সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ঐতিহ্যের বুনিয়াদি পাঠশালা মক্তব

আপডেট : ২৪ মে ২০২৪, ১২:৩১ এএম

মা তখনো জায়নামাজে বসে আছেন। ফজরের নামাজ আদায়ের তাসবিহ পাঠ ও কোরআন তিলাওয়াতে মশগুল। ইশরাকের নামাজ পড়েই হয়তো গৃহস্থালির কাজ শুরু করবেন। ইতিমধ্যে কলিজার টুকরো সন্তানের কোমলকণ্ঠে ভেসে আসে মায়াবী এক ডাক ‘মা’! মক্তবে যাওয়ার সময় হয়েছে। কিছু খেয়ে দ্রুত মক্তবে চলে যেতে হবে।

এমন তাগাদায় মা দ্রুত কোমলমতি সন্তানকে মক্তবে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করে দেন। তারা ছুটে যায় মক্তবে। সেই মক্তবেই বপন হয় কোমল হৃদয়ে নৈতিকতার বীজ। এটি যেন মুসলিম পরিবারের ঐতিহ্যের বুনিয়াদি পাঠশালা। মক্তবের শিক্ষার্থীদের তেলাওয়াতে কোরআনের সুর যেন প্রতিটি ভোরে নুর ছড়িয়ে দেয়। কখনো ঘন কুয়াশা ভেদ করে শিশিরভেজা পথ দিয়ে, কখনো বৃষ্টিভেজা গ্রামীণ পথ মাড়িয়ে, কখনো সূর্যরাঙা পথ পাড়ি দিয়ে শিশু-কিশোরের দল ছুটে চলে মক্তবে। দিনের সূচনায় মক্তবই যেন তাদের প্রথম গন্তব্য। ভোরে কোরআন বুকে নিয়ে মক্তবে শিশু-কিশোরদের ছুটে চলার সেই পবিত্র দৃশ্য আলোকিত আগামীর ইঙ্গিত বহন করে। তাই বলা হয়, মক্তব আলোকিত প্রজন্ম গড়ার সুতিকাগার।

মক্তবে কোরআন তেলাওয়াতের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক কচিকাঁচা ছেলেমেয়েদের নামাজ, ওজু, তায়াম্মুম ও গোসলের নিয়মসহ জীবনঘনিষ্ঠ দোয়া ও জরুরি মাসয়ালা-মাসায়েলের তালিম দেন। সেই সঙ্গে মা-বাবা ও প্রতিবেশীর হক, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা, ছোটদের প্রতি স্নেহ প্রদর্শন, সামাজিক শিষ্টাচার, মানবিক মূল্যবোধ, কর্তব্যপরায়ণতা, দেশাত্মবোধসহ জরুরি আদব ও সভ্যতার তালিমও দেওয়া হয় মক্তবে।

সর্বোপরি ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতির আলোকধারায় আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ এবং আলোকিত প্রজন্ম গড়তে মক্তবের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আর তাই তো মক্তবের চাহিদা পূরণে আগের দিনে পাড়া-মহল্লার বিভিন্ন বাড়ির আঙিনাতেও মক্তবের আদলে শিক্ষা দেওয়া হতো। এলাকার অনেক নেককার শিক্ষিত মহিলারা নিজেদের ঘরে পাড়া-পড়শির আগ্রহী ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে কোরআন তেলাওয়াত শিক্ষা দিতেন। আমি নিজেও বাল্যকালে মক্তবে পড়েছি। আবার আমার সর্বকনিষ্ঠ খালা, যিনি নিজ বাড়ির আমগাছের তলায় প্রত্যহ বাদ ফজর অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কোরআনের তালিম দিতেন। আমি তার কাছেও পড়েছি। নিজেদের ঘরের বারান্দায় ছোট ফুপুর কাছ থেকেও কোরআন মাজিদ শেখার স্মৃতি হৃদয়ে এখনো সজীব হয়ে আছে। কোরআন তেলাওয়াতের মতো সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতটি একসময় মুসলিম সমাজের প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে জারি ছিল মক্তবের অবদানেই। ফজরের নামাজ আদায় করেই মুরুব্বিরা কোরআন তেলাওয়াতে মশগুল হয়ে যেতেন। কালো ফ্রেমের বড় চশমা চোখে আমার দাদির কোরআন তেলাওয়াতের দৃশ্য আমার চোখে এখনো যেন ভাসছে।

সন্ধ্যার পরও ঘরবাড়িতে মুরুব্বিরা নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করতেন এবং ছেলেমেয়েদের কোরআন তেলাওয়াতে বসিয়ে দিতেন। ফলে প্রায় প্রতিটি ঘর থেকে সকাল-সন্ধ্যায় কোরআন তেলাওয়াতের সুমধুর আওয়াজ ধ্বনিত হতো। পবিত্রতার সৌরভ ছড়িয়ে পড়ত ঘরে ঘরে। স্বচ্ছ নৈতিক চেতনা সঞ্চারিত হতো অন্তরে অন্তরে। কারণ কোরআনের তেলাওয়াতের ফলে মুমিনের অন্তরে সৃষ্টি হয় তাকওয়ার আবহ। শানিত হয় ইমানি স্পৃহা। যেমনটি ইরশাদ করেছেন স্বয়ং আল্লাহ, ‘মুমিন তো তারাই যাদের হৃদয় কম্পিত হয় যখন আল্লাহকে স্মরণ করা হয় এবং যখন তার আয়াত তাদের কাছে তেলাওয়াত করা হয়, তখন তা তাদের ইমান বৃদ্ধি করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের ওপরই নির্ভর করে।’ (সুরা আনফাল ০২)

মক্তবকেন্দ্রিক কোরআন-হাদিসের আলোকে বুনিয়াদি তালিমের সুচারু ব্যবস্থা ছিল বলেই এখনকার মতো শিশু-কিশোরদের লাগামহীন দুরন্তপনা, তরুণদের বখাটেপনা এবং আচার-অনুষ্ঠানে বেহায়াপনার সয়লাব তখন ছিল না। সমুন্নত ছিল নৈতিক মূল্যবোধ, আদর্শিক চেতনা ও সামাজিক কর্তব্যপরায়ণতা। ছিল বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা, ছোটদের প্রতি স্নেহ-মমতা, দেশপ্রেম ও আমানতদারিতা।

ছোটবেলায় মক্তবে পাওয়া বুনিয়াদি শিক্ষা ধারণ করে বেড়ে ওঠার কারণে অনেকে অনেক উচ্চ পদমর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েও দ্বীনি অনুরাগ, নিরহংকারী চাল-চলন, বিনয়-ভদ্রতার গুণে বিভূষিত। পরিণত বয়সে এসেও ছোটবেলার মক্তবের শিক্ষাই হয়ে ওঠে নীতি-নৈতিকতায় টিকে থাকার মূল বুনিয়াদ।

অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, কোমলমতি শিশু-কিশোরদের ভোরে কোরআন বুকে মক্তবপানে ছুটে চলার সেই সুন্দরতম পবিত্রমুখর দৃশ্য এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। ভোরেই তাদের নিয়ে মা-বাবারা ছুটে যান তথাকথিত আধুনিক শিক্ষালয়ে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কোমল কণ্ঠে সম্মিলিতভাবে কোরআন তেলাওয়াত ও কালেমাসহ প্রয়োজনীয় দোয়া পাঠের সেই আওয়াজ এখন আর আগের মতো শোনা যায় না। মক্তবগুলোও এখন আগেকার সময়ের মতো প্রাণবন্ত নয়।

কোরআন তেলাওয়াত শিক্ষাদান এবং ঘরে ঘরে কোরআন তেলাওয়াতের যে ঐতিহ্য আবহমানকাল থেকে জারি ছিল, সেই ঐতিহ্য এখন যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। সকাল-সন্ধ্যায় পাড়া-মহল্লার ঘরবাড়ি থেকে কোরআন তেলাওয়াতের সেই সুমধুর আওয়াজ এখন আর তেমন ভেসে আসে না। ভেসে আসে বিভিন্ন গান-বাজনার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি। তথ্যপ্রযুক্তির নগ্ন থাবায় তথাকথিত আধুনিকতা ও অপসংস্কৃতির আগ্রাসনে কচি বয়সেই ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন ধরনের নৈতিকতাবিবর্জিত দেশি-বিদেশি নাচ-গান শিখছে। শিখছে নানা ধরনের কৌতুক। এভাবে নবপ্রজন্ম নিমজ্জিত হচ্ছে অনৈতিকতার অতল গহ্বরে। ক্রমেই কোরআনের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে চলেছে সমাজ।

এমন ক্রান্তিকালে নবপ্রজন্মকে আদর্শ মানুষরূপে গড়ে তুলে সমাজকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে ঐতিহ্যের বুনিয়াদি পাঠশালা মক্তবগুলোকে সজীব করে তুলতে হবে। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় গড়ে তুলতে হবে মক্তব। সুসংহত করতে হবে মক্তবের ব্যবস্থাপনাকে।

দুনিয়ার সাময়িক চাকচিক্য ও ভোগ-বিলাস নয়, বরং উভয় জগতের চিরশান্তি ও কল্যাণের ফল্গুধারায় অবগাহন করতে সন্তানদের কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষাধারায় আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সন্তানদের পুরো জীবনকে প্রকৃত আলোকধারায় উদ্ভাসিত করতে জীবনের সূচনা পর্বেই মক্তবের বুনিয়াদি শিক্ষার প্রতি অধিকতর যতœবান হতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে ঘরে ঘরে কোরআন তেলাওয়াতের পবিত্র ঐতিহ্য।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত