সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

টানাপড়েনে চীন ও ইইউ

আপডেট : ২৬ মে ২০২৪, ১২:৪২ এএম

২ বছর আগে বিশ্ব জুড়ে চীনের প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে ৩০ হাজার কোটি ইউরোর বিশাল বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বলা হচ্ছে, তাদের এই পরিকল্পনা চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের (বিআরআই) প্রকৃত বিকল্প হবে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন ‘গ্লোবাল গেটওয়ে স্কিম’ নামে এই মহাপরিকল্পনা সামনে এনেছেন। বিআরআই’র আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রেল, সড়ক, সেতু, বন্দরসহ নানা ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পে মোটা অঙ্কের অর্থায়ন করেছে চীন। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজন বিশ্বস্ত অংশীদার। এ জন্য এখন ইইউ’র সদস্য দেশ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাত থেকে শত শত কোটি ইউরো জোগাড়ের চেষ্টা করছেন। ইইউ’র এক কর্মকর্তা বলেন, এই মহাপরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য আফ্রিকাকেন্দ্রিক। এক ব্রিফিংয়ে ইইউতে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ঝ্যাং মিং বলেছিলেন, বেইজিং ইইউ’র গ্লোবাল গেটওয়ে পরিকল্পনাকে স্বাগত জানাবে, যদি এটি উন্মুক্ত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহায়ক হয়। তিনি সতর্ক করে আরও বলেছিলেন, অবকাঠামো প্রকল্পগুলোকে যদি ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করার চেষ্টা হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবে এবং নিজেদেরই ক্ষতি করবে। কিন্তু চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের জন্য অবশ্যই এটা ভিন্ন যুগের সূচনা। কারণ ৫ বছর পর এটা ছিল শি জিনপিংয়ের প্রথম ইউরোপ সফর। এই ৫ বছরে বিশ্ব কভিড মহামারীর সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। এ সময়ে বিশ্ব ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন দেখেছে। এই আগ্রাসনকে কৌশলগতভাবে সমর্থন দিয়েছে বেইজিং। ২০১৯ সালে ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ যেভাবে চীনকে বিবেচনা করত, এখন ভিন্নতা এসেছে। এ ব্যাপারে সজাগ শি জিনপিং সতর্কতার সঙ্গে ইউরোপ সফরসূচি ঠিক করেন। ফ্রান্স সফরের পর হাঙ্গেরি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয় এমন দেশ সার্বিয়া যান। ফ্রান্স সফর সম্পর্কে বলা হয়, চীনের সঙ্গে ফ্রান্সের বন্ধন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মডেল। হাঙ্গেরি ও সার্বিয়া দুই দেশই চীনের সমর্থক। শি জিনপিং সার্বিয়াকে চীনের বন্ধু বলে প্রশংসা করেন। তাদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়ছে। এর মধ্যে সার্বিয়ার বায়ু, সৌর ও পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পে চীন ২২০ কোটি ডলার বিনিয়োগও করছে। ইউর মধ্যে শি জিনপিংয়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর ওরবান শুধু চীনের সঙ্গে নয়, রাশিয়ার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে মনোযোগী। হাঙ্গেরি সফরের সময় শি জিনপিং ভিক্তর ওরবানকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, হাঙ্গেরি ইউরোপে চীনের বৈদ্যুতিক গাড়িসহ স্বয়ংক্রিয় পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের মূল হাব। চীন নিয়ে ইউরোপ মহাদেশে যে মতামত, তা থেকে সার্বিয়া ও হাঙ্গেরির মতামত ভিন্ন। ইইউ’র মূল অবস্থান জানা যায়, ফ্রান্সে চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেনের বক্তব্যে। চীন নিয়ে তিনি ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যে বাণিজ্য না করার নীতি ঘোষণা করেন। শি জিনপিংয়ের এই সফরের সময় কাকতালীয়ভাবে প্যারিস ও বেইজিংয়ের সম্পর্কের ৬০ বছর পূর্তি হয়েছে। শি জিনপিংকে ফ্রান্স উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছে।

৫ বছর আগে শি জিনপিংকে স্বাগত জানিয়েছিল ইতালি। জি-৭ ভুক্ত দেশের মধ্যে ইতালিই প্রথম চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোডস মহাপরিকল্পনায় স্বাক্ষর করেছিল। ইতালির সমালোচনা করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। ইতালির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি গত বছর চীনের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেন। পশ্চিমা বিশ্বের অভিযোগ, জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে চীন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র বিষয়ের প্রধান জোসেফ বোরেল অভিযোগ করেছেন, চীন ইউরোপে বিকল্প সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ খুঁজছে। চীন ইস্যুতে ইউরোপে সুদৃঢ় ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চললেও ২৭ দেশকে একই ছাতার নিচে আনতে সংগ্রাম করতে হচ্ছে। ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর রাশিয়ার প্রতি কঠোর অবস্থান নিলেও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট তার বক্তব্যে বৃহত্তর ইস্যুতে চীনকে স্বাগত জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ১ মাস আগেই ফ্রান্স সফরসূচি চূড়ান্ত করেন। বাস্তবতা হলো, ইউরোপের সঙ্গে চীনের বৃহত্তর মৈত্রী শীতলই থেকে যাবে। ইউক্রেন এবং গাজা যুদ্ধের কারণে মার্কিন সামরিক সংস্থান কমে আসছে। সে কারণে চীনের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোকে যুক্তরাষ্ট্র সর্বশেষ বিবেচনার বিষয় হিসেবে নেবে। চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অস্বীকৃতি এ অঞ্চলে সংঘর্ষের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিতে পারে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সাম্প্রতিক উসকানি এই ইঙ্গিত দিচ্ছে, সংঘাতের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি থাকার পরও শি জিনপিং সম্প্রসারণবাদ এগিয়ে নিতে আগ্রাসী হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে চীনের সম্প্রসারণবাদের লাগাম টানতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা ইতিমধ্যেই ওয়াশিংটনের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও বাণিজ্য স্বার্থকে ক্ষুন্ন করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা চায়, সংঘাত চায় না’।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত