শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

যেভাবে তেলাপোকা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বে

আপডেট : ২২ মে ২০২৪, ১১:১৮ এএম

পৃথিবীতে অতিকায় প্রাণীরা লোপ পেলেও টিকে আছে তেলাপোকা। এক গবেষণায় জানা গেছে এর বৃত্তান্ত। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

বাংলা ভাষার বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার বিলাসী গল্পে লিখেছিলেন ‘টিকিয়া থাকাই চরম সার্থকতা নয়, এবং অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে।’ তার কথার মধ্যেই তেলাপোকা বা আরশোলা নামক প্রাণীর পরিচয় পাওয়া যায়। পৃথিবীতে যেখানে মানুষ আছে সেখানেই নাকি তেলাপোকাও আছে। সম্প্রতি তেলাপোকা নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, এর আদি উৎস দক্ষিণ এশিয়া। যদিও পরিচিত এ প্রাণীটির নাম জার্মান তেলাপোকা। তবে সেটি নাকি দক্ষিণ এশিয়া থেকেই ইউরোপে বিস্তার লাভ করেছে। আর মানুষকেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে তারা। যে কারণে যেখানে মানুষ গিয়েছে, সেখানে তাদেরও উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

নেচার ডটকম জানাচ্ছে, বিশ্বের যেখানে মানুষের বাসস্থান গার্হস্থ্য পোকা হিসেবে পরিচিত তেলাপোকারও অবস্থান আছে সেখানে। যদিও তারা জার্মান তেলাপোকা নামে পরিচিত, তবে এটি মূলত জার্মানি থেকে আসেনি। প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেসে সোমবার প্রকাশিত এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রাণীটি দক্ষিণ এশিয়ায় উদ্ভূত হয়েছিল। মানব বাসস্থানের সঙ্গে সখ্যের কারণে বিশ্বব্যাপী এটি ছড়িয়ে পড়ে।

উৎস

তেলাপোকার গল্পকে শুধু পোকার গল্প বলতে চান না বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন এটি মানুষেরও গল্প। বেলর কলেজ অব মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক এবং কীটপতঙ্গের জিন গবেষক স্টিফেন রিচার্ডস বলেন, এটি শুধু পোকামাকড়ের নয়, মানুষেরও গল্প। ৪৫০০ প্রজাতির তেলাপোকার মধ্যে জার্মান তেলাপোকা সর্বত্র পাওয়া যায়। এটি অন্যান্য তেলাপোকার প্রজাতিকে পরাভূত করে বিশ্বের প্রায় সব ঘরেই ছড়িয়ে পড়েছে। এই পোকা মানুষের এক নৈমিত্তিক সমস্যা হয়ে আছে, যাদের খোলা প্রকৃতিতে পাওয়া যায় না। ভার্জিনিয়া টেকের শহুরে কীটপতঙ্গ ব্যবস্থাপনার অধ্যাপক ডিনি মিলার বলেন, মানুষই তাদের খাদ্য, আর্দ্রতা এবং উষ্ণতা দিয়ে যাচ্ছে। তারা মূলত এসব কারণেই আমাদের সঙ্গে আছে।

সুইডিশ জীববিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াসকে বলা হয় প্রথম বিজ্ঞানী, যিনি তেলাপোকা নিয়ে গবেষণা করেন। যে পোকাকে তিনি ১৭৭৬ সালে ‘ব্লাটেলা জার্মানিকা’ নাম দিয়েছিলেন। যে কারণে মনে করা হতো এর আদি উৎস জার্মানি। তবে নতুন গবেষণায় যুক্তরা বলছেন, তেলাপোকা সেখান থেকে উদ্ভূত হয়নি। যদিও তারা ইউরোপেও মানুষের ঘরে বসবাস করতে থাকে এবং তারপর সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

এমন তথ্য দিয়েছেন গবেষক কিয়ান ট্যাং, যিনি ম্যাসাচুসেটসের বোস্টনের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী। ট্যাং এবং তার সহকর্মীরা অস্ট্রেলিয়া, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইউক্রেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ১৭ দেশ থেকে সংগৃহীত ২৮১টি ‘জার্মান তেলাপোকা’র জিনোম বিশ্লেষণ করেন। তারা এসব জিনোমের মধ্যে মিল এবং পার্থক্য বিশ্লেষণ করেন। তারা দেখতে পেয়েছেন, জার্মান তেলাপোকার সবচেয়ে কাছের আত্মীয় সম্ভবত এশিয়ান ‘ব্লাটেলা অসহিনাই’, যা এখনো দক্ষিণ এশিয়ায় পাওয়া যায়। সম্ভবত প্রায় ২১০০০ বছর আগে এ দুই প্রজাতি একে অপর থেকে আলাদা হয়।

বিস্তার

গবেষকরা বলছেন, এরপর প্রায় ১২০০ বছর আগে ব্লাটেলা জার্মানিকা ইসলামি উমাইয়া এবং আব্বাসীয় খিলাফতের বাণিজ্যিক ও সামরিক যানবাহনের সঙ্গে করে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবেশ করে। এটি প্রায় ৩৯০ বছর আগে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার উত্থানের কালে ডাচ এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে ব্যবহৃত যানবাহনের সঙ্গে করে দক্ষিণ এশিয়া থেকে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। প্রায় এক শতাব্দী পর ‘জার্মান তেলাপোকা’ ইউরোপে যাত্রা করে এবং সেখান থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং এ গবেষণায় যুক্ত থিও ইভানস বলেন, আমরা দেখতে পেয়েছি যে, জার্মান তেলাপোকার ধারাটি ব্লাটেলা অসহিনাই-এর সঙ্গে প্রায় অভিন্ন, যে প্রজাতিটি বঙ্গোপসাগর, পূর্ব ভারত থেকে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারে বসবাস করত। তিনি বলেন, আমরা প্রায় ১২০০ বছর আগের এ প্রাণীর ছড়িয়ে পড়ার একটি পথ খুঁজে পেয়েছি, যা ছিল পূর্ব ভারত থেকে পশ্চিম দিকে। সম্ভবত ইসলামিক উমাইয়া বা আব্বাসীয় খিলাফতের বাণিজ্য ও সামরিক কার্যকলাপের মাধ্যমে। পরবর্তী আরেকটি পথে তেলাপোকা প্রায় ৩৯০ বছর আগে ইন্দোনেশিয়া দ্বীপপুঞ্জে প্রবেশ করেছিল। সম্ভবত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে তারা ছড়িয়ে পড়ে। এ কোম্পানিগুলো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে মসলা, চা, তুলা এবং অন্যান্য পণ্যের ব্যবসা করত এবং ইউরোপে ফিরে আসত। তিনি বলেন, ‘আমরা অনুমান করেছি যে, জার্মান তেলাপোকা প্রায় ২৭০ বছর আগে ইউরোপে এসেছিল। ইউরোপ থেকে জার্মান তেলাপোকা প্রায় ১২০ বছর আগে বিশ্বের বাকি অংশে ছড়িয়ে পড়ে, সম্ভবত বাষ্পীয় জাহাজে করে।’

গবেষকরা জানাচ্ছেন, ব্লাটেলা জার্মানিকা প্রায় এক দশমিক এক থেকে এক দশমিক ছয় সেন্টিমিটার লম্বা হয়। রঙের দিক থেকে তারা গাঢ় বাদামি থেকে প্রায় কালো পর্যন্ত হয়ে থাকে। এরা হলো সর্বভুক যারা মাংস, শর্করা এবং চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ইভান্স বলেন, বেঁচে থাকার জন্য তেলাপোকাকে মানুষ নজর এড়িয়ে চলতে হয়। জার্মান তেলাপোকাগুলো নিশাচর হিসেবে বিবর্তিত হয়েছে, খোলা জায়গা এড়িয়ে চলে তারা। আর ডানা থাকলেও তারা উড়ে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ভারতের ফ্রন্টলাইন ডটকম জানাচ্ছে, মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা ও বসবাসের যত উন্নতি হয়েছে তত তেলাপোকার ‘উপনিবেশ’ স্থাপিত হয়েছে। যেমন বাষ্প ইঞ্জিনের মাধ্যমে গতি পেয়েছে সড়ক ও জলপথের যানবাহন। বাণিজ্যের বিশ্বায়নের ফলে এক দেশ থেকে আরেক দেশে পণ্য সরবরাহ হয়েছে। মানুষ তার ঘরে পয়ঃনিষ্কাশনের নালা তৈরি করেছে, ঘরে উত্তাপ রাখার জন্য চিমনি বসিয়েছে, রান্নাঘর সাজিয়েছে। আর এসব স্থান হয়ে উঠেছে তেলাপোকার আশ্রয়স্থল। ইউরোপের বাইরে বিষয়টি প্রথম বোঝা যায় ১৮৪২ সালে নিউ ইয়র্কে যখন পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়। জীববিজ্ঞানী কিয়ান ট্যাং বলেন, নিউ ইয়র্কবাসী বিশ্বাস করত যে, পানি সরবরাহের নালা দিয়ে তাদের শহরে তেলাপোকা ছড়িয়ে পড়েছে।

নামকরণ

গবেষকরা বলছেন, সাত বছরের যুদ্ধের সময় (১৭৫৬-৬৩) সেনাবাহিনীর খাবারে তেলাপোকা পাওয়া যায়। তখন সেনা সদস্যরা প্রতিপক্ষের নামে এ পোকাকে ডাকত। যেমন রাশিয়ানরা একে ‘প্রুশিয়ান তেলাপোকা’ বলে ডাকত। অন্যদিকে ব্রিটিশ এবং প্রুশিয়ান সৈন্যরা একে ‘রাশিয়ান তেলাপোকা’ বলত। সাত বছরের এ যুদ্ধ হয়েছিল ইউরোপের দেশগুলোর ভেতর। ১৭৬৭ সালে সুইডিশ জীববিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াস প্রজাতিটির নাম দেন ‘ব্লাটা জার্মানিকা’। লাতিন ভাষায় ‘ব্লাট্টা’র অর্থ ‘আলো এড়িয়ে যায়’। আর ‘জার্মানিকা’ নাম দেওয়া হয় কারণ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল ওই দেশ থেকে। আর ইংরেজিতে একে ‘ককরোচ’ বলা হয়, যার উৎপত্তি ‘ক্যাকারুটচ’ থেকে। শব্দটি প্রথম চালু হয় ১৬২৪ সালে। ভার্জিনিয়ায় এক ক্যাপ্টেন জন স্মিথের লেখা চিঠিতে শব্দটি পাওয়া যায়। যিনি এ পোকাকে এভাবে বর্ণনা করেছিলেন, একটি ইন্ডিয়া পোকা, যাকে স্প্যানিশরা ক্যাকারুটচ বলে ডাকে, যা বুকে হাঁটে এবং ময়লা খায়। ‘ককরোচ’ নামটি দিয়েছিলেন চর্লস ডারউইন ১৮৫৯ সালে। ডারউইন ‘অন দ্য অরিজিন অব স্পিসিস’-এ ‘ছোট এশিয়াটিক তেলাপোকা (ককরোচ)’ উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা জানান, তেলাপোকাকে আরশোলাও বলা হয়। আবার এদের আঞ্চলিক নামও রয়েছে। যেমন- ‘তেলাচোরা’ বা তেলচোট্টা। এখানে এমন ভাবা যেতে পারে যে, এই পতঙ্গগুলো তেলের পাত্র থেকে ডুব দিয়ে এসেছে। কারণ, এদের দেহ সবসময়ই তেলতেলে, চকচকে।

উইকিপিডিয়া থেকে জানা যায়, তেলাপোকারা বহু পুরনো, এদের প্রায় ৩২০ মিলিয়ন বছর পুরনো কার্বনিফেরাস যুগেও পাওয়া যায়। তেলাপোকার বিশেষ চোষ্য মুখাংশ নেই, বরং তাদের আছে চর্বণ মুখাংশ, যা প্রাচীন নিওপ্টিরান পোকার মতো। এদের যততত্র দেখা যায় এবং যে কোনো পরিবেশে টিকতে পারে। যেমন মেরু অঞ্চলের ঠান্ডা থেকে শুরু করে তীব্র উষ্ণ পরিবেশ। উষ্ণ অঞ্চলের তেলাপোকারা নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের চেয়ে আকারে বড় হয়। জার্মান গ্রেগারিয়াস তেলাপোকার বিস্তৃত সামাজিক গঠন রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে একই বাসস্থান ব্যবহার, সামাজিক নির্ভরতা, তথ্য স্থানান্তর এবং আত্মীয় চিনতে পারা ইত্যাদি। মানব সংস্কৃতিতে তেলাপোকার অস্তিত্ব অনেক পুরনো। সারা পৃথিবীতে তাদের নোংরা ক্ষতিকর প্রাণী হিসেবে দেখা হয়, যদিও বেশিরভাগ প্রজাতিই অহিংস এবং সারা পৃথিবীর বিভিন্ন পরিবেশে এদের বাস করতে দেখা যায়। দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়্যাদর দেশে আরশোলা বা তেলাপোকাকে দিয়ে দৌড়বাজি করানো হয় এবং এটি এক ধরনের মনোরঞ্জক খেলা, স্থানীয় আমেরিকানদের জন্য।

গবেষকরা বলছেন, তেলাপোকার অভিযোজন ক্ষমতা অনেক। তাদের শরীরে জিনের গঠনও জটিল। যে কারণে তারা খাবারের গন্ধ সহজে পেতে পারে। নিজেকে সুরক্ষিত রাখারও দ্রুত প্রস্তুতি নিতে পারে। তেলাপোকা সহজে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে পারে। বিশ্ব জুড়ে তারা রোগ বিস্তারের জন্যও দায়ী। তেলাপোক নিধনে বিশ্ব জুড়ে বিপুল ধরনের রাসায়নিক ও টোটকার ব্যবহার দেখা যায়। এ নিয়ে গড়ে উঠেছে বিশাল শিল্প। তারপরও এ পোকা থেকে মানুষের নিস্তার নেই। অনেকে আবার তেলাপোকা ভয়ও পায়। যা মানুষের স্বাভাবিক আচরণ হয়ে ওঠেছে। মানুষের শরীরের অভ্যন্তরেও কখনো তেলাপোকা বাস করছে বলে খবরে পাওয়া যায়।

তেলাপোকা যেন মানুষের আজন্ম এক শত্রু, যারা একই সঙ্গে বসবাস করে। মানুষ নিজেই তার জীবনযাপনের মাধ্যমে এ পোকাকে লালন-পালন করে আসছে। আবার তাকে ধ্বংসের জন্য কত প্রস্তুতি নিয়ে আসছে। কিন্তু মানুষের সব চেষ্টাকে ব্যর্থ করে টিকে আছে সামান্য তেলাপোকা! 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত