মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

এই অধঃপতন অঘটন নয় নিয়তি

আপডেট : ২৪ মে ২০২৪, ০৭:১৩ পিএম

ঈশপের গল্পের মিথ্যাবাদী রাখালের মতোই অবস্থা এখন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের। বাঘ এসেছে বাঘ এসেছে বলতে বলতে সত্যি সত্যিই একদিন বাঘ এসে পড়ল, সেদিন আর কেউ সাড়া না দেওয়ায় যেভাবে বাঘের পেটে যেতে হয়েছিল সেই মিথ্যাবাদী রাখালকে, একই রকমভাবে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, ফাঁপা আত্মবিশ্বাসের গালগল্প আর অযাচিত তারকাখ্যাতির মোড়কটা খসে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে টানা দুটো টি-টোয়েন্টি ম্যাচ হেরে।

এমনটা যে হবে, সেই আশঙ্কা করছিলেন সাবেক ক্রিকেটার থেকে শুরু করে ক্রিকেট প্রশাসনের সঙ্গে অতীতে যুক্ত ছিলেন এমন অনেকেই। কিন্তু সবই ঈর্ষান্বিত মানুষের নিষ্ফল আস্ফালন ভেবে এড়িয়ে গেছেন বাংলাদেশের বর্তমান ক্রিকেট প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। ফল, প্রথম দল হিসেবে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ১০০ ম্যাচ হারার কৃতিত্ব (!)।

ক্রিকেটের তিনটি আন্তর্জাতিক সংস্করণের মধ্যে টি-টোয়েন্টিই নবীনতম। ১২০ বলের ইনিংসের এই খেলার উদ্ভাবন ইংল্যান্ডে, মূলত তরুণ প্রজন্মকে ফুটবল থেকে ক্রিকেটমুখী করতেই ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড প্রচলন করে সংক্ষিপ্ত এই সংস্করণের। খেলায় ফল আসা, উত্তেজনা জিইয়ে রাখা এবং দর্শকদের বিনোদন দেওয়া- অল্প সময়ের ভেতর খেলা শেষ করা মূলত এসব কারণেই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের উদ্ভাবন।

২০০৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়, দর্শকমহলে বিপুল সাড়া, অসীম বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এবং প্রথম আসরেই মহেন্দ্র সিং ধোনির দলের শিরোপা জয়ের পরের বছর থেকে শুরু হওয়া ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ‘ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ’  দ্রুতই বদলে দেয় দৃশ্যপট। দেড় দশকে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটই হয়ে উঠেছে ব্যাট এবং বলের খেলাটির বৈশ্বিক সংস্করণ। ক্রিকেট এখন আর টেস্ট পরিবারের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ভানুয়াতুর মতো দ্বীপ দেশও এখন জায়গা করে নিচ্ছে ক্রিকেটের বিশ্বকাপে। ১২৮ বছর পর অলিম্পিকেও ফিরছে ক্রিকেট, সেটাও টি-টোয়েন্টি সংস্করণে।

টি-টোয়েন্টির হাত ধরেই বিশ্বজুড়ে অনেক ক্রিকেটার পেয়েছেন বেঁচে থাকার উপায়। ক্রিকেটারদের একটা সময় জাতীয় দলের বাইরে খেলার জায়গা বলতে ছিল শুধু কাউন্টি ক্রিকেট, তাও বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে। এখন ক্রিকেটারদের অনেকেই বিনোদনের ফেরিওয়ালা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এক দেশ থেকে অন্য দেশে, খেলছেন বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে। দেশের গণ্ডিতে আটকে না থেকে বেছে নিচ্ছেন ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে ক্রিকেট খেলা। টি-টোয়েন্টি ঘিরে যখন ক্রিকেটে এই বিপ্লব ঘটছে, তখন বাংলাদেশ এসব থেকে অনেক অনেক দূরে; বরং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নানা উপায়ে খেলোয়াড়দের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলার পথ বন্ধ করেছে ছাড়পত্র না দিয়ে। যার সবশেষ ভুক্তভোগী শরিফুল ইসলাম।

আইপিএল যেমন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার প্রস্তাব দিয়েছে ক্রিকেটারদের, ব্যবসার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে, তেমনি অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটারকে জ্বলে ওঠার সুযোগটাও করে দিয়েছে। আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোই তুলে এনেছে জাসপ্রিত বুমরা, ইশান কিশান, সূর্যকুমার যাদবের মতো ক্রিকেটারদের। যশস্বী জয়সওয়ালকে হারিয়ে যেতে দেয়নি রাজস্থান রয়্যালসের একাডেমি। ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর রয়েছে নিজস্ব প্রতিভা অন্বেষণ পদ্ধতি, মাঠ, কোচিং স্টাফসহ এমন অনেক সুযোগ-সুবিধা, যা লজ্জায় ফেলবে বিসিবিকে। কারণ কয়েকশ কোটি টাকার এফডিআর নিয়েও মিরপুরের একাডেমিকে স্রেফ ক্রিকেটারদের প্রশিক্ষণকালীন আবাসস্থলের চেয়ে বেশি কিছু বানানো সম্ভব হয়নি। একাডেমির নিজস্ব একটা ক্রিকেট মাঠ নেই, একই জিমে একাডেমির খেলোয়াড় থেকে শুরু করে জাতীয় দলের খেলোয়াড় সবারই আনাগোনা।

টাকার গন্ধে বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে বিপিএল। ২০১২ সাল থেকে শুরু হওয়া এই আসর অনিয়ম, অধারাবাহিকতা আর অব্যবস্থাপনার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। পরপর দুটো আসর একই নিয়মে, সবগুলো ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা এবং সংখ্যা অপরিবর্তিত রেখে করা গেছে এমন দৃষ্টান্ত নেই। বছর বছর ফ্র্যাঞ্চাইজির নাম, মালিকানা, একাদশে বিদেশি খেলোয়াড়ের সংখ্যা, নিবন্ধন প্রক্রিয়া সবই বদলায়। এখন তো পিএসএল, এসএ টোয়েন্টি, আইএল টি-টোয়েন্টির সঙ্গে সূচি সংঘর্ষের কারণে মানসম্মত বিদেশি ক্রিকেটারদেরও আগমন কমে গেছে। অতিথি পাখির মতো করে তারা এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার আগে ট্র্যানজিটে ঢাকায় নেমে কিছু ম্যাচ খেলেন, বিনিময়ে নেন কাঁড়ি কাঁড়ি ডলার। ড্রাফটের বাইরে সই করানো এসব ক্রিকেটারের পেছনে কত টাকা খরচ করছে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো, এসবের কোনো হিসাব-কিতাব নেই। কারণ বিপিএলের কোনো আর্থিক নীতিমালা কিংবা সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিসিবি ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি হিসেবে টাকা নিয়েই খালাস।

১০ আসরে পৌঁছেই বিপিএলে বিদেশিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে পারেনি ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো। কারণ দেশীয় ক্রিকেটারদের সামর্থ্যরে অভাব। ইনিংসের সূচনায় এবং দ্রুত রান তোলা, শীর্ষ ব্যাটসম্যানদের বড় ইনিংস খেলার প্রবণতা কিংবা চাপের মুখে ম্যাচ জেতানোর সামর্থ্য; সব সূচকেই বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা পিছিয়ে। তাই আফগান, ক্যারিবিয়ান, পাকিস্তানি, শ্রীলঙ্কান এমনকি জিম্বাবুইয়ান, আইরিশ কিংবা ডাচ ক্রিকেটারদেরও দেখা যাচ্ছে বিপিএলে। দেশের ক্রিকেটাররা তাদের পাশে সহশিল্পীর ভূমিকায়। ব্যাটিং এবং বোলিংয়ে মূল দায়িত্বটা বেশিরভাগ দলেই সঁপে দেওয়া হচ্ছে বিদেশি ক্রিকেটারদের কাছে। কারণ দেশের ক্রিকেটাররা ব্যর্থ হচ্ছেন বেশিরভাগ সময়ে। ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের কাছে তখন দেশপ্রেমের চেয়ে বিনিয়োগের বিনিময়ে প্রাপ্তিযোগই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের ক্রিকেটাররা বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন। কারণ বিপিএলের বাইরে তাদের টি-টোয়েন্টি খেলার সুযোগই মেলে না, যেখানে ভিনদেশিরা বছরজুড়েই খেলে বেড়ান বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে। বিসিবির বার্ষিক ক্রিকেটসূচিতে বিপিএলের বাইরে শুধুই দেশীয় ক্রিকেটারদের জন্য কোনো টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা নেই। নানা সময়ে অনিয়মিতভাবে বিজয় দিবস টি-টোয়েন্টি, প্রিমিয়ার ডিভিশন টি-টোয়েন্টি, বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ নামে কিছু টুর্নামেন্ট হয়েছে। কোনোটাই সূচিতে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয়নি। কারণ এসবের সঙ্গে যে বিসিবির কাউন্সিলরশিপ কিংবা ভোটের অঙ্কের কোনো যোগসাজশ নেই! অথচ ভারতে ২০০৬-০৭ সালে যখন থেকে টি-টোয়েন্টির বিশ্বকাপ শুরু হলো, তখন থেকেই সৈয়দ মুশতাক আলির নামে রাজ্যভিত্তিক টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট চালু হয়েছে, পাকিস্তানে ২০০৪-০৫ মৌসুম থেকে জাতীয় টি-টোয়েন্টি লিগ শুরু হয়, যা অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডের বাইরে প্রথম ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা। শ্রীলঙ্কায়ও এলপিএলের বাইরে শীর্ষ ক্লাবগুলোকে নিয়ে ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা হয়, এমনকি আফগানিস্তানও এ বছর টি-টোয়েন্টির ঘরোয়া প্রতিযোগিতা শুরু করেছে; যেটা ছিল এবারের বিশ্বকাপের আগে খেলোয়াড় বাছাইয়ের মঞ্চ।

অথচ বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপে খেলতে আমেরিকা যাওয়ার পর, ২১ মে বিসিবির চিফ কো-অর্ডিনেটর অব প্রোগ্রাম মিনহাজুল আবেদীন জানিয়েছেন, এ বছর থেকে তারা ঘরোয়া ক্রিকেটে ৮ দলের একটি টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা যোগ করতে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিনের এই যে পশ্চাদপদতা, টি-টোয়েন্টিকে উপেক্ষা করে থাকার প্রবণতা; অনুপযোগী উইকেটে ভরদুপুরে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচের আয়োজন, ২০ ওভারের বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়ার আগে তীব্র গরমে ৫০ ওভারের ঘরোয়া ক্রিকেট প্রতিযোগিতার আয়োজন, পুলপ্রথা ভেঙে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের একই দলে খেলার ব্যবস্থা করে দিয়ে লিগকে একপেশে বানিয়ে ফেলা, বিদেশি খেলোয়াড় বন্ধ করা, আম্পায়ারিংয়ে প্রভাব খাটানোসহ যাবতীয় অনিয়মের ফলই হচ্ছে প্রথম দল হিসেবে ১০০ টি-টোয়েন্টি ম্যাচ হারার অগৌরব।

আমড়াগাছে আম ধরার প্রত্যাশা করাটাই ভুল। বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন যেখানে দাঁড়িয়ে প্রতিভা অন্বেষণ থেকে খেলোয়াড় বাছাই এবং জাতীয় দল নির্বাচনে যেভাবে পদে পদে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পছন্দ-অপছন্দই সুস্পষ্ট, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই দুটো ম্যাচে হার আসলে অঘটন নয়; বরং নিয়তির মতোই অবধারিত। দেশে মিরপুরের মন্থর ও নিচু বাউন্সের উইকেটে সফরকারী শক্তিশালী দলের বিপক্ষে কিছুটা ঝলক আর জিম্বাবুয়ে, আয়ারল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে জয় দেখেই কর্তাব্যক্তিরা তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন। দেশের শীর্ষ পর্যায় থেকে অভিনন্দনও মেলে। কিন্তু বিশ্বমঞ্চে, ওয়ানডে বিশ্বকাপ কিংবা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সই বলে দেয় বাংলাদেশের অবস্থান কোন জায়গায়। হিউস্টনে খেলতে যাওয়া ক্রিকেটাররা মার্কিন মহাকাশগবেষণা সংস্থা নাসা ঘুরে এসেছেন, তবে তারা যে মাধ্যাকর্ষণের টানে নয়; বরং একের পর এক ম্যাচ হেরে র‌্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে পড়ছেন এবং অবস্থার উন্নতি না হলে বিশ্বকাপ খেলার সৌভাগ্য না-ও হতে পারে, সেটা বুঝতে বোধ হয় মহাকাশ বিজ্ঞানী হওয়ার দরকার নেই।

বিশ্বকাপ। এই একটি শব্দই শহুরে অভিজাতদের শীতকালীন একটি খেলাকে বাংলাদেশে করে তুলেছে প্রবল জনপ্রিয়। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের আইসিসি ট্রফি জয়ের আগে ক্রিকেট মূলত ছিল শীতকালের খেলা, যা অল্প কিছু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশের মানুষের কাছে তখন ফুটবল খুবই জনপ্রিয়; আসলাম, সাব্বির, মোনেম মুন্না, কায়সার হামিদরাই তখন তারকা। আইসিসি ট্রফি জিতে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে জায়গা পেল, তাতেই ক্রিকেট পেল তুমুল জনপ্রিয়তা আর ক্রমেই ফুটবলের ক্ষয়িষ্ণু সাফল্য ক্রিকেটকে সেই জায়গাটাও নিতে দিল।

বিশ্বকাপের জাদু যদি ফুরিয়ে যায় আর বড় বড় দেশ যদি সফরসূচিতে বাংলাদেশকে জায়গা না দেয়, তাহলে ফুটবলের বর্তমান দৈন্যদশা একদিন ক্রিকেটেরও হতে পারে। আইসিসি ট্রফি যুগে যেসব দলের কাছে বাংলাদেশ হারেনি; সেই হংকং, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, স্কটল্যান্ড, কানাডা কিংবা আমেরিকার মতো দেশের কাছে হার এটাই জানান দেয়, সঠিক কক্ষপথে নেই দেশের ক্রিকেট। প্রশাসকদের দুর্নীতি কেনিয়াকে উধাও করে দিয়েছে ক্রিকেট মানচিত্র থেকে। এমন ন্যক্কারজনক হারের পরও যদি কর্তাব্যক্তিদের ঘুম না ভাঙে, অযোগ্য লোকদের বিতাড়ন ও শাস্তি না হয়, তাহলে কেনিয়ার মতো দশা হবে বাংলাদেশেরও নিয়তি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত