মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ব্যাটিং বিভ্রাটের কারণে দুঃখিত

আপডেট : ২২ মে ২০২৪, ০৬:৪২ এএম

এমন নিয়তিই কি প্রাপ্য ছিল! বাংলাদেশের নিদারুণ ব্যাটিং ব্যর্থতার পর এভাবে ম্যাচ হারিয়ে নিজেদের দেশে অতিথিদের স্বাগত জানাবে যুক্তরাষ্ট্র তা হয়তো কেউই ভাবেননি। তবে হয়েছে তাই। বিশ^কাপের প্রস্তুতির আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেদের প্রথম আন্তর্জাতিক সাক্ষাতে হার মেনে নিতে হয়েছে বাংলাদেশকে। শেষ ওভারে তিন বল বাকি থাকতে হিউস্টনে ৫ উইকেটের জয় তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

বাংলাদেশের দেওয়া ১৫৪ রানের লক্ষ্য তাড়ায় শুরু থেকে সাবধানী শুরু করলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। ৯৪ রানে ৫ উইকেট হারানোর পর মনে হচ্ছিল ম্যাচ থেকে ছিটকেই গেছে স্বাগতিকরা। তবে সব পরিস্থিতি বদলে দেন হারমিত সিং। ১৩ বলের ইনিংসে ২ চার ও ৩ ছক্কায় অপরাজিত ৩৩ রানের ইনিংসে জয় পাইয়ে দেন নিজের দেশকে। অভিজ্ঞ কোরি অ্যান্ডারসন অপরাজিত থাকেন ২৫ বলে ৩৪ রানে। শেষ চার ওভারে ৫৫ রানের সমীকরণ মেলান এ দুজন।

যে টিভি চ্যানেলে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র টি-টোয়েন্টি সিরিজের ম্যাচ সম্প্রচার করছে, তাদের পর্দায় কিছুক্ষণের জন্য ভেসে উঠেছিল বাক্যটা। যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে সম্প্রচারে বিঘ্ন ঘটায় দুঃখিত। বাংলাদেশের ইনিংসের মাঝের দিকের ওভার পাঁচেকের মতো খেলা দেখা যায়নি। ইনিংস শেষে মনে হতে পারে সেই না দেখাটাও স্বস্তির কারণ দেখলে হতাশা বাড়ত। বেশিরভাগই অপেশাদার ক্রিকেটারদের নিয়ে গড়া যুক্তরাষ্ট্র ক্রিকেট দলের বিপক্ষেও বাংলাদেশের এমন ব্যাটিংয়ের পর দর্শকরা দাবি করতেই পারেন যথাযথ কর্র্তৃপক্ষ (পড়ুন টিম ম্যানেজমেন্ট) যেন জানায়, ব্যাটিং বিভ্রাটের কারণে দুঃখিত।

বাংলাদেশ দলের ব্যাটিংটা যে ভরসার জায়গায় নেই, সেটা জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই স্পষ্ট হয়েছে। মার্চে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজের দুটো ম্যাচে বেশ ভালো ব্যাটিং করা দলটার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এমন হতশ্রী অবস্থা কী করে হলো, তার উত্তর চন্ডিকা হাথুরুসিংহে এবং ডেভিড হেম্পের কাছে চাইতে হবে। বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা অবশ্য উইকেটের মান নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছিলেন জিম্বাবুয়ে সিরিজ শেষে, মনে হতে পারে তাদের ভালো না খেলার পেছনে ২২ গজের ভূমিকাই বেশি দায়ী। মার্কিন মুল্লুক থেকেও হয়তো এরকমই কোনো ব্যখ্যা আসবে। অচেনা মাঠ, অচেনা উইকেটই দায়ী। কিন্তু তাতে সত্যিটা আড়াল হচ্ছে না। বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং যে একদমই টি-টোয়েন্টি সুলভ নয়, সেটা পিথাগোরাসের উপপাদ্যের মতোই প্রমাণিত। লিটন দাস কুৎসিত ব্যাটিং করে ১৫ বলে ১৪ রান করে লেগ বিফোর উইকেটের শিকার। দুবার জীবন পেয়েও উইকেটের মূল্য বোঝেননি ‘মোনালিসা’, উইকেটের পেছনে ক্যাচ পড়া আর সহজ রান আউট থেকে বেঁচে যাওয়ার পরও অল্পতেই থেমে গেছে তার ইনিংস। সৌম্য সরকারও তার অনুগামী। রানের খরায় ভুগতে থাকা অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ১১ বলে ৩ রান করার পর হয়েছেন স্টাম্পড। বোঝাই যাচ্ছে ডট বলের চাপেই তার আত্মাহুতি।

সাকিব আল হাসানের ডাকে সাড়া দেননি তাওহিদ হৃদয়, তাতেই অলরাউন্ডার হয়েছেন রান আউট। বিপিএলে একবার এভাবেই ডেভিড ওয়ার্নারকে রান আউট করিয়ে দিয়েছিলেন হৃদয়। সাকিব জানেন, দলের হাল ধরতে তাকেই স্ট্রাইকে থাকতে হবে বেশি বেশি বলে। সেজন্যেই কি রান নেওয়ার তাড়া? ১২ বলে ৬ রানেই শেষ সাকিবের ইনিংস। সাকিবকে আউট করার শাপমোচনই বোধহয় করলেন হৃদয়। ৪৭ বলে ৫৮ রানের ইনিংস খেলে আউট হয়েছেন ইনিংসের একদম শেষ বলে। সেটা যদিও ছিল ফুলটস, হতে পারত ছক্কাও। কিন্তু হলো না যে ব্যাটে-বলে। রিমোটের চাপে চ্যানেল বদলেই দেখা যাচ্ছিল আইপিএলের প্লে-অফ। সেখানে কলকাতা নাইট রাইডার্সের ভেঙ্কটেশ আইয়ার আর শ্রেয়াস আইয়ারের ব্যাটিং দেখলে হৃদয়ের ৪৭ বলে ৫৮ রানের ইনিংসটাকে মনে হবে মেট্রোরেলের পাশে লক্কড়-ঝক্কড় লোকাল বাস। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লোকাল বাসই যেভাবে নিম্ন আয়ের মানুষের ভরসার বাহন, তেমনি বাংলাদেশের দলীয় সংগ্রহতেও হৃদয়ের এই একমাত্র হাফসেঞ্চুরিই ভরসা। সেটা না হলে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষেই যে হৃৎকম্পন বেড়ে যেত!

মাহমুদউল্লাহর টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারটাই এক রহস্য। ২০২১ সালে অধিনায়ক, ২০২২ সালে দল থেকে বাদ পড়ে টিভি চ্যানেলে বিশেষজ্ঞ আর ২০২৪ সালে দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ! বিপদে ভরসা দিয়েছেন ২২ বলে ৩১ রানের ইনিংস খেলে। দুটি চার আর একটি ছক্কা। ১২তম ওভারে নেমেছিলেন, ১৯তম ওভার বিদায় নিয়েছেন। শুধু অতৃপ্তি একটা জায়গায়, স্ট্রাইক-রেটটা আরেকটু ভালো কি হতে পারত না! জাকের আলি অনিকের ২ বাউন্ডারিতে ৫ বলে ৯ কার্যকর ইনিংস, তাতেই রানটা দেড়শ ছাড়াল।

টাকা এবং ডলারের বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত বিনিময় হার হিসাব করলে, বাংলাদেশের ইনিংসে ৬ উইকেটে করা ১৫৩ রানটা দেড় ডলারের কিছু কম। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে বোলিং দিয়ে ম্যাচে পার পাওয়া যাবে বটে, তবে এ ব্যাটিং বিভ্রাট রীতিমতো আতঙ্ক ছড়াচ্ছে মূল পর্বে শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে কী হবে সেই আশঙ্কায়। ভালো-খারাপের প্রসঙ্গ পরে, এই ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিংয়ে টি-টোয়েন্টির মেজাজটাই যে অনুপস্থিত। টি-টোয়েন্টি বিশ^কাপ খেলতে যাওয়ার আগে এই ব্যাপারটাই সবচেয়ে ভয়ের।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত