শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আকাশে অশান্তি থেকে রেহাই দেবে পাখি!

আপডেট : ২৬ মে ২০২৪, ১২:০৩ এএম

সম্প্রতি দুটো উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় চিন্তিত বিশ্ব। গবেষকরা বলছেন, পাখির পথে চললে কমানো সম্ভব দুর্ঘটনা। বিবিসি অবলম্বনে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ও তার সঙ্গীদের মৃত্যুর পরপরই আরেকটি খবর দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে আকাশযাত্রীদের। লন্ডন থেকে সিঙ্গাপুরগামী একটি ফ্লাইট তীব্র ঝাঁকুনির কবলে পড়ে এক যাত্রী নিহত হন। এ ঘটনায় আরও ৩০ জন আহত হন। ফ্লাইটটি লন্ডন থেকে সিঙ্গাপুরে আসার পথে এ দুর্ঘটনা হয়। বিবিসির খবরে বলা হয়, একদম নির্মল, শান্ত আকাশে হঠাৎ এ বিপর্যয় নেমে আসে। প্রকৃতিতে যা স্বাভাবিক। বাতাসকে শান্ত মনে হলেও তা হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠতে পারে। ইরানের প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টার দুর্ঘটনাকেও প্রকৃতিক দুর্যোগের কারণে বলেই মনে করা হচ্ছে। যদিও ওই এলাকার আবহাওয়া তখন দুর্যোগপূর্ণ ছিল। কিন্তু সিঙ্গাপুরগামী ফ্লাইটটি এয়ার টার্বুল্যান্সের ভেতর পড়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা জানান, চলতি বছরের একটি সমীক্ষা অনুসারে, প্রতি বছর ৬৮ হাজার বার মাঝারি থেকে গুরুতর অথবা বৃহত্তর টার্বুল্যান্স বা অশান্তির মুখোমুখি হতে হয় উড়োজাহাজকে। এ অশান্তিকে ‘বাতাসের অনিয়মিত গতি’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয় যা বৃত্তাকার এবং উল্লম্ব বাতাসের স্রোতের কারণে সৃষ্ট। এটি বাতাসের অস্থির আচরণ এবং বজ্রঝড়ের জন্য দায়ী। এ অবস্থায় উড়োজাহাজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সাধারণত দেখা যায়, ঝড়ের সময় দুই বিপরীতমুখী হাওয়ার গতির মধ্যে যদি উড়োজাহাজ চলে আসে, তখন প্রচণ্ড ঝাঁকুনি হয়। কিছু সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন পাইলট। ফ্লাইটটি তখন এক ধাক্কায় বেশ কিছুটা নিচে নেমে আসে। ঝোড়ো হাওয়ার গতি যদি বেশি হয়, তাহলে ঝাঁকুনি আরও তীব্র হয়। তখন বলা হয়, উড়োজাহাজ এয়ার টার্বুল্যান্স বা আকাশে অশান্তিতে পড়েছে।

বিবিসি তাদের এক প্রতিবেদনে জানাচ্ছে, পাখির গতিবিধি লক্ষ করে বাতাসের এই হঠাৎ মতি পরিবর্তনকে বুঝতে পারা সম্ভব। যদিও উড়োজাহাজে সেন্সর বসানো থাকে আকাশের কোথায় পরিস্থিতি কেমন আছে তা বুঝার জন্য। কিন্তু এসব সেন্সরও হঠাৎ পরিবর্তনকে ধরতে পারে না। এ জন্য ‘প্রাকৃতিক সেন্সর’ হিসেবে পাখিকে পর্যবেক্ষণের কথা বলা হয় ওই প্রতিবেদনে। সে অনুযায়ী উড়োজাহাজের নকশা সাজানোর পরামর্শও দেওয়া হয়।

কখনো শান্ত কখনো হিংস্র

বিবিসির ওই প্রতিবেদনে সাংবাদিক ক্যাথেরিন লেথাম লিখেছেন, আকাশকে শান্ত মনে হলেও কখনো তা উত্তাল এবং হিংস্র হয়ে উঠতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ুর উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় এ ধরনের ঘটনা বেশি হচ্ছে। গত মঙ্গলবার লন্ডন থেকে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট গুরুতর অস্থিরতার সম্মুখীন হয়। এতে ৩০ জন আহত হন এবং একজন মারা যান। বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর-এর যাত্রীরা বিবিসিকে বলেন, হঠাৎ নেমে যাওয়ার আগে বিমানটি কাত হয়ে কাঁপতে শুরু করে এবং কেবিনের চারপাশে মানুষ ও বস্তু ছুড়ে ফেলতে থাকে। তিনি বলছেন, আকাশের অবস্থা কেমন তা বুঝতে এবং এ ধরনের অশান্তি মোকাবিলার আরও ভালো উপায় হতে পারে পাখি। ওয়েলসের সোয়ানসি ইউনিভার্সিটির পাখির উড্ডয়ন এবং বায়ুপ্রবাহ বিশেষজ্ঞ এমিলি শেপার্ড বলেন, পাখি নিম্ন উচ্চতায় কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় তা অধ্যয়ন করে আবহাওয়াবিদরা অশান্তির পূর্বাভাস পেতে আরও ভালো মডেল তৈরি করতে পারেন। কিছু পাখি আকাশে ‘চরম অশান্তি’ মোকাবিলার জন্য মানিয়ে নিয়েছে। তারা কীভাবে এটি করতে পারল সেটি বিশ্লেষণ করে উড়োজাহাজের নকশা সাজানো যেতে পারে।

বিবিসি জানাচ্ছে, আধুনিক উড়োজাহাজ আবহাওয়া অধ্যয়ন করতে পারে এমন রাডার ব্যবস্থা দিয়ে সজ্জিত। যার মাধ্যমে পাইলট আকাশে অশান্তিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করতে এবং দিক নির্ণয় করতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব রিডিং-এর বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞানী পল উইলিয়ামস বলেন, আমরা ১৮ ঘণ্টা আগে প্রায় ৭৫ শতাংশ অশান্তি সফলভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারি। তবে আকাশে অনেক ধরনের অশান্তি বা টার্বুল্যান্স আছে যা চিহ্নিত করা কঠিন হতে পারে। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে যে মারাত্মক টার্বুলেন্স হয়েছিল তা প্রায়শই অদৃশ্য ‘ক্লিয়ার এয়ার টার্বুল্যান্স’-এর কারণে ঘটে। এটি সতর্কতা ছাড়াই আঘাত হানতে পারে এবং এটি আবহাওয়া-সম্পর্কিত বিমান দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ। অনেক উঁচুতে আকাশকে আপাতদৃষ্টিতে শান্ত মনে হতে পরে। খালি চোখে  সেখানকার সমস্যা দেখা যায় না। সেন্সর দিয়েও শনাক্ত করা যায় না। এমনকি স্যাটেলাইটও এ ধরনের অশান্তি দেখতে পায় না। দুর্ঘটনা এড়াতে পাইলটদের বেশিরভাগ সময় আগে উড়ে যাওয়া ফ্লাইটের গতিপথের ওপর নির্ভর করতে হয়। আগের ফ্লাইটের পথে পরিষ্কার বায়ু আছে বলে তারা ধরে নেন।

আকাশে অশান্তি

গবেষকরা বলছেন, তুমুল ঝড়বৃষ্টি বা বজ্রপাতের সময় উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। ইরানের হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা ছিল মারাত্মক। ওই দুর্ঘটনার দীর্ঘ সময় পরও আবহাওয়া পরিস্থিতি বিরূপ ছিল। তবে টার্বুল্যান্সের কারণে বিমান ধসে পড়ে না। আবার আকাশে হাওয়ার চাপ খুব বেশি

থাকলেও অনেক সময়ে ফ্লাইট নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। আকাশে দুই বিপরীতমুখী বায়ু একে অপরের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করতে থাকলে তার আভাস আগে থেকে পাওয়া যায় না। ভুলবশত এ দুর্যোগের মধ্যে উড়োজাহাজ চলে এলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বাড়ে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, গরম বাতাস ওপরে ওঠে, তখন সেই শূন্যস্থান পূরণ করে ঠান্ডা বাতাস। এই দুই বাতাসের গতি ও অভিমুখ ভিন্ন থাকে। বিপরীতমুখী এই দুই বায়ুপ্রবাহ এলোমেলো ভাবে বইতে থাকলে সেখানে ঘূর্ণি তৈরি হয়। একে এয়ার টার্বুল্যান্স বলে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঠান্ডা ও গরম বাতাসের চলাচল বেড়েছে। ফলে আকাশে অশান্তিও বেড়েছে।

আকাশে কয়েক ধরনের অশান্তি দেখা দেয় হাল্কা, মাঝারি, তীব্র এবং অতি তীব্র। যদি উড়োজাহাজের ঝাঁকুনি হাল্কা বা মাঝারি এবং কয়েক সেকেন্ডের জন্য হয়, তাহলে বড় দুর্ঘটনা ঘটে না। সিটবেল্ট পরা থাকলে সমস্যা হয় না। আনন্দবাজার জানাচ্ছে, ঝাঁকুনি যদি তীব্র বা অতি তীব্র হয়, তখন বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কয়েক মিনিটে উড়োজাহাজ কয়েক হাজার ফুট নেমে আসতে পারে। তখন প্রচণ্ড ধাক্কায় আঘাত লাগতে পারে যাত্রীদের, মাথা ফেটে যেতে পারে, সিটবেল্ট খুলে গিয়ে বা ছিঁড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙতে পারে। এমনকি বিমানের তীব্র ঝাঁকুনির কারণে যাত্রী মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। অনেক সময় প্রচণ্ড ঝাঁকুনি শুরু হলে ভয়ে ও আতঙ্কে ব্ল্যাকআউট হয়ে যায় যাত্রী অথবা বমি শুরু

করে। আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তায় ‘প্যানিক অ্যাটাক’ও হতে পারে। হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে কারও কারও।

যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে উড়োজাহাজ চলাচলের এমন দশটি পথ আছে, যেখানে ঝাঁকুনির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। আচমকা কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই এয়ার টার্বুল্যান্সের মুখে পড়ে যেতে হয় এসব পথে। পথগুলো হলো আলমাটি থেকে বিশকেক, ল্যানঝো থেকে চেংড়ু, সেন্ট্রায়ার থেকে সেন্ডাই, মিলান থেকে জুরিখ, মিলান থেকে জেনেভা, ল্যানঝো থেকে জিয়াংইয়াং, ওসাকা থেকে সেন্টাই, জিয়াংইয়াং থেকে চেংড়ু, জিয়াংইয়াং থেকে চংকিং, সান্তিয়াগো থেকে সান্তাক্রুজ।

পাখির গতিবিধি

উইলিয়ামস বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন বায়ুর অশান্তিকে আরও স্বাভাবিক করে তুলছে। সহজ ভাষায় জলবায়ু পরিবর্তন উষ্ণ এবং ঠান্ডা বাতাসের তাপমাত্রার ব্যবধান বাড়িয়ে তুলছে। যা ওপরের বায়ুমণ্ডলে ‘জেট স্ট্রিম’ বা ক্ষীণ অশান্ত বায়ুপ্রবাহকে অস্থিতিশীল করে তুলছে এবং আরও অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়াবিদরা কম্পিউটার মডেলিং ব্যবহার করে সব ধরনের অশান্তির পূর্বাভাস পাওয়ার আরও ভালো পদ্ধতি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে কেউ কেউ বলছেন, যাদের সঙ্গে আমরা আকাশে ওড়াকে ভাগ করে নিয়েছি, সেই পাখিদের থেকেও এ বিষয়ে শেখা যায়।

বিবিসির ওই লেখায় ক্যাথেরিন লেথাম বলছেন, আগে গবেষণায় দেখা গেছে, পাখির ওড়া তাপের ওঠানামা, বাতাসের দিক এবং গতিবিধি নির্ধারণে সাহায্য করতে পারে। সোয়ানসি ইউনিভার্সিটির গবেষকরা বলছেন, পাখিদের অভিজ্ঞতা বাতাসে অশান্তির পূর্বাভাস দিতে সাহায্য করতে পারে। তাদের মতে, বাতাসের গতি, দিক এবং অশান্তি সব মোকাবিলা করে পাখিরা প্রায়ই হাজার হাজার মাইল পাড়ি দেয়। কিছু পাখি বাণিজ্যিক জেটের উচ্চতায় উড়তে পারে। অর্থাৎ তারা আকাশের ৩০-৪০ হাজার ফিট ওপর পর্যন্ত উড়তে পারে। তারা কয়েক মাস ধরে উঁচুতে থাকার জন্য তাপ এবং বাতাসের ওপর নির্ভর করে। এত উচ্চতায় পৌঁছাতে প্রায়ই মেঘের হানা মোকাবিলা করে। শেপার্ড বলেন, তারা অবিশ্বাস্যভাবে অশান্ত পরিবেশে উড়তে পারে এবং তারা কীভাবে এটি করতে সক্ষম সে সম্পর্কে আমরা খুব কম জানি।

এ বিষয়ে ২০১৮ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত শেপার্ডের দল একঝাঁক কবুতরের ওপর গবেষণা করেন। পাখিদের সঙ্গে সংযুক্ত জিপিএস এবং অন্যান্য যন্ত্র সংযুক্ত করেন। তারা জানাচ্ছেন, উড়োজাহাজ উড়তে সক্ষম না এমন পরিবেশেও কবুতরগুলো উড়েছে। শেপার্ড বলেন, এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যখন পাইলট অবতরণে বাধ্য হন বা সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি দুর্যোগপূর্ণ সকালে আর উড়তে পারবেন না, কারণ টার্বুল্যান্স খুব শক্তিশালী ছিল; এ পরিস্থিতিতে তার ফ্লাইট নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। কিন্তু কবুতরগুলো কোনো সমস্যা ছাড়াই তেমন পরিস্থিতিতে উড়ে উড়ে মাচায় ফিরে এসেছে। এতে বুঝা যায় পায়রারা উচ্চমাত্রার অশান্তি মোকাবিলা করতে পারে। তাদের কাছে স্পষ্টতই এই অশান্তি মোকাবিলার ব্যবস্থা রয়েছে। সোয়ানসি ইউনিভার্সিটির ওই গবেষণায় পাখিতে আছে এমন ধরনের সেন্সর ব্যবহার করে বাতাসের টার্বুল্যান্স বুঝার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত