মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কোন তেলে রান্না হবে

আপডেট : ২৫ মে ২০২৪, ১২:৫৮ এএম

আমাদের রান্নার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো তেল। খাবারের স্বাদ বাড়ায় তেল। তবে তেল ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। বাড়তি তেল শরীরের জন্য ক্ষতিকর। আবার সব তেল স্বাস্থ্যকর নয়। শুধু স্বাদ বাড়াতে তেল ব্যবহার না করে বরং সুস্থতার দিকটিও ভাবতে হবে রবিউল কমল

সাধারণত বাজারে রান্নার জন্য নানা ধরনের তেল পাওয়া যায়। পত্রিকা, টেলিভিশনের পর্দায় থাকে সেসব তেলের চোখ-ধাঁধানো বিজ্ঞাপন। এ কারণে সঠিক তেল বেছে নিতে অনেকে বিভ্রান্তিতে পড়েন। যেহেতু বাজারে নানা ধরনের তেল পাওয়া যায়, তাহলে রান্নার জন্য কোনটি বেছে নিতে হবে, তার আগে জানতে হবে রান্নার তেলে কী থাকে?

রান্নার তেলে কী থাকে

যে তেল দিয়েই রান্না করা হোক না কেন, সব ধরনের তেলেই ফ্যাট বা চর্বি থাকে। তাই বলে আবার সব চর্বিকে খারাপ ভাববেন না। রান্নার তেলের চর্বি হলো প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট এবং ভিটামিনের মতো প্রয়োজনীয় ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট। রান্নার তেলে মূলত মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড, পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড এই তিনটি প্রধান ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়। এগুলো মূলত রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রার তারতম্য ঘটায়।

কোন তেল ভালো হবে

তেলের ব্যবহার ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। কারণ সবার জন্য সব তেল উপযুক্ত নয়। একজন হার্টের রোগীর জন্য যে তেল ভালো হবে, আরেকজনের জন্য তা ভালো নাও হতে পারে। তাই স্বাস্থ্যভেদে তেল বাছাই করতে হবে। রান্নার জন্য তেলের গুণাগুণ বিবেচনা করে ভালো তেল বেছে নিতে হবে।

অলিভ অয়েল

চিকিৎসকরা বলেন, রান্নায় অলিভ অয়েলে ব্যবহার স্বাস্থ্যকর। এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলে রান্নার বড় সুবিধা হলো এটি প্রক্রিয়াজাত ও পরিশোধিত হয় না। এ কারণে অলিভ অয়েলের গুণমান খুব ভালো। অলিভ অয়েলে প্রচুর ক্যালরি থাকে। তাই রান্নায় স্বল্প পরিমাণ তেল ব্যবহার করলেই হয়ে যায়।

অ্যাভোকাডো তেল

অ্যাভোকাডো তেলকেও স্বাস্থ্যকর বলেই মনে করেন পুষ্টিবিদরা। সাধারণত উচ্চ তাপে এই তেলে রান্না করা হয়। তবে স্বাদ খুবই কম। অ্যাভোকাডোর তেল ক্রিমযুক্ত। অ্যাভোকাডো তেল মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট, পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ। তবে দাম তুলনামূলক বেশি হয়ে থাকে।

নারকেল তেল

আমাদের দেশে অবশ্য নারকেল তেলে রান্নার প্রচলন তেমন নেই। তবে ভারতে নারকেল তেলে রান্নার প্রচলন আছে। অবশ্য রান্নার জন্য ব্যবহৃত নারকেল তেল একটু ভিন্ন হয়। নারকেল তেল হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। আবার নারকেল তেল বাটারের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। তাই তরকারিতে ব্যবহার করা যায়। অথবা নাশতা তৈরিতে নারকেল তেল ব্যবহার করা যেতে পারে। তাতে ভালো ফল পাওয়া যাবে।

ক্যানোলা তেল

আমেরিকা ও ইউরোপ মহাদেশে সরিষার মতোই দেখতে ক্যানোলার বীজ থেকে ক্যানোলা তেল তৈরি হয়। হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য ক্যানোলা তেল বেশ ভালো। এই তেলের পুষ্টিগুণ সয়াবিন তেলের চেয়ে বেশি। স্যাচুরেটেড ফ্যাট খুব কম, কিন্তু পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট, মনো স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ওমেগা-৩ ফ্যাট এই তেলে বেশি মাত্রায় থাকে।

রাইস ব্রান তেল

রাইস ব্রান তেল হয় ধানের তুষ থেকে। রাইস ব্রান অয়েল সয়াবিন তেলের মতো একটি ভোজ্যতেল। এটি কোলেস্ট্রেরলমুক্ত ও প্রাকৃতিক ভিটামিন এবং খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধ। এই তেলকে হার্টের জন্য উৎকৃষ্ট তেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তা ছাড়া এই তেলে এমন কিছু উপাদান আছে, যা হার্ট ব্লক, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

সূর্যমুখীর তেল

রান্নায় সূর্যমুখী তেল ব্যবহার করলে শরীরের ভিটামিন-ই’র চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ পূরণ হয়। সূর্যমুখী তেলে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি, যা শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে রান্নায় অতিরিক্ত পরিমাণে ব্যবহার করা যাবে না।

সয়াবিন তেল

বাংলাদেশে রান্নার জন্য বহুল প্রচলিত তেল হলো সয়াবিন তেল। তবে এই তেল ভাজির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা ভালো। শাক রান্নার ক্ষেত্রে বা ভাজাপোড়ার ক্ষেত্রে সয়াবিন তেল ব্যবহার করা যায়। সয়াবিন তেল প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হয়। গবেষণা বলছে, সয়াবিন তেল স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী নয়। কারণ সয়াবিন স্থূলতা ও গ্লুকোজ অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখে।

পাম অয়েল

উচ্চ তাপে কোনো কিছু রান্না করলে পাম অয়েল ব্যবহার করা যায়। এই তেলের নিজস্ব ঘ্রাণ নেই, তাই রান্নায় ব্যবহার করলে খাবারের স্বাভাবিক ঘ্রাণই থাকে। তরকারি কিংবা মচমচে ভাজা জাতীয় খাবারে এই তেল ব্যবহার করতে পারেন। তবে পাম তেল সীমিত পরিমাণে গ্রহণ করার পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদরা।

সরিষার তেল

যে কোনো রান্নার জন্য সরিষার তেল উপকারি। এতে থাকে উচ্চ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। সরিষার তেল হজমের সমস্যাই দূর করে। আমাদের ত্বককে নানান রকম ভাইরাসের সংক্রমণ থেকেও রক্ষা করতে সহায়তা করে।

তাহলে কোন তেল বেছে নেব

বাসায় রান্নার জন্য সঠিক তেল বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যসচেতন প্রত্যেক মানুষকে এ বিষয়টি নিয়ে ভাবা উচিত। এখন প্রশ্ন হলো তেল ভালো নাকি খারাপ তা কীভাবে বুঝবেন? এ জন্য প্রথমে জানতে হবে কোন তেলে কী ধরনের চর্বি থাকে। আর জানতে পারলেই রান্নার জন্য স্বাস্থ্যসম্মত তেল বেছে নেওয়া সহজ হবে।

আগেই বলেছি তেলে মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট, পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে। এখন জেনে নিন এগুলোর কাজ কী। স্যাচুরেটেড ফ্যাট রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ায়। এতে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। তাই যেসব তেলে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ বেশি সেগুলো এড়িয়ে যাওয়া ভালো। আবার ট্রান্স ফ্যাট এক প্রকার হাইড্রোজেনেটেড তেল। এগুলো সাধারণত প্রক্রিয়াজাত খাবারে পাওয়া যায়। উচ্চ তাপমাত্রায় দাহ্য তেল বা চর্বিও ট্রান্স ফ্যাটে পরিণত হয়। শিঙ্গাড়া, সমুচা, পুরি, বিস্কুট, চানাচুর, চিপসের মতো বেকারি পণ্য তৈরিতে হাইড্রোজেনেটেড তেল ব্যবহার করা হয়। তাই এ ধরনের তেলকে না বলাই শ্রেয়।

অন্যদিকে মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট দেহের কোষের বিকাশ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। এই ফ্যাট হার্টের রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। অ্যাভোকাডো, বাদাম ও বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিজ্জ তেল যেমন ক্যানোলা, এক্সট্রা ভার্জিন অলিভওয়েল, চিনাবাদাম, তিলের তেলে মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে। তাই এ ধরনের তেল আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। এ ছাড়া পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট ও মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত তেল ব্যবহার করা স্বাস্থ্যকর। পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট প্রধানত উদ্ভিজ্জ তেল (সূর্যমুখী, তিল, সয়াবিন, কর্নওয়েল) ও সামুদ্রিক মাছে পাওয়া যায়। এতে ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ এই দুই ধরনের হয়ে থাকে। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে, বিষন্নতা, ক্যানসার, ডিমেনশিয়া ও আর্থ্রাইটিস থেকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তা ছাড়া রূপচাঁদা, ইলিশ, পাঙ্গাশ মাছে ওমেগা-৩-এর উৎকৃষ্ট উৎস। আর ওমেগা-৬ সমৃদ্ধ খাবার খাদ্য তালিকায় থাকলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি ৩৫ শতাংশ কমে যায়।

মডেল : বিন্দু

ছবি : আবুল কালাম আজাদ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত