মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ছদ্মনামে আগমন আসল নামে বিদায়

আপডেট : ২৫ মে ২০২৪, ১২:৪২ এএম

প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। ছিলেন বাংলাদেশ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আর্ট গ্যালারি ‘শিল্পাঙ্গন’। প্রগতিশীল পাঠাগার ‘সমাজতান্ত্রিক পাঠাগার’-এর প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রথম প্রধান সম্পাদক অকৃতদার এই কবি ও ছড়াকার মারা যান ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে চিন্তা পাতায় ছাপা হলো তার লেখা উপসম্পাদকীয়

সে সময় করাচিস্থ ডন পত্রিকার বিশেষ সংবাদদাতা এজাজ হোসেন ঢাকায় উপস্থিত না থাকলে, হয়তো ভদ্রলোক সে দফায় বিপত্তির হাত থেকে বেঁচে যেতেন। কিন্তু পূর্বদেশ পত্রিকায় (তখন সাপ্তাহিক) যে গুরুত্ব সহকারে প্রথম পৃষ্ঠায় সিআইএর কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ এনে জনৈক মার্কিন নাগরিকের বিরুদ্ধে সংবাদটি ছাপা হয়েছিল, তা কোনো সচেতন নাগরিকেরই দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারেনি একজন দক্ষ সাংবাদিক এজাজের তো ভুল করার কথাই নয়।

ডন পত্রিকা পূর্বদেশ-এ আমার নামে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে সংশ্লিষ্ট খাঁটি মার্কিন নাগরিক ‘নুরুল ইসলামের রাজনৈতিক তৎপরতার’ প্রতি সন্দেহের দৃষ্টিতে পরোক্ষ মন্তব্যের সঙ্গে প্রশ্ন করেছিল যে, ভদ্রলোক সত্যিই কে? অভিযোগগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। নিখাদ আমেরিকান নুরুল ইসলাম বেশ তরতর করে বাংলায় কথা বলতে বা লিখতে পারতেন। চক্ষু, কেশ ও গাত্রের বর্ণ অবশ্যই আমেরিকাবাসীর; তবে বাংলা ভাষা ও পাজামা-পাঞ্জাবির ব্যবহার এবং অন্যান্য আচরণ থেকে অনেকেই তাকে কোনো বাঙালির ঔরসজাত আমেরিকান মাতার সন্তানরূপে গণ্য করতে পারেন। তার বাংলা উচ্চারণ ত্রিশ বছর পূর্বে বিহার শরিফ থেকে আগত ঢাকায় বসবাসকারী ডোমিসাইল্ড বাঙালিদের উচ্চারণের চাইতেও উন্নত ছিল। আজ থেকে ২০ বছর পূর্বে আইয়ুব খানের যখন প্রচন্ড প্রতাপ, সেই তেষট্টি সালের প্রথমদিকে সম্ভবত রিপোর্টটা বেরিয়েছিল। আইয়ুব-বিরোধী ছাত্রদের আন্দোলন একটা বিশেষ পর্যায়ে এসেছে, মৌলিক গণতন্ত্রীদের জাতীয় পরিষদের তোড়জোড়, রাজনৈতিক দলগুলো পুনরুজ্জীবিত হতে গিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্বিখ-িত হয়ে পড়ছে। খ-িত মুসলিম লীগ থেকে গঠিত কনভেনশন লীগের উত্তাপ দেশবাসী তখন অনুভব করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকারের আন্দোলন আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের (চৌষট্টি, সেপ্টেম্বর) প্রস্তুতি পর্বের তোড়ে অনেকটা স্তিমিত-নির্বাচনের মাধ্যমে অধিকার অর্জনের সম্ভাবনার কথাই অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ভাবছিল (আইয়ুবের বিরুদ্ধে সংযুক্ত বিরোধী দলগুলোর মনোনীত প্রার্থী ছিলেন মিস্ জিন্নাহ)। এই ঘোলাটে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনো বিদেশি গোয়েন্দার নুরুল ইসলাম নামে ছদ্মবেশ ধারণ অস্বাভাবিক ঘটনা হবে কেন।

আমাদের আলোচ্য নুরুল ইসলাম পুনরায় বাংলাদেশে আসেন। এবার সেই পিসকোরের সদস্যরূপে। ঢাকা ও প্রদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর এলাকা কেন্দ্র করে গ্রাম ও শহরের জনসাধারণকে সাহায্য করার জন্যে পূর্ব থেকেই কার্যক্রম স্থির করা হয়েছিল। সেই পরিকল্পনা মোতাবেক সামাজিক,

সাংস্কৃতিক, উন্নয়ন কার্যক্রমের মধ্যে তারা মিশে যেতে লাগলেন। স্থানীয় আমেরিকান অফিসের প্রধানই ছিলেন তাদের মূল পরিচালক। স্থানীয়ভাবে কিছুসংখ্যক লোকও পাওয়া গেল প্রাণঢালা সহযোগিতাদানের জন্য (বিদেশিদের আনুকূল্যে উপকৃত এমন ধরনের কিছুসংখ্যক লোক সর্বদাই পাওয়া যায়)। মেয়েরা শাড়ি পরে ও ছেলেরা পাজামা-পাঞ্জাবিতে সেজে দিব্যি রাজপথে, অলিগলিতে ঘুরে বেড়াতে লাগল স্বাধীনভাবে। সেই নুরুল ইসলামও এমন সুযোগ থেকে বঞ্চিত হননি। তা ছাড়া এ দেশীয় নাম ও বাংলায় কথা বলার যোগ্যতার জন্য তিনি অনেক ক্ষেত্রে একটু বাড়তি সুযোগও পেয়েছেন। তবে এই বাড়তি সুযোগই শেষ পর্যন্ত তার জন্যে বিপদ হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় পর্যায়ে ভিয়েতনাম আক্রমণ ও অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সে সময় গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক নাগরিকগণ আমেরিকার বৈদেশিক নীতির তীব্র সমালোচনা করছিল। তা ছাড়া ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার নব্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলোতে সামরিক অভ্যুত্থানের জন্য প্রধানত আমেরিকান সরকারকেই দায়ী করা হচ্ছিল। এই বিব্রতকর অবস্থায় আমেরিকার নয়া ‘তরুণ’ প্রেসিডেন্ট রাজনৈতিক কারণেই আমেরিকার ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে যে সমস্ত কর্মপন্থা অবলম্বন করেছিলেন, তার মধ্যে ‘পিসকোর’ পরিকল্পনা ছিল একটি প্রকাশ্য পন্থা। অপরদিকে নিজের দেশে যুদ্ধ-বিরোধী সচেতন বেকার যুবকদেরও অন্য পথে পরিচালিত করে বৈরিতার আশঙ্কিত বিপদ থেকেও তিনি মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন বলেও অনেকের ধারণা। এই পিসকোর পরিকল্পনায় গোপনে নতুন স্বাধীন দেশগুলোতে গুপ্তচর প্রেরণের কোনো ইচ্ছে কেনেডির ছিল বলে তখন পর্যন্ত কোনো ঐতিহাসিক স্পষ্ট করে বলেননি। কিন্তু তবুও নাইজেরিয়া গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ এনেছিল এবং অনেক দেশই পিসকোরকে সুদৃষ্টিতে দেখেনি এবং আমরা পাকিস্তানে বিশুদ্ধ আমেরিকান নুরুল ইসলামের মতো সন্দেহজনক চরিত্রের লোককে পিসকোরের সদস্যরূপে দেখতে পাই। পিসকোর প্রেরণের জন্য নির্দিষ্ট দেশগুলোর সংস্কৃতি, রাজনীতি, ভাষা, জাতীয় চেতনা, ঐতিহ্য, অর্থনীতি ও উন্নয়ন সম্পর্কে জ্ঞান লাভের প্রয়োজনে এই বাহিনীর সদস্যদের বিশেষ শিক্ষা কোর্সে যোগদান করতে হয়েছিল। কেনেডির শান্তিসেনাদের বাংলা ভাষা শিক্ষাদানের জন্য ঢাকা থেকে একজন প্রাক্তন সাংবাদিককে নিয়ে যাওয়া হয়। পিটস্বার্গের নিকটবর্তী পাটনী নামক স্থানে এই ভাষা শিক্ষা কোর্স পরিচালিত হয়েছিল। ভাষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতির সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কোর্স এবং অন্য নির্দেশাবলি নিয়েই নুরুল ইসলাম ঢাকায় এসেছিলেন। ঢাকা বিমানবন্দরে নামার পর দলভুক্ত অন্য সদস্যদের সঙ্গে যে গ্রুপচিত্র গ্রহণ করা হয়েছিল, তা স্থানীয় প্রায় সকল পত্রিকাতেই ইউসিসের চেষ্টায় প্রকাশ পেয়েছিল। এই অতিথি তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে নুরুল ইসলাম সাধারণত থাকতেন না। এই ‘ভিন্ন প্রকৃতির’ লোকটি সম্পর্কে তার সঙ্গীরাও কোনোদিন সন্দেহ পোষণ করেনি।

কিছুদিনের মধ্যেই তাকে দেখা গেল এ দেশীয় প্রখ্যাত রাজনীতিকদের দরবারে। সবার অগোচরে সাংবাদিক বলে নিজের পরিচয় দিয়ে ইতিমধ্যেই তিনি কাগমারিতে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে দুবার সাক্ষাৎ করেছেন। মওলানা সাহেব তার নিজস্ব পদ্ধতিতেই খোলাখুলিভাবে এই ‘বিদেশি সাংবাদিকের’ সঙ্গে কথা বলেছেন। একবার ঢাকায় মতিঝিল অফিসে তিনি দলের কর্মী ও উপস্থিত কজন সাংবাদিকের সঙ্গে ঘরোয়া আলোচনার সময় এই বিদেশি সাংবাদিকের কথা উল্লেখ করে বলেন, মার্কিনিরা এখন কাগমারি পর্যন্ত সাংবাদিক পাঠাচ্ছে। এক মুসলমান মার্কিনি তোমরা আর কি জান, সে তো এ দেশের সব খবরই জানে। সেই নুরুল ইসলাম এই মার্কিন যুবক। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের বৈঠকখানায় তাকে একদিন পেলাম। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবের নামে তখনো তিনটি মামলা; কিছুদিন পূর্বে জেল থেকে বেরিয়েছেন। তার বাসার নিচের তলায় কর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সময় উপস্থিত হয়েছিলাম সংবাদ সংগ্রহের জন্য। সেখানেই মার্কিনি মুসলমান মি. ইসলামের সঙ্গে প্রথম দেখা হলো। তিনি এখানে প্রকাশ্যভাবে পিসকোরের সদস্যরূপেই এসেছিলেন রাজনৈতিক নেতার সাক্ষাৎকার নিতে। সেখানেই জানা গেল, মি. ইসলামকে ছাত্র-যুবকদের সভা-সমিতি থেকে শুরু করে পল্টন ময়দান পর্যন্ত দেখা যায়। স্বাভাবিকভাবেই সবার মনে তখন প্রশ্ন উঠেছিল, কে এই সচল যুবক ইসলাম? কোথাও সাংবাদিক, কোথাও পিসকোর সদস্য, কোথাও-বা বিদেশি বাঙালি! কিছুদিনের মধ্যেই তার আরও একটি নতুন পরিচয় আমাদের সম্মুখে উপস্থিত হলো। তিনি কয়েকবার সিলেটেও গিয়েছিলেন। সিলেটের এক সাধারণ পরিবারকে তিনি পরিকল্পনা অনুযায়ী সঠিকভাবেই সন্ধান করেছিলেন। সেই পরিবারের লোকজন তাকে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেছিল। এই নুরুল ইসলাম তাদের কাছে পুত্রতুল্য, প্রকৃতই পুত্র বলা চলে। নিউ ইয়র্কের কোনো এক স্থানে নাকি জনৈক সিলেটত্যাগী প্রায় পঁচিশ বছর পূর্বে ভাগ্য অন্বেষণে উপস্থিত হন। তার নাম, গ্রামের নাম সবই নুরুল ইসলাম নিয়ে এসেছিলেন এবং পরিচয় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামবাসীরা ও উক্ত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন তাকে বিশেষ আগ্রহ ও উৎসাহের সঙ্গে গ্রহণ করে। সেই ব্যক্তি নিউ ইয়র্কে একটি রেস্তোরাঁ ও সম্পত্তি রেখে কিছুদিন পূর্বে ইহলোক ত্যাগ করেছেন।

যে তথ্য পূর্বে পাওয়া গিয়েছিল, তার সঙ্গে মার্কিনি নুরুল ইসলামের ঢাকা আগমনের তারিখ এবং আলোকচিত্র হুবহু মিলে গেল। এই নুরুল ইসলাম থেকে পূর্ব বাংলায় গুপ্তচরবৃত্তির আরম্ভ নয়- এ কেবল কোনো এক পর্যায়ের কাহিনী। এই ঘটনার দশ বছর পূর্বে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী বিজয় ও মুসলিম লীগের করুণ পরাজয়ের পরও শত্রুর চরদের কার্যকলাপ জনগণের চোখ এড়াতে পারেনি। শেরেবাংলা ফজলুল হক পূর্ব বাংলায় মুখমন্ত্রী হওয়ার পর কলকাতায় যে বক্তৃতা করেন, তার অপব্যাখ্যা ও ভ্রান্ত উদ্ধৃতি দিয়ে জনৈক ক্যালাহান, মার্কিন সাংবাদিক (?), নিউ ইয়র্ক টাইমসে সংবাদ প্রেরণ করেন এবং তারই সংবাদকে বেদবাক্যরূপে গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী (বগুড়া) শেরেবাংলাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে আখ্যায়িত করেন। একই সঙ্গে তাকে স্বগৃহে নজরবন্দি রেখে ৩০ মে (১৯৫৪) প্রদেশে ৯২-ক ধারা জারি করে সামরিক গভর্নর ইস্কান্দার মীর্জাকে নিয়োগ করেন। পরবর্তীকালে আমরা সেই ‘সাংবাদিক ক্যালাহানের’ কোনো সন্ধান পাইনি। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার নামে এ জাতীয় ষড়যন্ত্র গুপ্তচর কর্মকান্ডেরই অংশ। এ সমস্ত প্রকাশ্য ঘটনার কয়েক বছর পর সিআইএর একজন এজেন্টকেই পাকিস্তানে পূর্ণ রাষ্ট্রদূতরূপে নিয়োগ করা হয়েছিল। এই মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ডের (ফারল্যান্ড জোসেফ সিম্পন) সিআইএ এজেন্ট নম্বর ছিল ১৬৭। ১৯৬৯ সালে নিযুক্তির পরপরই ‘জনপ্রিয় রাজনৈতিক প্রতিনিধি, নিরপেক্ষ সংবাদপত্র ও সুধীসমাজ পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ডকে বারবার সিআইএর এজেন্ট বলে অভিহিত করেছে এবং তাকে পাকিস্তানে অবাঞ্চিত ব্যক্তি বলে ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছে’ (করাচি থেকে এরশাদ রাও-১৩ মার্চ ১৯৭২।)। সংবাদ প্রকাশের তিন সপ্তাহের মধ্যেই ছদ্মনামে আগত নুরুল ইসলাম আসল নামে বিদায় নিলেন-রবার্ট ক্রুক। তিনি আসলেন, থাকলেন, প্রস্থান করলেন। নুরুল ইসলামদের আগমনকালে ঢাকাস্থ মার্কিন অফিস প্রচারের মাধ্যমে আমাদের সংবাদটা শুনতে ও পড়তে বাধ্য করেছিল; কিন্তু ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তনের’ খবর আমরা পাইনি। (সংক্ষেপিত)

লেখক: বরেণ্য সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত