শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মুসলিম জাতির ঐক্য প্রতিষ্ঠায় হজ

আপডেট : ২২ মে ২০২৪, ১২:১৪ এএম

শুরু হয়েছে হজের মৌসুম। হজ উপলক্ষে সৌদি আরবে সমবেত হবেন ২৫ লক্ষাধিক মুসলমান। মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় জমায়েত এটি। বাংলাদেশে হজ ফ্লাইট শুরু হয়েছে। এ বছর মোট ৮৫ হাজার ২৫৭ জন বাংলাদেশি হজ পালন করতে পারবেন। তাদের মধ্যে চার হাজার ৫৬২ জন সরকারি ব্যবস্থাপনায় এবং বাকি ৮০ হাজার ৬৯৫ জন ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনায় হজ পালন করবেন। সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ পালন করতে ইতিমধ্যে চার হাজার ৩১৪ জন হজযাত্রী নিবন্ধন কার্যক্রম সম্পন্ন করেছেন এবং ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনায় হজ পালন করতে ৭৮ হাজার ৮৯৫ জন হজযাত্রী নিবন্ধিত হয়েছেন।

হজ ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ ও মৌলিক ইবাদত। জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন প্রত্যেক সচ্ছল মুসলিম নর-নারীর ওপর হজ পালন করা ফরজ। আত্মিক উন্নতি, সামাজিক সম্প্রীতি ও বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় হজের গুরুত্ব অপরিসীম। মুসলিম বিশ্বের ঐক্য-সংহতি গড়তেও হজের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব মুসলিমের করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে সঠিক দিকনির্দেশনাও লাভ করা যায় হজের মহাসম্মেলন থেকে। হজ শুধু ইবাদতই নয়, বরং আত্মিক পরিশুদ্ধতার এক অনস্বীকার্য পদ্ধতি।

হজ শব্দের আভিধানিক অর্থ ইচ্ছা করা, সংকল্প করা, গমন করা, দর্শন করা ইত্যাদি। পরিভাষায় হজ বলা হয়, নির্দিষ্ট দিনে নিয়তসহ ইহরাম বেঁধে আরাফার ময়দানে অবস্থান করা এবং বায়তুল্লাহ শরিফ তাওয়াফ করা। হজ মুসলমানদের জন্য একটি বুনিয়াদি ইবাদত। এটি ইসলাম ধর্মের স্তম্ভসমূহের বিশেষ একটি স্তম্ভ।

হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘পাঁচটি জিনিসের ওপর ইসলামের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছে। এক. আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার বান্দা ও রাসুল, এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া। দুই. নামাজ আদায় করা। তিন. জাকাত প্রদান করা। চার. হজ পালন করা। পাঁচ. রমজান মাসের রোজা রাখা।’

ইতিহাস থেকে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইবরাহিম (আ.) সর্বপ্রথম হজের প্রবর্তন করেন। হজ প্রবর্তনের আগে হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে সঙ্গে নিয়ে পুনর্নির্মাণ করেন কাবাঘর।

উল্লেখ্য, কাবাঘরটি হজরত আদম (আ.) ফেরেশতাদের সহায়তায় সর্বপ্রথম নির্মাণ করেন। হজরত ইবরাহিম (আ.) জিবরাইল (আ.)-এর সাহায্যে একই ভিতে অর্থাৎ হজরত আদম (আ.) কর্র্তৃক নির্মিত কাবার স্থানে এর পুনর্নির্মাণ করেন। নির্মাণকাজ শেষ হলে ইবরাহিম (আ.)-এর প্রতি নির্দেশ হয় হজ পালনের। আল্লাহতায়ালা হজরত জিবরাইল (আ.) মারফত তাকে হজের সব আহকাম সম্পর্কে অবহিত করেন। ইবরাহিম (আ.) তার পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে নিয়ে সম্পন্ন করেন হজের সব আহকাম। এরপর আল্লাহর নির্দেশ আসে হজের দাওয়াত বিশ্ববাসীকে পৌঁছে দেওয়ার।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘যখন হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে হজ ফরজ হওয়ার কথা ঘোষণা করার আদেশ দেওয়া হয় তখন তিনি আল্লাহর কাছে আরজ করেন, এটা তো জনমানবহীন প্রান্তর। এখানে ঘোষণা শোনার মতো কেউ নেই। যেখানে ঘনবসতি আছে সেখানে আমার আওয়াজ কীভাবে পৌঁছবে? আল্লাহ বললেন, তোমার দায়িত্ব শুধু ঘোষণা দেওয়া। সারা বিশ্বে পৌঁছানোর দায়িত্ব আমার। এ কথা শুনে হজরত ইবরাহিম (আ.) তখন মাকামে ইবরাহিমে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন। আল্লাহ তা উচ্চ করে দেন।’

হজ দ্বারা স্থাপিত হয় বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর মহামিলনের সুন্দরতম এক দৃশ্য। হজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এতে রয়েছে মাকামে ইবরাহিমের মতো প্রকৃষ্ট নিদর্শন। আর যে লোক এর ভেতরে প্রবেশ করেছে, সে নিরাপত্তা লাভ করেছে। আর এ ঘরের হজ করা হলো মানুষের ওপর আল্লাহর প্রাপ্য, যে লোকের সামর্থ্য রয়েছে এ পর্যন্ত পৌঁছার। আর যারা অস্বীকার করবে (তাদের স্মরণ রাখা উচিত) আল্লাহ বিশ্ববাসীর মুখাপেক্ষী নন।’ (সুরা আলে ইমরান ৯৭)

প্রিয় নবী হজের ফজিলত সম্পর্কে বলেছেন, ‘বিশুদ্ধ ও কবুল হজ পৃথিবী ও পৃথিবীর যাবতীয় বস্তু অপেক্ষা উত্তম। বেহেশত ছাড়া আর কোনো কিছুই এর প্রতিদান হতে পারে না।’ আরেক বর্ণনা থেকে জানা যায়, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে হজ করবে, হজ পালনকালে স্ত্রীমিলন কিংবা সে সম্পর্কে আলোচনা এবং কোনো প্রকার গুনাহের কাজেও লিপ্ত না হয়, সে (হজ শেষে) সদ্যোজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ অবস্থায় ঘরে প্রত্যাবর্তন করবে।’

বিশ্বের মুসলমানদের ঐক্য প্রতিষ্ঠায় হজের ভূমিকা অপরিসীম। প্রতি বছর হজ উপলক্ষে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা সমবেত হন মক্কায়। বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মুসলমানরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হন। এতে পরস্পর ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি পায়। গড়ে ওঠে ঐক্য। তারা কাবাকে সম্মুখে রেখে একত্রে এক আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হন এবং হজ শেষে নিষ্কলুষ হয়ে বাড়িতে ফেরেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত