সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কেউ ভোলে না কেউ ভোলে

আপডেট : ২৫ মে ২০২৪, ১২:৩৮ এএম

পূর্ব ও পশ্চিমে বাংলা তখনো ভাগ হয়নি। অবিভক্ত বাংলার বর্ধমান জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রাম চুরুলিয়া। কাজীর বিচার নেই। কাজীর যুগ ও অবস্থাও আগের মতো নেই। শুধু বংশগৌরবটুকু আছে। দুঃখ-দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী এমন এক কাজী পরিবারে জন্মছিলেন আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। নদী-হাওর-বিলবিধৌত বাংলার সবুজ শ্যামলিমা থেকে দূরে বিহারের সীমান্তে। রাজধানী শহর কলকাতা থেকে এই গ্রামের দূরত্ব দুশ কিলোমিটার। কাজী ফকির আহমদের বড় পুত্র কাজী সাহেবজানের পর চার ভাইয়ের কেউ-ই জন্মের পর বাঁচেনি। গ্রামগঞ্জে রোগ-শোক-মৃত্যু-মারী মানুষের নিত্যসঙ্গী। এ জন্যই পোশাকি নামের বাইরে দুখু মিঞা রাখা হলো শিশুর নাম। যার শৈশব কৈশোর এমনকি সমস্ত জীবনজুড়ে দুঃখ ও সংগ্রাম তাকে তাড়িয়ে বেড়াবে খ্যাপা মোষের মতো। তার লেখায় জাত নেই, পাত নেই, ধর্ম নেই, আছে মানুষের গৌরবগাঁথা। লেখার মতো বিচিত্র ছিল তার জীবনও। কিশোর বয়সে কখনো কাজ করেছেন মসজিদের ইমাম ও খাদেম হিসেবে। কবিগানের লেটোর দলেও যোগ দিয়েছেন, গান বেঁধেছেন, গান গেয়েছেন। কাজ করেছেন রুটির দোকানেও। কাজী রফিজউল্লাহ নামে এক দারোগার ঘরে ফাই-ফরমাশ খাটারও কাজ করেছেন। এই দারোগার সূত্রেই এসেছিলেন পূর্ববাংলার ময়মনসিংহের কাজীর-সিমলা গ্রামে। পনেরো বছরের কিশোর ভর্তি হয়েছিলেন দরিরামপুর হাইস্কুলে ক্লাস সেভেনে। এক বছরের মাথায় এই স্কুলে ছেড়ে গেলেন। নদী পেরোলেই ভাষার ভঙ্গি বদলায়। ময়মনসিংহের এক অজপাড়া গাঁ, বন্ধু ও স্বজনহীন পরিবেশ তাকে বেদনার্ত করেছিল নিশ্চয়ই। মন টেকেনি। তবু পূর্ব বাংলা অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশের সঙ্গে তার হৃদয়ের নীরব সম্পর্ক স্থাপন করে গেলেন সেদিন। যেখানে বারেবারে ফিরে আসবেন। এমনকি মৃত্যুর পরও সমাধিস্থ হবেন ঢাকায়।

ময়মনসিংহ থেকে ফিরে গেলেন নিজ ঠিকানায়। সেখানে আসানসোলের রানীগঞ্জে একটি স্কুল। সিহাড়শোল রাজ উচ্চ বিদ্যালয়। সেখানেই ভর্তি হলেন ফের ক্লাস সেভেনেই। পরে তার মেধা দেখে তাকে প্রমোশন দেওয়া হলো। ক্লাস এইটে আর পড়তে হলো না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রণ দামামা বাজছে। বাঙালি ভীরুর দল বদনাম ঘুচাতেই যেন ম্যাট্রিক পরীক্ষা সামনে রেখে অনেকটা পালিয়েই চলে গেলেন যুদ্ধে।

থাকব না কো বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।

দেশ হতে দেশ দেশান্তরে

ছুটছে তারা কেমন করে,

কিসের নেশায় কেমন করে মরছে যে বীর লাখে লাখে,

কিসের আশায় করছে তারা বরণ মরণ-যন্ত্রণারে।

এমন কবিতা যার হৃদয়ে তাকে আটকায় সাধ্য কার। যুদ্ধজীবনের কঠিন প্রশিক্ষণ, সংগীতের সুরের সঙ্গে আরও নিবিড় সম্পর্ক বিশেষ করে নানা প্রকারের বাদ্যযন্ত্রের অনুশীলন, সৈনিকদের আড্ডা, নতুন পরিবেশ এবং ভাষা শিক্ষা তার কবিসত্তাকে আরও পরিণত ও ঋদ্ধ করেছিল। কিন্তু শৃঙ্খলার বাঁধনে বাঁধতে পারেনি। যে বিদ্রোহী কবিতার কবিকে তাকে কি বাঁধা যায়?

তার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘বাউ-ুলের আত্মকাহিনী’র মতোই তিনি ছিলেন উদাসীন, আত্মভোলা এক চিরকিশোর। শৈশবে ছিলেন দুরন্ত, ডানপিটে। অস্থির, চপল, চঞ্চল। কবি গোলাম মোস্তাফা মাত্র ক’লাইনে তার এক অনবদ্য জীবনী লিখে গেছেন, ‘কাজী নজরুল ইসলাম/বাসায় একদিন গিসলাম/ ভায়া লাফ দেয় তিন হাত/ হেসে গানগায় দিনরাত/।’

মাত্র বারো বছর বয়সে ঘর ছেড়েছিলেন। আর ঘরে ফেরা হয়নি। জাতিতে আরব না হলেও ছিল বেদুঈন-স্বভাব তার। মুক্ত জীবনের নেশায় ঘর ছাড়ার। নজরুলের শৈশব কৈশোরের দিকে তাকালে রবীন্দ্রনাথের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প ‘অতিথি’র চরিত্র তারাপদের কথাও কারও মনে পড়তে পারে হরিণশিশুর মতো যে বন্ধনভীরু, আবার হরিণেরই মতো সংগীতমুগ্ধ। যাকে কেউ বেঁধে রাখতে পারে না। যে অনাসক্ত উদাসীন পৃথিবীর পথে চলে যেতে ব্যাকুল থাকে। দুঃখ ও দারিদ্র্য পাশ ঠেলে মুখর হয়েছেন সৃজনে সৃষ্টিশীলতায়। প্রাচুর্যের হাতছানি এসেছে জীবনে দু-একবার। কিন্তু দু’হাতে উড়িয়ে দিয়েছেন হেসেখেলে।

নজরুল চিন্তায় ও মননে অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। হিন্দু মুসলিম মিলনে ও সম্প্রীতিতে ছিলেন বিশ্বাসী। বাংলাদেশের গ্রামগুলোও তখন হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের শান্তিপূর্ণ বাস ছিল। একে অপরের আত্মার আত্মীয় ছিলেন। নজরুল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনুকূল এক পরিবেশে বেড়েও উঠেছিলেন। ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’ বলা কবি তাই কুমিল্লার বিরজাসুন্দরী দেবীকে অকৃত্রিম মমতা নিয়েই ‘মা’ ডাকতেন। শিহাড়শোল স্কুলে শৈল এবং শৈলেন তার প্রাণের বন্ধু ছিল। শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে নাম করেছিলেন। নজরুলের স্মৃতিচারণ করে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের লেখা দারুণ বই ‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে’। দুই বন্ধু মারাও যান একই বছরে ১৯৭৬ সালে।

নজরুলের প্রথম সন্তানের নামকরণ দেখলেও নজরুলের মানুষে মানুষে সম্প্রীতিবোধের আশ্চর্য প্রমাণ পাওয়া যায়। ভগবান কৃষ্ণ ও নবী হজরত মুহম্মদ (সা) নামের সঙ্গে মিল রেখে ছেলের নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণ মুহম্মদ। সেকালের কেন এখনকার সমাজ বাস্তবতায়ও এ বড় আশ্চর্য ঠেকে বৈকি। কবি কত অগ্রসর ছিলেন মননে ও চিন্তায়। জাত-পাত-বিভেদের বিরুদ্ধে বলেছেন অবিরত। জাতের নামে বজ্জাতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল তার ক্ষুরধার কলম।

মাত্র বারো বছর বয়সে গৃহত্যাগ করেছিলেন নজরুল। তখন থেকেই শুরু হয় তার ভেসে চলা মুসাফির-জীবন। চিরকালের বাউ-ুলে, বেদুইন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সৈনিক জীবন শেষ করে কলকাতায় ফিরে হাবিলদার নজরুল ইসলাম (এ নামেই প্রথম দিকে কবিতা লিখতেন) লেখালেখি ও কাব্যজগতে মনোনিবেশ করেন। ১৯২০ সালে ‘নবযুগ’ নামক পত্রিকায় সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে তার শিল্প-সাহিত্য জীবনেও এক নবযুগ শুরু হয়। ভারতের স্বাধীনতা অর্জনে সুভাষ বসু থেকে সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম, প্রীতিলতা, প্রফুল্ল চাকীরা যেমন জীবন দিয়েছেন তেমনি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ সাহসী সংগ্রামী প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ছিলেন নজরুল। নজরুলরা জন্মেছিলেন, জেগেছিলেন বলে ভারতবর্ষে স্বাধীনতার সূর্যোদয় হয়েছিল, সকাল হয়েছিল। নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় একদিন বাংলাদেশও স্বাধীন হয়েছিল। নজরুল আমাদের চিরকালের কবি। তাকে ভোলা যায় না।

লেখক : কবি ও গবেষক

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত