বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

দুর্যোগে ক্ষতিপূরণ হয়!

আপডেট : ৩০ মে ২০২৪, ১২:০১ এএম

ঘূর্ণিঝড় রিমাল পটুয়াখালীর খেপুপাড়া উপকূলে প্রথম আঘাত হানে রবিবার রাতে। তারপর বাংলাদেশের ভূখন্ডে ৪০ ঘণ্টা ধরে তান্ডব চালায়। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘূর্ণিঝড়ের ধরন বদলে যাচ্ছে। প্রভাব এবং বিস্তারও বড় হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকা লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। বৃষ্টি হয়েছে দেশের অধিকাংশ এলাকায়। বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাও লন্ডভন্ড হয়ে যায়, মোবাইল নেটওয়ার্ক বিঘ্নিত হয়েছে। 

ঢাকা রিমালের গতিপথে ছিল না। কিন্তু রবিবার রাত থেকে টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে যায় জনজীবন। সোমবার ঢাকার মেট্রোরেল চলাচল বারবার বিঘ্নিত হয়। জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে মানুষকে। রাস্তাঘাটে যানবাহন পেতে বৃষ্টিতে ভিজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। ঢাকায় ঝড় তেমন হয়নি, টানা বৃষ্টি হয়েছে। তাতেই নগরবাসীর হাহাকার। আমরা কি এখানে বসে টের পাচ্ছি, উপকূলের মানুষের দুর্দশা?

সরকারের নানা চেষ্টা, মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার কারণে ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। একসময় এই অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ে লাখো মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এবার রিমালের আঘাতে নানাভাবে ২০ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। আরেকটু সতর্ক থাকলে হয়তো প্রাণহানি শূন্যে নামিয়ে আনাও সম্ভব। তবে জান বাঁচলেও সম্পদের যে ক্ষতি হয়, তা অপূরণীয়। এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির পুরো চিত্র পাওয়া যায়নি। তবে যা খবর আসছে, তাও অনেক। ধারণা করা হচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু, বাঁধ ভাঙা, মাছের ঘের ভেসে যাওয়া সব মিলিয়ে ক্ষতিটা অনেক বড় আকারেরই হবে। প্রাথমিক হিসাবে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ২৬৩টি স্থানে বেড়িবাঁধের ৪১ কিলোমিটার এলাকা বিধ্বস্ত হয়েছে। আংশিক ও পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে দেড় লাখ ঘরবাড়ি। ভেসে গেছে কয়েক হাজার মাছের ঘের ও পুকুর। বাঁধ এখন যেমন ভঙ্গুর অবস্থায় আছে, আরেক দফা বৃষ্টি হলে আরও অনেক বাঁধ ঝুঁকির মুখে পড়বে।

রিমাল আসার আগে অনেক জায়গায় দেখা গেছে, মানুষ জীবনের চিন্তা না করে বাঁধ রক্ষায় স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করছেন। বাঁধ ভেঙে ফসল ও মাছের ঘেরের যে বিপুল ক্ষতি হয়, তা অকল্পনীয়। সে কারণেই সাধারণ মানুষ সরকারের অপেক্ষায় না থেকে নিজেরাই নেমে পড়েন বাঁধ রক্ষায়। কিন্তু প্রবল জোয়ার আর জলোচ্ছ্বাসে সাধারণ মানুষের এই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত খুব একটা কাজে আসে না। এটা মানতেই হবে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের নানা চেষ্টায় ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। তারপরও ক্ষতি যা হয়, তা পূরণ হয় না কখনোই। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জোয়ার বা জলোচ্ছ্বাসে বছর বছর বাঁধ ভাঙে। বাঁধ ভাঙলে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয়। কিন্তু লাভ হয় ঠিকাদারদের আর প্রকৌশলীদের। কখনো কখনো আমরা প্রকৃতির কাছে অসহায় থাকি বটে। কিন্তু টেকসই বাঁধ নির্মাণ কি একেবারেই অসম্ভব? সরকার হয়তো ভেঙে যাওয়া বাঁধ আবার মেরামত করবে, আবার অর্থ বরাদ্দ হবে। কিন্তু সাধারণ মানুষ বা কৃষকের যে ক্ষতি হয়, তার দায় কে নেবে। একটু বেশি অর্থ দিয়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা গেলে সরকারের অর্থও সাশ্রয় হবে, আবার সাধারণ মানুষের সম্পদও রক্ষা পাবে।

ঘূর্ণিঝড়ের সময় সরকার, গণমাধ্যম সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই আগ্রহ বা মনোযোগ থাকবে বড়জোর এক সপ্তাহ। তারপর সবাই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোকে ভুলে যাবে। তাদের লড়াই তাদেরই লড়তে হবে। যতক্ষণ ঘূর্ণিঝড়, ততক্ষণই ভোগান্তি। কিন্তু কিছু ক্ষতি আছে দীর্ঘমেয়াদি। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অনেকে প্রাণের মায়াও করেন না। ঘরবাড়ি, গবাদিপশু ফেলে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চান না। সম্পদ যদি চলে যায় বেঁচে থাকলে খাবেন কী, এ নিয়ে অনেকে শঙ্কিত থাকেন। মোংলার একজন সাংবাদিক সারা দিন ঘূর্ণিঝড়ের খবর জানিয়েছেন। কিন্তু রাতে নিজেই খবর হয়ে গেছেন। ঘূর্ণিঝড় উড়িয়ে নিয়েছে তার ঘরের চাল। ফোন করে বললেন, দুই সন্তান ও পরিবারসহ কোনোরকমে টিকে আছেন। একজন সাংবাদিক হয়েও তিনি টিনের ব্যবস্থা করতে পারেননি। আর উপকূলের লাখ লাখ মানুষ এখন ঘরহারা, খোলা আকাশের নিচে কাটাচ্ছে জীবন। ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারের নানা উদ্যোগ, বরাদ্দ থাকে। কিন্তু সেই বরাদ্দ নিয়ে নয়-ছয়ের অভিযোগ আসে বিভিন্ন সময়ে। বরাদ্দ চুইয়ে চুইয়ে প্রান্তিক মানুষের কাছে যেতে যেতে তেমন কিছুই থাকে না। আগের মতো না হলেও ছোট করে হলেও মানুষ আবার ঘর বানাবে। কিন্তু ফসল বা গবাদিপশু হারানোর ক্ষতি পোষানোর আর কোনো উপায় থাকে না। একবার ফসল হারালে প্রান্তিক মানুষদের অনেকে সারা জীবনের জন্য নিঃস্ব হয়ে যান।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতি বছরই বন্যা হয়, ছোট বা বড় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। সিডর বা আইলার ক্ষতি এখনো অনেক মানুষ পুষিয়ে উঠতে পারেনি। আম্পান, মোখা বা সিত্রাংয়ের ক্ষতি সামগ্রিক বিবেচনায় কম হলেও যার গেছে সে-ই জানে। যে কৃষকের সারা বছরের জীবিকার ফসল তলিয়ে যায় বা দুটি গরু মারা যায়; তার কাছে ঘূর্ণিঝড় ছোট না বড় তাতে কিছু যায়-আসে না। তার জন্য তো ছোট ঝড়ও সারা জীবনের কান্না। সিডর এবং আইলা বিস্তীর্ণ এলাকার মাটির উর্বরা শক্তি কেড়ে নিয়েছে। জোয়ারের লোনাপানি ঢুকে ফসলের ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। অনেক এলাকায় খাবার পানির সংকট তৈরি হবে। প্রান্তিক কৃষক তো বটেই, অনেক সম্পন্ন গৃহস্থকেও পথে বসিয়ে দেয় একেকটি ঝড়। বাঁধ ভেঙে মাছের ঘের ভেসে যাওয়ার অনেক দাপুটে ঘেরমালিকও পথে বসে যান।

ঘূর্ণিঝড়ের পর সরকার হয়তো সাময়িক কিছু সহায়তা করবে। তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করবে। সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারের উচিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকা। ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক মানুষদের কণ্ঠ তত শক্তিশালী নয়। তাই সবাই হয়তো একসময় তাদের ভুলে যাব। কিন্তু বেঁচে থাকতে হলে লড়াইটা চালাতেই হবে। বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষদের টিকে থাকার ক্ষমতায় আমি বিস্মিত। প্রতিবার বন্যা বা ঝড়ের পর ভাবি, সব হারানো মানুষগুলো কীভাবে বেঁচে থাকবে? নিজেকে দিয়েই ভাবি, বারবার এমন নিঃস্ব হলে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি বা সাহস কি আমার বা আমাদের আছে? সিডর বা আইলায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, রিমাল তো তাদের বাদ দেয়নি। বারবার ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার যে অফুরন্ত জীবনী শক্তি, তা দেখে আমি অনুপ্রাণিত হই। আমরা যদি একটু তাদের পাশে থাকি, লড়াইটা সহজ হয়। এখানে গণমাধ্যমের একটা বড় দায়িত্ব আছে। গণসমাধ্যম যদি ক্ষয়ক্ষতির খবর রাখে, নিয়মিত ফলোআপ করে; সরকার তাদের পাশে থাকতে বাধ্য হবে। ক্ষতি যা হয়, তার পুরোটা পূরণ হবে না। আমরা যেন এই লড়াকু মানুষগুলোকে ভুলে না যাই। একটু সহানুভূতি নিয়ে যেন তাদের পাশে থাকি।

লেখক: বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত