সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মূল্যস্ফীতি সরকারি কর্মকাণ্ড ও নীতিমালা

আপডেট : ২৭ মে ২০২৪, ০৯:২৬ এএম

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এটি নিয়ে নানা স্থানে, বিশেষ করে চেম্বারগুলোর ফেডারেশন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসে আলোচনা-সমালোচনা ইত্যাদি হলেও মূল্যস্ফীতি কমানোর বিষয়ে সরকারি কোনো কার্যকরী প্রভাব চোখে পড়ছে না।

তিনটি কারণে কোনো দেশে মূল্যস্ফীতি হতে পারে। প্রথমটি হলো কোনো পণ্যের চাহিদা বেড়ে গেলে আর সরবরাহ আগের মতোই থেকে গেলে, কোনো পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে (জ্বালানি তেলের দাম ও কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে) আর মূল্যস্ফীতি হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেও পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া, হঠাৎ করে মুদ্রা ছাপানো হলেও মূল্যস্ফীতি হতে পারে। কেননা, এক্ষেত্রে পণ্যের জোগান আগের মতো থাকলেও মানুষের হাতে অতিরিক্ত টাকা (যা সরকারের কাছ থেকে আসে) এসে গেলে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যেতে পারে।   

মূল্যস্ফীতি মূলত অর্থনৈতিক বিষয় হলেও দেশের রাজনীতি ও অন্যান্য অনুষঙ্গ একে প্রভাবিত করে থাকে। দেশের ব্যবসায়ীরা (এবং অন্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো) ক্ষমতাসীন দলের পার্টি ফান্ডে চাঁদা প্রদান করে থাকেন। এদিকে, বাংলাদেশের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রায় ২০০ জন ব্যবসায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বলেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের প্রায় ৬৭ শতাংশ ব্যবসায়ী এবং প্রায় ৯০ শতাংশই কোটিপতি। আর এর বাইরে তো পার্টির পেশিশক্তি আছেই। ফলে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার চাল-ডাল-সবজি ও অন্যান্য বাজারের ওপর পেশিশক্তি, চাঁদাবাজি ও ব্যবসায়ী-রাজনীতিকদের বাড়তি মুনাফা দ্রব্যমূল্যকে লাগামহীন করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা অবশ্যই ইউক্রেন পরিস্থিতি, উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য, এবং কোনো কোনো পণ্যের সরবরাহ ঘাটতি আমাদের চিন্তায় রেখেছি। কিন্তু কোন নিয়ামক দ্রব্যমূল্যকে গগনে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে তাও আমরা আলোচনা করে দেখতে চাই।

বাজারে চলছে মনোপলি

মূল্যস্ফীতি অনেকের জন্য মধুর ভান্ডার। তাই, অনেকেই এই মধু থেকে বঞ্চিত হতে চাইবেন না। এখানে বাড়তি দামের ফায়দা শুধু যে ব্যবসায়ীরা নিচ্ছেন, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। আড়ালে আবডালে অনেকেই এই মধু খেয়ে চলেছেন। ভোক্তা অধিকার ও কমপিটিশন কমিশন বসে বসে দেখছে। তাদের আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। সবাই বলছেন সিন্ডিকেশনের কারসাজির কারণে দাম নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। একবার ভেবে দেখুন কয়েকজন ব্যবসায়ী একত্র হয়েছেন তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য। এদের নিজেদের মধ্যে বাস্তবে কোনো প্রতিযোগিতা নেই। এরা জানেন কে কতটা মার্কেট শেয়ার ভোগ করছেন। আলোচনার মাধ্যমে হয়তো তারা এটা ঠিক করে নিয়েছেন। তাহলে এটা তো Oligopoly হলো না। এরা যেন একজন হয়ে কাজ করছেন। তাই, এরা মার্কেটে Monopoly বা একচেটিয়া ব্যবসা উপভোগ করছেন। এরা পরস্পর আত্মীয়স্বজনের মতো আর গঠন করেছেন ভীমরুলের একটি চাক। এখানে কেউ খোঁচা দিতে চায় না। কখনো কখনো, বিশেষ করে ঈদের আগে বা দাম অতিরিক্ত বেড়ে গেলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে গিয়ে আপ্যায়িত হয়ে আসছেন। অর্থাৎ, বাজারে বিক্রেতার সংখ্যা মাত্র একজন, ক্রেতা কোটি কোটি। তাই, যখন যেমন খুশি, দাম হাঁকছেন তিনি। এদিকে, পার্টির সঙ্গে তো হৃদ্যতা আছেই। ফলে কোন ম্যাজিস্ট্রেটের সাধ্য আছে এদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবেন! বরং ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের হেনস্তা করে, টিভি ডেকে সরকারি লোকজন হুঙ্কার দেন। আমরা মনে মনে বাহবা দিচ্ছি এই দাম কমল বলে। বরং যিনি অল্প দামে গরুর মাংস বিক্রি করেছিলেন, তিনি পড়েছেন বিপদে। তাকে শাসানো হয়েছে বলে পত্রিকার খবর হয়েছে।  

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে কী করতে হবে, সরকার কি তা জানে না? না জানলে সরকার কমিশন গঠন করতে পারে, অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ নিতে পারে। এ বিষয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে আরও সক্রিয় করুন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের জবাবদিহির আওতায় আনুন। শীতকালে শাকসবজির উৎপাদন যখন সবচেয়ে বেশি থাকে তখন ফুলকপির দাম ৫০ টাকা হয় কী করে? বাংলাদেশ তো কোনো সবজি আমদানি করে না। এক্ষেত্রে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাহলে দাম বাড়ে কোন মেকানিজমে? 

মূল্যস্ফীতির চারটি অনুমান

মূল্যস্ফীতি কেন কমছে না সে বিষয়ে আমরা চারটি অনুমানে (Assumptions) আসতে পারি।

১. সরকারের উচ্চ মহলের কোনো সদিচ্ছা বা দৃষ্টি এদিকে নেই; ২. মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা পরস্পরের সঙ্গে যথেষ্ট সংযুক্ত না থাকায় ব্যবসায়ীরা দেদার ফায়দা লুটছেন; ৩. সরকারের কেউ কেউ এ বিষয়ে অ্যাকশন নিতে চাচ্ছেন কিন্তু উচ্চ মহলের প্রয়োজনীয় সাড়া সংগ্রহ করতে পারছেন না; ৪. পরিস্থিতি এমনই যে কারোরই কিছু করার নেই।

ধরে নিতে পারি শেষের অনুমানটি সঠিক নয়। দেশের পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে সবাই তাকিয়ে আছে প্রধানমন্ত্রী কখন নির্দেশ দেবেন, তখন ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। বিষয়গুলো বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে আমরা কমবেশি বুঝি। শ্রীলঙ্কা যখন দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছিল, তখন আমরা বগল বাজিয়ে বলেছিলাম, আমাদের অবস্থা ওদের মতো হবে না। গত ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শ্রীলঙ্কার মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ শতাংশ যা বর্তমানে প্রায় ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্য বাড়লে সবসময় দেশের বাইরের সমস্যাগুলোর প্রসঙ্গ টানা হয়। আমরা দেখেছি সরকার করোনা অতিমারী, ইউক্রেন সমস্যা এবং এখন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি টেনে এনে দ্রব্যমূল্যের বিষয়টিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

ডলার চলে যাচ্ছে মার্কিন মুলুকে

এখানে আরেকটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করা যেতে পারে। করোনা অতিমারীর মধ্যে এবং তার পরপরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার অনেক বেশি বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালে ৩ শতাংশ থেকে সাত বার সুদহার বাড়িয়ে ২০২৩ সালে ৫.৫০ শতাংশ করা হয়েছে। পৃথিবীর বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লেনদেন নিষ্পত্তি হয় ডলারে। তাই, যুক্তরাষ্ট্রে ডলারের সুদহার বাড়লে উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে ডলার চলে যেতে থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য সুদহার বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের বাজারে সরকারি বন্ড ছাড়া শুরু করে। এতে বাজার থেকে তারা আরও বেশি ডলার সংগ্রহ করতে পারে। এখন বাংলাদেশ থেকে বৈধ বা অবৈধ পথে ডলার পাচার হলে যারা পাচার করছেন, তারা আসলে দেশীয় মুদ্রা বাজারে টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছেন। কেননা তারা টাকা বিক্রি করে ডলার সংগ্রহ করছেন। ডলারের মূল্য বেড়ে গেলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো বেশি মূল্যে জ্বালানি তেল ও খাদ্য কিনতে বাধ্য হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার দেশে টাকার প্রবাহ কমানোর জন্য তারাও সুদহার বাড়িয়ে দেয়। ফলে আমদানি খরচ যায় আরও বেড়ে। ব্যবসা-বাণিজ্য নানা রকম সমস্যায় পড়ে।   

খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়াল

দেশে এপ্রিল মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে উঠেছিল। এ সময় খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়ে ১০ দশমিক ২২ শতাংশে দাঁড়ায়। মার্চ মাসে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। তার আগে গত বছরের নভেম্বর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। অর্থাৎ চার মাস পর খাদ্য মূল্যস্ফীতি আবার দশ শতাংশ ছাড়াল।

তবে, এপ্রিল মাসে খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে; গত মাসে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ, মার্চ মাসে যা ছিল ৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এপ্রিল মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশে দাঁড়ায় যা আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ। এখন দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি। ভারতে এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৪.৮৩ শতাংশ, নেপালে ৬.৩১ শতাংশ (অনুমিত), ভুটানে ৪.৯৯ শতাংশ (মার্চ), পাকিস্তানে ২০.২০ শতাংশ (মার্চ), আফগানিস্তানে মূল্যস্ফীতি নেগেটিভ ৯.৭০ (ফেব্রুয়ারি) শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার থাইল্যান্ডে মূল্যস্ফীতি ০.৭০ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ২.৭৯ শতাংশ এবং ভিয়েতনামে ৩.৭৪ শতাংশ হয়েছে। তবে প্রতিবেশী রাষ্ট্র মায়ানমারে মূল্যস্ফীতি ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। মায়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দ্রব্যমূল্য লাগামহীন অবস্থায় চলে যাচ্ছে। সেই তুলনায় রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল দেশ। 

কে কী করতে পারেন?

মূল্যস্ফীতি কমাতে সরকার, রাজনৈতিক দল ও ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোর আন্তরিকতা একান্ত দরকার। প্রয়োজনে অতিরিক্ত মুনাফা-বিরোধী শক্তিশালী আইন তৈরি করে প্রয়োজনের সময় তা প্রয়োগ করতে হবে। ব্যবসায়ীদের নৈতিক জ্ঞান বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনে, তাদের একটি নীতি কমিশনের আওতায় আনতে হবে। 

আগাম বন্যা, পাহাড়ি ঢল ইত্যাদি হলে কী করণীয় তা আগেই চিহ্নিত করতে হবে। পাহাড়ি ঢলের তথ্য ভারতের কাছে যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে চাইতে হবে। মাঠে এ সময় কোন কোন ফসল আছে তা স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে দেবেন। মন্ত্রণালয় সে মোতাবেক অন্য মন্ত্রণালয় ও ব্যবসায়ীদের সতর্ক করবে।

ডলার সংকটের কারণে ঠিকমতো ঋণপত্র খুলতে না পারার কারণে পণ্যের সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। দেশ থেকে ডলার পাচার হয়ে যাওয়ার কারণে এবং সিন্ডিকেট দমন করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থামানো যাচ্ছে না।

এদিকে, দেশে ডলার ও রিজার্ভ সংকট থাকলেও সরকার নিজস্ব ব্যয় কমাতে পারেনি। উল্টো টাকা ছাপানোর মতো পদক্ষেপের কারণে বাজারে অর্থ সরবরাহ বেশি হয়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। পাশাপাশি, অপেক্ষাকৃত অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ বন্ধ রাখতে হবে।

আইএমএফের সব শর্ত দেশের জনগণের পক্ষে নয়। একাধিক গবেষণা দাবি করছে এই সংস্থার শর্ত দীর্ঘ মেয়াদে দারিদ্র্য হ্রাস করে না। তাই দারিদ্র্য বিমোচন ও জনগণের সুখ-শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে যুক্তি দিয়ে, রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা দিয়ে আমাদের বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে।

সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যথেচ্ছ পরিমাণে ঋণ নিতে পারবে না। সরকারের ধার নেওয়ার কারণে বাজারে অর্থ সরবরাহ বেড়ে গেছে। এটি বন্ধ করতে হবে। মন্ত্রণালয়গুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সব ক্ষেত্রে দুর্নীতি কমিয়ে আনতে হবে। দেশ থেকে অর্থ পাচার বন্ধ করতে হবে। তাহলেই মূল্যস্ফীতির কারণগুলোও ধীরে ধীরে দূর হতে থাকবে। তখন আলাদা করে কোনো পদক্ষেপ নিতে হবে না।

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত