সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ডাক্তার-লাইসেন্স ছাড়াই স্বাস্থ্যসেবা!

আপডেট : ২৫ মে ২০২৪, ০১:৩২ এএম

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা পটুয়াখালীতে একের পর এক গড়ে উঠছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। জেলা থেকে উপজেলা এমনকি দুর্গম চরাঞ্চলসহ গ্রামাঞ্চলেও চটকদার নাম আর সুসজ্জিত স্থাপনা নিয়ে গড়ে উঠছে এসব কথিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এসব নামসর্বস্ব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের শুধু লাইসেন্স দিয়েই দায় সারছে, নেই তাদের নিয়মিত তদারকি। ফলে কী ধরনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার হচ্ছে, কারা দিচ্ছে চিকিৎসা, কারা করছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা পরীক্ষার-নিরীক্ষার ফল কতটা মানসম্পন্ন কিংবা সঠিক তা দেখার কেউ নেই।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ১৪৯টি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। যদিও প্রকৃতপক্ষে এ সংখ্যা ১৭৯টি বলে জানা গেছে। এর মধ্যে পটুয়াখালী সদর উপজেলা ও গ্রামগঞ্জ মিলিয়ে ৫৯টি, রাঙ্গাবালীতে ৪টি, কলাপাড়ায় ৩০টি, বাউফলে ৩৩টি, মির্জাগঞ্জে ৯টি, দুমকীতে ৯টি, দশমিনায় ৬টি এবং গলাচিপায় ২৯টি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জেলার অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নেই সার্বক্ষণিক ডিউটি ডাক্তার। সরকারি হাসপাতালের কিছু চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করে চলে এসব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেরই নেই স্বাস্থ্য বিভাগের লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, ফায়ার সার্ভিস ছাড়পত্র, নারকোটিকস অনুমোদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স, অদক্ষ নার্স, ওটি বয় ও টেকনিশিয়ান দিয়ে চলছে এসব প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক ওপরমহলকে খুশি রেখে লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জেলার প্রতিটি উপজেলার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ঘেঁষে গড়ে উঠেছে এসব প্রতিষ্ঠান। এমনকি ফার্মেসি ও মানহীন বাসাবাড়িতেও গড়ে উঠেছে এমন অনেক কথিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জেলার শতকরা ৭০ ভাগ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেই কোনো মেডিকেল টেকনোলজিস্ট। নামমাত্র টেকনিশিয়ান দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। কিছু কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে ল্যাব পিয়ন, আয়া, বাবুর্চি দিয়ে এক্স-রে, ইসিজি, রক্ত সংগ্রহ এবং টেকনিশিয়ান দিয়ে প্যাথলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, সেরোলজি ও হরমোনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার। অনেক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মালিকরা করছেন এক্স-রে’র মতো গুরুত্বপূর্ণ ও বিপজ্জনক কাজ। অনেক সময় দেওয়া হচ্ছে ভুল রিপোর্ট। ভুল রিপোর্টের কারণে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে রোগী ও তার পরিবারকে।

২০২০ সালের আগস্টে পটুয়াখালীর সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য বিভাগের একটি টিম সরেজমিন পরিদর্শন করে নিবন্ধন ও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকা এবং চিকিৎসক না থাকায় জেলার আটটি উপজেলার ৫৮টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। চিত্রটি ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক হলেও ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় সবই কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ফের চালু হয় অদৃশ্য শক্তির জোরে।

এরপর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের একটি টিম ২০২২ সালে ১০টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে সাতটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সসহ নানা ত্রুটি চিহ্নিত করলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

পরিবেশ অধিদপ্তর, পটুয়াখালীর সহকারী পরিচালক কাজী সাইফুদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স প্রদানের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। তবে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ এবং পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাব

থাকলে সেসব প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়া হয় না।’ এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে জেলার সিভিল সার্জন ডা. এসএম কবির হাসানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও কোনো সাড়া মেলেনি।

তবে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, ‘সিভিল সার্জনদের বিষয়গুলো দেখভাল করার জন্য কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আছে। বেসরকারি হাসপাতালের মানহীন চিকিৎসার কারণে পুরো চিকিৎসাব্যবস্থার বদনাম হবে এটা মেনে নেওয়া হবে না।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত