মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ব্যক্তির ভূমিকাই প্রধান

আপডেট : ৩০ মে ২০২৪, ১২:৫৫ এএম

ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়ে ১৯ জেলার ১০৭ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’ বিদায় নিয়েছে। প্রায় ১৫ ব্যক্তির প্রাণহানির পাশাপাশি প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ জনপদ। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে ফসল, গবাদিপশু, মৎস্য খামারের। সরকারি হিসাবে রিমালে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩৭ লাখ ৫৮ হাজার ৯৬ জন। সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে ৩৫ হাজার ৪৮৩টি এবং আংশিকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৯৯২টি ঘরবাড়ি। এবার ঘূর্ণিঝড় রিমাল দীর্ঘসময় ধরে তাণ্ডব চালালেও তুলনামূলকভাবে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। এ জন্য সরকার এবং দুর্গত মানুষ উভয়েরই ভূমিকা আছে। এটা দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের সক্ষমতারই বহির্প্রকাশ।

ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ দেশ। সক্ষমতা বৃদ্ধি করা ছাড়া আমাদের টিকে থাকা কঠিন। তবে একটা কথা আমাদের মনে রাখা দরকার, দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকার পাশাপাশি ব্যক্তির ভূমিকাকেও বাড়াতে হবে। ব্যক্তিকে দায়িত্ববান হতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। পরিবেশ বিপর্যয় ও দুর্যোগগত সমস্যা সামগ্রিকভাবে জাতীয় সমস্যা। কাজেই এই সমস্যা থেকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা বিশেষ আইনই যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে যা দরকার তা হলো, দেশের প্রতিটি মানুষের সঠিক চেতনাবোধ ও দায়িত্বশীলতা। মানুষ যদি পরিবেশ বিপর্যয়ের সমস্যা সম্পর্কে সচেতন হন, তাহলে যে কোনো রকমের দুর্যোগের কবল থেকে অতি সহজেই নিজেদের অস্তিত্বকে রক্ষা করা সম্ভব, যা অত্যন্ত জরুরি।

মানুষের পক্ষে প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে দুর্যোগের আগে ব্যাপক প্রস্তুতি, জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং দুর্যোগ চলাকালীন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। বস্তুত কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ উৎপত্তির কারণ, তার গতিপ্রকৃতি, আঘাতে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকলে তা দুর্যোগ মোকাবিলায় বা প্রশমনে বাস্তবভিত্তিক প্রস্তুতি গ্রহণে সহায়ক হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সবার পরিবেশ রক্ষায় মনোযোগী হতে হবে। চারপাশে যা কিছু আছে, তা নিয়ে আমাদের পরিবেশ। পরিবেশের প্রধান তিনটি উপাদান মাটি, পানি ও বায়ু। এসব ছাড়া আমরা বেঁচে থাকতে পারি না। যেগুলো দূষিত হলেই দূষিত হয় পৃথিবী। এসব উপাদান বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের মতো আমাদের দেশেও দূষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রাকৃতিক দুর্যোগের বড় কারণ পরিবেশদূষণ। পরিবেশটা কাদের? রক্ষার দায়িত্ব কাদের? পরিবেশ যদি স্বাস্থ্যসম্মত হয়, কাদের লাভ? পরিবেশ সুস্থ থাকলে সুস্থ থাকবে কাদের শরীর ও মন? সব কটির উত্তর যদি ‘আমাদের’ হয়, তাহলে আমাদের ক্ষতি আমরাই করছি কেন? এই প্রশ্ন আমাদের করতে হবে। দৈনন্দিন অভ্যাসেও পরিবর্তন আনতে হবে। পরিবেশকে দূষণের হাত থেকে রক্ষার জন্য বেশি নয়, যদি দুটি অভ্যাস গড়ে তুলি, তাহলে সহজেই রক্ষা পাব। পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করে নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা। গাছ না কাটা এবং বেশি বেশি গাছ লাগানো এগুলো করলেই আমরা অনেক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে পারি। তারপরও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হবেই। এটা ঠেকাতে পারব না। আর জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ মোকাবিলা করা আমাদের একার কাজ নয়। এর জন্য বিশ্ববাসীরই কমবেশি ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কতটা কমানো যায়, সে চেষ্টা আমরা করতে পারি। দেশের মানুষ সরকারের সমালোচনা ও খুঁত ধরতে পারেন। কিন্তু নিজের দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে উদাসীন। সরকার সাইক্লোন শেল্টার তৈরি করে দিয়েছে। আগাম সতর্কতা, প্রচারণা ইত্যাদি কাজও করছে। কিন্তু সতর্কতা মানে কয়জন? অনেকে গবাদিপশু রক্ষণাবেক্ষণের দোহাই দেন। অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রের ত্রুটিপূর্ণ পরিবেশের কথা বলেন। কিন্তু সব কিছু ঠিক করে দেওয়া কি সরকারের পক্ষে সম্ভব?  সব কিছু সরকার করে দেবে, এটা নেতিবাচক ভাবনা। সরকার বাঁধ নির্মাণ করে দেবে, ঘরবাড়ি বানিয়ে দেবে, খাবার দেবে, গাছ লাগিয়ে দেবে, দুর্যোগের সব ক্ষয়ক্ষতি মিটিয়ে দেবে এটা একটা অবাস্তব কল্পনা। সরকার কিছু করে না, তা নয়। সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে নিজেদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হবে। প্রয়োজনে যৌথভাবে দুর্যোগ মোকাবিলার উদ্যোগ নিতে হবে।

একসময় দেশে ব্যক্তি বা কমিউনিটির উদ্যোগে রাস্তা মেরামত হতো। কাঠ-বাঁশ দিয়ে ভুক্তভোগী গ্রামবাসীরা সেতুও বানিয়ে নিত। গ্রামে বিভিন্ন শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে গড়ে উঠত। কেউ দিত বেড়া, কেউ খুঁটি, কেউ টিন আর কেউ শ্রম। এভাবে সামাজিক উদ্যোগগুলো একসময় গ্রামীণ জীবনকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল। এখন বাড়ির সামনে একটা গর্ত হলেও, কেউ সেটা ভরাট করার উদ্যোগ নেয় না। যত ধরনের বিড়ম্বনাই আসুক না কেন, সব সহ্য করে অপেক্ষা করে ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের লোকেরা কখন আসবে, কখন গর্ত ভরাট করে দেবে? সবসময় সবকিছুতে পরমুখাপেক্ষী হয়ে বসে থাকি। এটা আমাদের একটা খারাপ বৈশিষ্ট্য। আমরা নিজেরা রাস্তায় ময়লা-আবর্জনা ফেলে অপেক্ষায় থাকি সিটি করপোরেশনের লোকেরা কখন তা পরিষ্কার করবে। সব ক্ষেত্রে আমাদের পরনির্ভরশীলতা, পরমুখাপেক্ষী হয়ে বসে থাকার প্রবণতা। অল্প শ্রমে বেশি সাফল্য। আমাদের শিক্ষার্থীরা পর্যন্ত লেখাপড়ায় মনোযোগী নয়। তারা চায় প্রশ্নপত্র। অল্প পড়ে বেশি সাফল্য। জানা-বোঝা-বিশ্লেষণী ক্ষমতা কতটুকু বাড়ল, তা নিয়ে কেউ চিন্তিত নয়। কত কম পড়ে, কম জেনে-বুঝে কত বেশি নম্বর পাওয়া যায়, সেই চেষ্টা করে। অভিভাবকরাও এখন সন্তান জ্ঞানী হোক, ভালো মানুষ হোক এটা খুব একটা চায় বলে মনে হয় না। তারাও চায়, সন্তান অল্প সময়ে অল্প পরিশ্রমে, প্রয়োজনে বিনা পরিশ্রমে বেশি বেশি টাকা উপার্জন করতে শিখুক। অনেক সুযোগ থাকার পরও যুবারা আত্মকর্মসংস্থানের চেষ্টা করে না। চাকরি তালাশ করে। চাকরির জন্য যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা করে না। বাবা-মার সম্বল নিংড়ে নিয়ে টাকার বস্তা হাতে চাকরির জন্য একটা কার্যকর ‘লাইন’ খুঁজে বের করার চেষ্টা করে।

দুর্যোগ মোকাবিলাতেও আমাদের পরনির্ভরশীলতা। সরকার বা এনজিওর দিকে চেয়ে থাকা। তাদের ভূমিকার সমালোচনা করা। কিন্তু নিজেরা আমরা দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের ব্যাপারে সীমাহীন উদাসীনতা প্রদর্শন করি। অথচ নিজেরা যদি আমরা সচেতন হই, উদ্যোগী ভূমিকা পালন করি, তাহলে অনেক সমস্যাই সহজে সমাধান করে ফেলতে পারি। দুর্যোগ মোকাবিলায় নাগরিকদের সচেতনতা ও ভূমিকা পালনের কোনো বিকল্প নেই। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, অতিবৃষ্টি, খরা ইত্যাদির সঙ্গে সংগ্রাম করেই এ দেশের মানুষকে টিকে থাকতে হবে। প্রতিনিয়ত পরিবেশদূষণ, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং গ্রিন হাউজ ইফেক্টের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হার ও মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। তাই পরিবেশের সুরক্ষার ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় সমাজের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট ও লেখক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত