদোত্তীর্ণ এলটিআর বাবদ ব্যাংকের অনাদায়ী ৪ কোটি ৯৪ লাখ, ব্যাক টু ব্যাক এলসি স্থাপনের পর রপ্তানি ব্যর্থতায় সৃষ্ট ডিমান্ড লোন এবং প্যাকিং ক্রেডিট (পিসি) বাবদ ব্যাংকের অনাদায়ী ৩ কোটি ২২ লাখ, অপর্যাপ্ত জামানতের বিপরীতে প্রকল্প ও সিসি (হাইপো) ঋণ মঞ্জুর ও বিতরণের পর অনিয়মিতভাবে ঋণসীমা বৃদ্ধি করায় ব্যাংকের অনাদায়ী রয়েছে ৪০ কোটি ৬১ লাখ ৭৩ হাজার টাকা।

এর বাইরে বন্ধকী জমি অতিমূল্যায়ন ও অন্যের কাছে বিক্রীত জমি বন্ধকীর বিপরীতে অনিয়মিতভাবে ঋণ বিতরণ করায় ব্যাংকের ১৪ কোটি ২১ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। পি কে হালদারের প্রতিষ্ঠান এফএএস ফাইন্যান্স লিজিং কোম্পানির অনুকূলে বিতরণকৃত ঋণের অর্থ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকের অনাদায়ী ৪০ কোটি ৬২ লাখ টাকা আদায় হয়নি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেসিক ব্যাংককে অনেক ঋণ দেওয়া হয়েছে, যেগুলো যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দেওয়া হয়নি। আমরা আগেও বলেছি, ওই ব্যাংক আইনকানুন না মেনে অনেক কিছু করা হয়েছে, আমাদের প্রতিবেদন থেকেও অনেক কিছু উঠে এসেছে। আমরা ব্যাংকের মালিকদের, সরকারকে অবহিত করেছি। এসবের অনেকগুলো দুদকে আছে, মামলা প্রক্রিয়ায় আছে। যখন এসব নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ করে, তখন সেটা আইনি এখতিয়ারের মধ্যে চলে যায়।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত