রোববার, ১৬ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

শতবর্ষী গাছ কেটে শতকোটি লোপাট

আপডেট : ২২ মে ২০২৪, ০৬:২১ এএম

মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর-কুষ্টিয়া, মেহেরপুর-মুজিবনগর ও মুজিবনগর-দর্শনা সড়কের পাশে শতবর্ষী অনেক গাছ ছিল। কিন্তু সড়ক সম্প্রসারণের নামে ২০ বছরে প্রায় ৭ হাজার মধ্যবয়সী এবং শতবর্ষী গাছ কাটা হয়েছে। এসব সরকারি গাছ শতকোটি টাকায় বিক্রি করা হলেও দরপত্রে নামমাত্র মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ২০ বছরে গাছ কেটে সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে মাত্র সাড়ে ৩ কোটি টাকা। বিপরীতে সিন্ডিকেটের পকেটে গেছে শতকোটি টাকা।

গাছগুলোর মালিক মেহেরপুর জেলা পরিষদ। আর সে কারণে জেলা পরিষদের নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েই বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতে প্রধান টার্গেট হয় সড়কের পাশের সবুজ তরতাজা শতবর্ষী এই গাছগুলো। সড়ক সম্প্রসারণের নামে ২০ বছরে এসব সড়কের প্রায় ৭ হাজার মধ্য ও শতবর্ষী গাছ কেটে সিংহভাগ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে জেলা পরিষদ, সড়ক বিভাগের কিছু কর্মকর্তাসহ একটি সিন্ডিকেট। এবারও একই অজুহাতে সড়ক ও জনপথ বিভাগ থেকে তালিকা করে আরও ১ হাজার ৫০০ গাছ কাটার চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে মেহেরপুর জেলা পরিষদ।

মেহেরপুর জেলা পরিষদের বক্তব্য, সড়ক সম্প্রসারণসহ সড়ককে নিরাপদ রাখতে ঝুঁকিপূর্ণ ১ হাজার ৫০০ গাছ কাটার তালিকা দিয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। অন্যদিকে সড়ক ও জনপথ বিভাগ বলছে, আমরা কাটারযোগ্য গাছের তালিকা দিয়েছি। গাছ কাটার সিদ্ধান্ত জেলা পরিষদের। যেহেতু গাছের মালিক জেলা পরিষদ।

২০ বছর আগেও মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর-কুষ্টিয়া, মেহেরপুর-মুজিবনগর ও মুজিবনগর-দর্শনা সড়কের শতবর্ষী গাছের ঝাঁকড়া ডালপাতায় আচ্ছাদিত সবুজের সৌন্দর্যভরা দৃশ্য দেখতে পর্যটকরা ভিড় করতেন, ছবি তুলতেন। পথচারীরা গাছের সুশীতল ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিতেন, আড্ডা দিতেন। স্থানীয়রা গাছের নিচে তৈরি মাচায় গরমে খালি গায়ে গল্প শেষে শান্তির ঘুমে রাত পার করত। এখন এসব ইতিহাসে রূপ নিয়েছে।

মেহেরপুরে রাস্তা সম্প্রসারণের অজুহাতে গাছ কাটা শুরু হয় বিএনপির আমল থেকে। ২০০৪ সালে একই সড়কে বাছাই করা আরও ৮৭টি ৭ কোটি টাকা মূল্যের গাছ ৫৪ লাখ টাকায় কাটা হয়। প্রথম ২০১৯ সালে মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা সড়কের শতবর্ষী ৬৫টি বিশাল আকৃতির ৩ কোটি টাকার গাছ ৩৭ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। ২০২২ সালে মুজিবনগর-দর্শনা সড়কে ১৪ কোটি টাকা মূল্যের ১৩৯টি বিশালাকার গাছ মাত্র ৭৫ লাখ টাকায় কাটা হয়। ২০২৩ সালে মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সড়কে ছোট-বড় ৩ হাজার ১৩টি গাছ ২ কোটি টাকায় কাটা হয়েছে। দরপত্র অনুযায়ী, এই সড়কের প্রতিটি গাছের মূল্য এসেছে সাড়ে ৬ হাজার টাকা। অথচ এই সড়কে ৫০ কোটি টাকার গাছ ছিল বলে দাবি গাছ ক্রয়-বিক্রয় ব্যবসায়ীদের। ২০২৪ সালে মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা সড়ককের অবশিষ্ট ৯৭৬টি ছোট-বড় গাছ কাটার তালিকা করা হয়েছে। একই উদ্দেশ্যে মেহেরপুর-মুজিবনগর সড়কের অবশিষ্ট ৪৬৪টি গাছ কেটে সড়ক ফাঁকা করার তালিকা হয়েছে। মেহেরপুর সওজের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মিজানুর রহমান স্বাক্ষরিত চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল এবং ১৯ মার্চ দুটি চিঠিতে এই তালিকার অনুমোদন দিয়ে চিঠি জেলা পরিষদকে পাঠিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মরক্ষার দরপত্র আহ্বান করে যেমন কোটি টাকার গাছ লাখ টাকায় পছন্দের ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করা হয়, তেমনি দরপত্র সংখ্যার আড়ালে সংখ্যার ৩ গুণ বেশি গাছ কাটা হয়। এভাবেই ২০ বছরে শতকোটি টাকার সরকারি গাছ কেটে পরিবেশ ধ্বংস করা হলেও সরকারি কোষাগারে গাছ বিক্রির টাকা জমা পড়েছে সাড়ে ৩ কোটি। বিপরীতে সিন্ডিকেটের পকেটে গেছে শতকোটি টাকা।

১৯ মে সরেজমিন দেখা গেছে, একসময়ের সারিবদ্ধ গাছে ছায়াঘেরা এই সড়কগুলো এখন গাছহীন হয়ে পড়েছে। মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা সড়কের ৬০ শতাংশ গাছ ইতিমধ্যে কাটা হয়েছে। মুজিবনগর-দর্শনা সড়কের সহস্রাধিক গাছ কাটা প্রায় শেষ। মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সড়ক এখন গাছশূন্য। মেহেরপুর-মুজিবনগর সড়কের ৩০ শতাংশ গাছ কাটা হয়েছে। সড়কগুলোর অবশিষ্ট গাছ এখন মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে নীরব দাঁড়িয়ে আছে। অথচ সড়ক সম্প্রসারণে মেহেরপুরের বিপরীত চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও দর্শনা অংশের শতবর্ষী গাছগুলো কাটা হয়নি। সেগুলো ঠিকই সরবে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সড়কের গাংনী বামুন্দী গ্রামের মুশারফ হোসেন (৬৫) বলেন, হাজার গাছ রক্ষা করেও সড়ক সম্প্রসারণ করা যেত। এভাবে ঢালাও গাছ কেটে পরিবেশ ধ্বংস করা হয়েছে।

মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা সড়কের আমঝুপি গ্রামের হেমায়েত উল্লাহ (৫৭) বলেন, ‘চোখের সামনে ঝাঁকড়া শতবর্ষী গাছ কাটার দৃশ্য মনে পড়লে বুকটা মোচড় দেয় আজও। গাছের কারণে আগে এলাকা ঠান্ডা থাকত। গাছ কাটার কারণে এখন ঘরে-বাইরে গরম। এবার এই সড়কের অবশিষ্ট গাছ কেটে ধ্বংস করলে আমরা আপত্তি জানাব।’

মুজিবনগর-দর্শনা সড়কের দামুড়হুদা গ্রামের আমির হামজা বলেন, এই সড়কের কোটি টাকার গাছ লাখ টাকায় এবং লাখ টাকার গাছ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। ইলেকট্রিক করাত দিয়ে রাতারাতি গাছ কেটে সড়ক শূন্য করা হয়েছে। তা ছাড়া হয়রানির ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করেনি।

সড়ক সম্প্রসারণের জন্য শতবর্ষী তরতাজা বৃক্ষনিধন প্রসঙ্গে মেহেরপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম বলেন, মেহেরপুর-কুষ্টিয়া রোডের সব গাছ কেটে বিরাণভূমি বানানো হয়েছে। জেলা পরিষদের আপত্তি সত্ত্বেও সওজ, বন বিভাগ মিলে প্রশাসনের নির্বাহী আদেশে ওই গাছ কেটে ফেলেছে। এখন গাছ কাটার সে টাকাও বন বিভাগ জেলা পরিষদকে দিচ্ছে না। মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা সড়ক ফোর লেন হবে। তাই সব গাছ কাটা পড়বে। তা ছাড়া মেহেরপুর-মুজিবনগর সড়কের সব গাছ কাটার বিপক্ষে জেলা পরিষদ। তিনি বলেন, সড়ক বিভাগের কারণে সড়কের পাশের সব গাছ কেটে ফেলতে হচ্ছে। আগে যেসব গাছ কাটা পড়েছে, সেখানে কোনো দুর্নীতি হয়ে থাকলে তার দায়ভার আগের পরিষদের।

মেহেরপুর জেলা বন কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত) হামিম হায়দার বলেন, মেহেরপুর-কুষ্টিয়া রোডের গাছ কাটার ২ কোটি টাকা বন বিভাগের বিভাগীয় ফান্ডে জমা আছে। গাছের মালিকানা দ্বন্দ্ব নিষ্পত্তি না হওয়ায় টাকা জেলা পরিষদকে দেওয়া হয়নি। কারণ সওজ দাবি করছে, গাছ তাদের। তা ছাড়া নিয়ম অনুযায়ী, বন বিভাগ গাছের মূল্য নির্ধারণ করার মালিক। গাছ কাটার মালিক না।

মেহেরপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, মেহেরপুর-কুষ্টিয়া সড়কের ১ হাজার এবং মেহেরপুর-মুজিবনগর সড়কের ৫০০ গাছ সড়ক সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এবার কাটা পড়বে। গাছের ডালপালা সড়ক ও মানুষের জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। তাই গাছগুলো কাটা জরুরি। তা ছাড়া গাছ রক্ষা করে সড়ক সম্প্রসারণ করা না করা সমান। সে কারণে গাছগুলো কাটা হলেও সড়ক বিভাগের কিছু করার নেই।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত