মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

৪০ বছর পর নিজের ঘরে

আপডেট : ২৫ মে ২০২৪, ০২:০৯ এএম

ষাট বছর বয়সী নেপালি নাগরিক বীর বাহাদুর রায় নিজের ঘরে ফিরেছেন। কিন্তু এর আগে বাংলাদেশে কেটেছে তার জীবনের ৪০টি বছর। দীর্ঘ সময় বাংলাদেশে থাকায় বাংলা ভাষায় অনবদ্য কথা বলছিলেন তিনি। বাংলা ভাষা এতটাই রপ্ত করেন যে, নেপালি ভাষায় আর কথা বলতে পারছিলেন না বাহাদুর। নেপাল থেকে স্বজনরা তাকে নিতে এলে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। গতকাল শুক্রবার খোঁজ নিয়ে বীর বাহাদুরের ঘরে পৌঁছার খবর পাওয়া গেছে।

এর আগে বাংলাদেশের বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশনে আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার আগে বাংলাবান্ধা ও ভারতের ফুলবাড়ি সীমান্তে তাকে নিয়ে আসা হয়। এ সময় বীর বাহাদুরের ভাতিজা রাজন চাচাকে কাছে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরেন। দীর্ঘদিন পরে স্বজনদের কাছে পেয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন বীর বাহাদুর। ভাতিজা রাজন চাচাকে উত্তরীয় ও টুপি পরিয়ে দিয়ে পা ছুঁয়ে কদমবুসি করেন। এরপর রাজন বগুড়ার দুপচাঁচিয়া এলাকার বাসিন্দা ফরেন, অলকসহ কয়েকজনের গলায়ও উত্তরীয় পরিয়ে দেন।

পরে বীর বাহাদুরকে তার ভাতিজা রাজনের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এ সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত নেপালের উপ-রাষ্ট্রদূত ললিতা সিলওয়াল, সেকেন্ড সেক্রেটারি ইউয়েজানা বামজাম, নেপাল রাষ্ট্রদূতের সচিব রিয়া ছেত্রী, তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে রাব্বি, বাংলাবান্ধা ইমিগ্রেশন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অমৃত অধিকারী, ভারতের ফুলবাড়ি ইমিগ্রেশন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুজয় কুমার চৌধুরী, পঞ্চগড় চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহসভাপতি মেহেদী হাসান খানসহ পুলিশ ও বিজিবির কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এরপর ভারতীয় ইমিগ্রেশন পর্যন্ত বীর বাহাদুরকে এগিয়ে দেন নেপাল অ্যাম্বাসির সেকেন্ড সেক্রেটারি ইউয়েজানা বামজাম।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মানসিক কিছুটা প্রতিবন্ধকতা থাকায় বীর বাহাদুর ছোটবেলা থেকে বাসায় স্থির থাকতেন না। একপর্যায়ে ১৫ বছর বয়সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। পরে ঘুরতে ঘুরতে অজান্তেই নেপাল থেকে ঢুকে পড়েন ভারতে। সেখান থেকে সীমান্ত দিয়ে কখন বাংলাদেশে প্রবেশ করেন এখন কিছুই মনে নেই তার। এরই মাঝে তার প্রায় ১০ বছর কাটে সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটসহ উত্তরের কয়েকটি জেলায়। এসব জেলায় তিনি দিনমজুর, হোটেল শ্রমিকের কাজ করেছেন। পরে আবারও ঘুরতে ঘুরতে বগুড়া জেলার দুপচাঁচিয়া উপজেলার মাস্টারপাড়া এলাকায় চলে যান। সেখানেই কাটে তার জীবনের দীর্ঘ ৩০টি বছর। সেখানে তিনি অলক বসাক নামে এক ব্যক্তির মিল চাতালে শ্রমিকের কাজ করেন। কাজের বিনিময়ে শুধু পেটপুরে খাবার চাইতেন। নিতেন না কোনো টাকা-পয়সা। তবে তার মধ্যে দেশে ফেরার টান ছিল।

একপর্যায়ে স্থানীয়রা তার কাছে তার বাড়ির ঠিকানা জানতে চাইলে ‘গোরখে বাঙ্গিনা’ বললেও বিস্তারিত বলতে পারেননি। অনেকে তাকে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দা মনে করতেন। পরে তাকে নেপালি ভাষা লিখতে দিলে স্বাচ্ছন্দ্যে লিখে ফেলেন তিনি। এরপর দুপচাঁচিয়া মাস্টারপাড়া এলাকার বাসিন্দা মেহেদী হাসান ফরেন বীর বাহাদুরের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে তার ঠিকানা জানতে চান। স্থানীয় একটি গণমাধ্যমেও তাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে প্রশাসনিকভাবে বীর বাহাদুরের ঠিকানা খুঁজতে নেপাল অ্যাম্বাসিতে তার ছবি দেওয়া হয়। এর দীর্ঘ সময় পরে নেপালের গোরখে বাঙ্গিনাতে তার পরিবারের কাছে ছবি দেখানো হলে তার বড় ভাবি বীর বাহাদুরকে চিনতে পারেন। পরে বীর বাহাদুরকে দেশে পাঠাতে শুরু হয় আইনি প্রক্রিয়া। দীর্ঘ ছয় মাস পরে তাকে দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

বগুড়া জেলার দুপচাঁচিয়া পৌরসভার এলাকার বাসিন্দা পলক কুমার বসাক বলেন, বীর বাহাদুর দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে আমাদের মিল চাতালে কাজ করেছেন। কাজের বিনিময়ে শুধু খাবার খেয়েছেন, কোনো পারিশ্রমিক নেননি। আজকে তার পরিবারের হাতে তুলে দিতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। তাকে বিদায় দিতে এসে কান্নায় বুক ভেসে যাচ্ছে। তার পরিবারের সদস্যরা আমাদের আমন্ত্রণ করেছেন তাদের দেশে যেতে।

নেপাল রাষ্ট্রদূতের সচিব রিয়া ছেত্রী বলেন, ফেসবুকে এক নেপালি নাগরিকের দেশে ফেরার আকুতি জানানোর ভিডিও দেখে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হই। তার ভাতিজা রাজনের হাতে বীর বাহাদুরকে তুলে দিয়েছি। আমরা চাই তার জীবনের বাকি সময়টুকু কাটুক পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত