শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা

আপডেট : ২২ মে ২০২৪, ১২:৪৭ এএম

এক নগরীর দুই পিতা। দুজনের বাস নগরের দুই প্রান্তে। তারা নগরের দায়িত্ব নেওয়ার আগে নগরবাসীকে অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছেন। উত্তর প্রান্তে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে ওয়াদা করেছিল সুস্থ ঢাকা, সচল ঢাকা ও আধুনিক ঢাকা উপহার দেবে নগরবাসীকে। দক্ষিণ প্রান্তের ওয়াদা ছিল ঐতিহ্যের ঢাকা, সুশাসনের ঢাকা, সচল ঢাকা ও উন্নত ঢাকা গড়ার। দেখতে দেখতে চার বছর অতিক্রম করেছেন ঢাকার দুই মেয়র। এই চার বছরে নিজেদের সফল দাবি করলেও পরিসংখ্যান কিন্তু তা বলে না। গত বছরের ২২ জুনে  ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রকাশিত দ্য গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ১৭৩টি দেশের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল ১৬৬। ধীরগতির নগরের তালিকায় বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির শহর এখন ঢাকা। ১৫২টি দেশের ১ হাজার ২০০টির বেশি শহরে যান চলাচলের গতি বিশ্লেষণে এই চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৩ সালের যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। ইউএনএপি বার্ষিক ফ্রন্টিয়ারস রিপোর্ট-২০২২ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা এখন বিশ্বে শব্দদূষণে শীর্ষ শহর। গত ১১ জানুয়ারি বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বাতাসের শহর ছিল ঢাকা। এই পরিসংখ্যানগুলো নগরপিতাদের সফলতা না ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করব আমরা?

পাশাপাশি, মশা, জলাবদ্ধতা, অপরিচ্ছন্ন নগর, ফুটপাত দখল, এবড়ো থেবড়ো সড়ক, যানজটসহ অনেক ধরনের যন্ত্রণায় ভুগতে হয় নগরবাসীকে। এই সংকটগুলো রাজধানীবাসীর জন্য নতুন না হলেও মেয়রদ্বয়ের কাছে এসব যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণের আশা করতে পারে নগরবাসী। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো এই সংকটগুলো কমে তো নাই-ই, কিছু ক্ষেত্রে বরং বেড়েছে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের বাজেট বেড়েছে শুধু। বেড়েছে হোল্ডিং ট্যাক্স। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ২০২০ সালের ১৩ মে, এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব নেন এর তিন দিন পর। নির্বাচনী ইশতেহারে মেয়রদ্বয় আধুনিক, গতিময়, সচল, সুস্থ, মানবিক ও আমার ঢাকা গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। চার বছর তো পার হলো এর কতটুকু তারা পূরণ করতে পেরেছেন তার মূল্যায়ন প্রয়োজন।

তারা গতিময় ঢাকার কথা বলেছেন, অথচ ঢাকা ধীরগতির শহর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যানজট বর্তমানে রাজধানীবাসীর জন্য গলার কাঁটা। দিনভর সড়ক জুড়ে লেগে থাকে যানজট। এক গন্তব্য থেকে অন্য গন্তব্যে যেতে রাজধানীবাসীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটের যন্ত্রণা পোহাতে হয়। ২০২২ সালে মেট্রোরেল (আংশিক) চালু এবং গত বছর বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালুর ফলে নগরবাসী আশা করেছিল নগরীর যানজট কিছুটা কমবে। মেট্রোরেল বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নেমে নগরবাসীকেই সেই জটে পাক খেতে হয়। অপ্রশস্ত রাস্তা, বিভিন্ন গতির যানবাহন, যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রীর ওঠানামা, অবৈধ পার্কিং, অবৈজ্ঞানিক ট্রাফিক সিগন্যাল ও বাই রোডের আধিক্যকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় যানজটের। ফলে গতিশীল ঢাকা হওয়ার স্বপ্ন আপাতত অবাস্তব। এছাড়া ফুটপাতগুলো ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীদের দখলে থাকে। নগরীর যেসব এলাকাতে মানুষের চলাচল বেশি সেখানে ফুটপাতের ব্যবসা ততটাই জমজমাট। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে ফুটপাতও নাকি বিক্রি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি হাইকোর্ট ফুটপাত দখল ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নামের তালিকা দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে দখলদারদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানাতে বলা হয়েছে।

জনশুমারি ও জাতীয় গৃহগণনা-২০২২ অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটির জনসংখ্যা ১ কোটি ২ লাখ ৭৮ হাজার ৮৮২ জন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবাও উপেক্ষিত আছে। গেল দুই বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতাকেই ইঙ্গিত দেয়। ২০২৩ সালে ডেঙ্গুর সব রেকর্ড ভেঙে যায়। আক্রান্ত হন ৩ লাখ ২১ হাজার ২৭ জন। এর মধ্যে মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন।  এ বছরের শুরু থেকে ডেঙ্গু জ্বরের আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এডিস মশা নিধনে ব্যাঙ থেরাপিসহ যেসব উদ্যোগের কথা বলেছেন তার কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি। ডেঙ্গু জ্বরের প্রাদুর্ভাবের কারণে দুই সিটিতেই মশা নিধনের জন্য বাজেট বাড়ানো হয়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে চলতি অর্থবছরে মশা মারার বাজেট ১৫৩ কোটি টাকা। এরমধ্যে উত্তরের ১২১ কোটি ৮৪ লাখ আর দক্ষিণের ৩১ কোটি এক লাখ টাকা। এক পরিসংখ্যান বলছে গত ১২ বছরে ঢাকার মশা মারার আয়োজনে খরচ হয়েছে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। এই বাজেটের টাকা মশা নিবারণের নানা যন্ত্রপাতি, কীটনাশসহ আরও অনেক কাজে ব্যয় হয়। কিন্তু মশার ওষুধের কার্যকারিতা এবং এডিস মশা নিধনের সিটির হম্বিতম্বিই প্রকাশ পেয়েছে কেবল, মশা কমেনি। যদিও ডেঙ্গুতে রেকর্ড আক্রান্ত ও মৃত্যুর বছর ২০২৩ সালেই ‘সাফল্যের সঙ্গে’ এডিস মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণের দাবি করেছেন দক্ষিণ সিটির মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। তার দাবি, ‘মশা নিয়ন্ত্রণের কারণে’ ২০১৯ সালের তুলনায় গত বছর ‘ঢাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অর্ধেক কমেছে। যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে বিপরীত চিত্র। তিনি  আরও দাবি করেছেন, ঢাকাবাসীকে রোগমুক্ত রাখতে পেরেছেন। একইসঙ্গে ঢাকাবাসীকে স্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখতে পেরেছি।

এ বছর হিট অ্যালার্ট জারি করতে হয়েছে রাজধানীতে। চলতি মাসে রেকর্ড গরমে পুড়েছে ঢাকা। অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে সবুজ নিঃশেষ হয়েছে। কিন্তু মেয়ররা সবুজ ঢাকার কথা বলেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে গাছ লাগাবেন কোথায়? সে জায়গাটুকু কি আছে? রাস্তার মধ্যে রোড ডিভাইডারে কিছু গাছ লাগানো আছে। কিন্তু পরিচর্যার অভাবে সেগুলোও এখন যায় যায় অবস্থা। উত্তর সিটি করপোরেশন হিট অফিসার নিয়োগ করেছেন। কিন্তু তিনি কী দায়িত্ব পালন করবেন সেটাই নগরবাসীর কাছে পরিষ্কার না।

ঢাকার বাতাসে ক্যানসার সৃষ্টিকারী আর্সেনিক, সিসা ও ক্যাডমিয়ামের পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মাত্রার প্রায় দ্বিগুণ বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি এবং ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহারকারী শিল্প, কয়লাভিত্তিক ইটভাটা এবং যানবাহন এসব রাসায়নিক উপাদানের উচ্চ ঘনত্বের জন্য দায়ী। গবেষণায় শহরের বাতাসে ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে এমন আরেকটি উপাদান কোবাল্টের উচ্চ মাত্রায় উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। বিশ্বের ২৭টি স্থানে পরিচালিত এই গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ঢাকা-ই একমাত্র স্থান যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু উভয়ের ক্যানসার সৃষ্টির ঝুঁকি মানদণ্ড ছাড়িয়েছে। এলিমেন্টাল ক্যারেক্টারাইজেশন অব অ্যাম্বিয়েন্ট পার্টিকুলেট ম্যাটার ফর এ গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউটেড মনিটরিং নেটওয়ার্ক : মেথডোলজি অ্যান্ড ইমপ্লিকেশনস’ নামে এই গবেষণাটি গত ১০ মার্চ এসিএস ইএস অ্যান্ড টি এয়ার জার্নালে প্রকাশিত হয়।

তবে গত চার বছরে মেয়রদ্বয় একেবারেই কিছু করেননি বলা যাবে না। যে সংকটগুলো সিটিবাসী ভোগ করেন তার অনেক কিছুই তাদের হাতে নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু তাদের চেষ্টা আছে। গত চার বছরে মোহাম্মদপুরের লাউতলা ও রামচন্দ্রপুর খাল, মিরপুরের প্যারিস খাল এবং সাঁতারকুলের সূতিভোলা খাল থেকে দখলদারদের উচ্ছেদ ও আবর্জনা অপসারণ করেছে। ২৬টি পার্ক ও খেলার মাঠ থেকেও দখলদারদের উচ্ছেদ করেছে উত্তর সিটি। ডিএসসিসি বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল খনন ও পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করেছে, মান্ডা খালের ৮ দশমিক ৭ কিলোমিটার সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন শুরু করেছে। জিরানী খাল, হাজারীবাগের কালুনগর খাল এবং শ্যামপুরের শ্যামপুর খাল থেকে বর্জ্য অপসারণ এবং দখলদারদের উচ্ছেদ করছে দক্ষিণ সিটি। দুই মেয়র বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার বিষয়েও আশাবাদী। ফুটপাত দখলমুক্ত করতে প্রায়ই অভিযান পরিচালনা করছেন। সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি যাতে না হয় দুই সিটি করপোরেশন ড্রেন পরিষ্কার করেছে এবং খালগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।

তবে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর রাজধানী গড়ে তুলতে মেয়রদের আরও ডাইনামিক হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বৃহত্তর স্বার্থে কঠোর হতে হবে। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জরিপ অনুযায়ী, বসবাসের জন্য সবচেয়ে আদর্শ শহর হলো নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড। এরপরে রয়েছে জাপানের ওসাকা, অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড, নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটন এবং জাপানের টোকিও। এসব শহরের প্রধান বৈশিষ্ট হলো এগুলো পরিচ্ছন্ন শহর। ঢাকাকে বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে সেদিকেই দৃষ্টি দেওয়া উচিত সবার আগে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত