সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সিডরের পথেই যাবে ‘রেমাল’!

আপডেট : ২৫ মে ২০২৪, ০১:৪৬ এএম

প্রায় ১৭ বছর আগে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত করা ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ পটুয়াখালীর খেপুপাড়া হয়ে উপকূল অতিক্রম করেছিল। আর দেড় দশক আগে ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উপকূল হয়ে অতিক্রম করলেও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। পূর্বাভাস অনুযায়ী, বঙ্গোসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপটি যদি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়, তাহলে তা খেপুপাড়া হয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে।

গতকাল শুক্রবার সকালে পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় থাকা সুস্পষ্ট লঘুচাপটি নিম্নচাপে রূপ নিয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, এটি আজ শনিবার ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। ঘণ্টায় বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ হতে পারে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত। যদি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়, এর নাম হবে ‘রেমাল’। ওমানের দেওয়া এ নামটির অর্থ ‘বালু’।

বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর ও ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর তাদের পূর্বাভাসে নিম্নচাপটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে বলে উল্লেখ করেছে। ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে, আসন্ন ঝড়টি পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপ ও পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে রবিবার সন্ধ্যায়।

তবে এর গতিপথ নিয়ে এখনই চূড়ান্ত কিছু বলতে নারাজ বিশেষজ্ঞরা। আবহাওয়া অধিদপ্তর কিংবা ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর যদিও ঝড়ের গতিপথের পূর্বাভাস দিয়েছে। তারপরও আজ শনিবার হচ্ছে টার্নিং পয়েন্ট। আজ যদি তা বাঁদিকে একটুও সরে আসে তাহলে তা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মধ্য দিয়ে অর্থাৎ উভয় দেশের সুন্দরবনের ওপর দিয়ে অতিক্রম করতে পারে।

বাঁদিকে সরে যেতে পারে কি না বা কেন যেতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে এশিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. মোহন কুমার দাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন মডেল পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, সম্ভাব্য ঝড়টি বাঁদিকে টার্ন নেওয়ার প্রবণতা বেশি। পূর্বদিক থেকে আসা মৌসুমি বায়ুর কারণে তা পশ্চিমে (বাঁদিকে) সরে যেতে পারে। তবে এখন যেহেতু ঝড়টি উপকূলের ৭০০ কিলোমিটারের মধ্যে চলে এসেছে, তাই আগামীকাল (আজ) শনিবারই বাঁক নেওয়ার চূড়ান্ত সময়। যদি বাঁক নেয় তাহলে তা ভারত-বাংলাদেশের সুন্দরবনের ওপর দিয়ে অতিক্রম করতে পারে। আর যদি বাঁক না নেয় তাহলে খেপুপাড়ার ওপর দিয়ে অতিক্রম করতে পারে।’

এ বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এখনো ঝড়টি সম্পর্কে শতভাগ পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। শনিবার সাগরে অবস্থানের সময় এর গতিপথ কোন দিকে যায় এর ওপর নির্ভর করবে। তবে এখন পর্যন্ত এর যে গতিপথ, তা ২০০৭ সালে সিডর যে পথে আঘাত করেছিল সেই পথ দেখাচ্ছে। কিন্তু সিডরের সঙ্গে শক্তি ও পরিধির সঙ্গে এ ঝড়ের ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে।’

ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হেনেছিল ২০০৭ সালের ১১ নভেম্বর। এতে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।

গতিপথ প্রসঙ্গে ড. মোহন কুমার দাশ আরও বলেন, ২০০৯ সালে আঘাত করা ‘আইলা’ পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে অতিক্রম করেছিল। কিন্তু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ঝড়ের ডানদিকে থাকায় সেসব এলাকায় বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।

২০০৯ সালের ২৫ মে ‘আইলা’ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে অতিক্রম করে। কিন্তু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এখন পর্যন্ত ওই দুই উপকূলের মানুষ ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৩ নম্বর বিশেষ বুলেটিনের তথ্যমতে, পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিম মধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থানরত নিম্নচাপটি উত্তর-পূর্বদিকে অগ্রসর হচ্ছে। নিম্নচাপটি গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রাম থেকে ৭৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার থেকে ৬৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৭১০ কিলোমিটার দক্ষিণে ও পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৬৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল। নিম্নচাপ কেন্দ্রের ৪৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা গতিবেগ ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিম্নচাপ কেন্দ্রের মধ্যে সাগর উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ১ নম্বর দূরবর্তী সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরের মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে উপকূলের কাছাকাছি নিরাপদে থাকতে বলা হয়েছে।

দেশ জুড়ে ভারী বৃষ্টিপাত হবে

এদিকে গতিপথ নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন, এ ঝড়ের প্রভাবে যে দেশ জুড়ে প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে; তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঝড়টি সাগর থেকে প্রচুর জলীয়বাষ্প নিয়ে আসছে। এই জলীয়বাষ্পের প্রভাবে কাল (শনিবার) থেকে হয়তো বৃষ্টিপাত শুরু হতে পারে। তবে ঘূর্ণিঝড়ের দিন (রবিবার) ও পরদিন (সোমবার) দেশ জুড়ে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।’

একই মন্তব্য করেন আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, বৃষ্টিপাত যে বেশি হবে তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই।

উল্লেখ্য, এপ্রিল ও মে মাস হলো ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম। এর মধ্যে মে মাস সবচেয়ে বেশি।

মৌসুমি বায়ু প্রবেশের আগে সাগরে একটি নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়ে থাকে সাধারণত। আর এরই ধারাবাহিকতায় সাগরে একটি নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। গত ৩০ বছরের আবহাওয়ার উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০৭ সালের ১১ মে সৃষ্টি হয়ে ১৫ মে আঘাত করেছিল ঘূর্ণিঝড় ‘আকাশ’, ২০০৮ সালের ২৭ এপ্রিল সৃষ্টি হয়ে ৩ মে আঘাত করেছিল ঘূর্ণিঝড় ‘নার্গিস’, ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’ আঘাত করেছিল, ২০১০ সালের ১৬ মে সৃষ্টি হয়ে ২১ মে আঘাত করেছিল ঘূর্ণিঝড় ‘লায়লা’, ২০১৩ সালের ৮ মে সৃষ্টি হয়ে ১৬ মে আঘাত করেছিল ঘূর্ণিঝড় ‘মহাসেন’, ২০১৬ সালে ঘূর্ণিঝড় ‘রোয়ানা’ ১৪ মে সৃষ্টি হয়ে ২২ মে আঘাত করেছিল, ২০১৭ সালে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’ ২৫ মে সৃষ্টি হয়ে ৩১ মে আঘাত করেছিল। এ ছাড়া ২০১৯ সালে ‘ফণি’ ৫ মে এবং ২০২০ সালে আম্পান ১৩ মে থেকে ২১ মের মধ্যে আঘাত করেছিল।

তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলাসহ সারা দেশের আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। আর ঢাকা, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে। সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। জলীয়বাষ্পের আধিক্যের কারণে অস্বস্তিভাব বিরাজ করবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত