শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

রেডিয়েশন ভীতিতে বিঘ্নিত মোবাইল

আপডেট : ৩০ মে ২০২৪, ০৬:১৪ এএম

মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে হঠাৎ কেটে যাওয়া কিংবা কাক্সিক্ষত নেটওয়ার্কের অভাবে ঠিকমতো কল করতে না পারার অভিযোগ অনেক দিনের। এর জন্য অপর্যাপ্ত টাওয়ার ও দুর্বল টাওয়ারকে এবং অপারেটরদের দায়ী করা হলেও তাদের বক্তব্য, রেডিয়েশনের ভয়ে তারা পর্যাপ্ত টাওয়ার বসাতে পারছেন না।

রেডিয়েশন-ভীতি যথার্থ নয় বলে প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের গবেষণায় স্বাভাবিকের চেয়ে রেডিয়েশনের মাত্রা বেশি হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের কর্মকর্তারা বলেছেন, স্পেকট্রাম বা ফ্রিকোয়েন্সি এবং টাওয়ারের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে মোবাইল নেটওয়ার্কের গুণগত মান। স্পেকট্রাম নিয়ে সমস্যা নেই, সমস্যা হলো টাওয়ার স্থাপন নিয়ে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে প্রতিনিয়ত নতুন অবকাঠামো নির্মাণের ফলে মোবাইল নেটওয়ার্ক বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আবার নতুন সাইটে মানুষের আপত্তির কারণে পর্যাপ্ত টাওয়ার স্থাপন করা যাচ্ছে না।

অপারেটররা বলছেন, গত বছর ৫০০টি টাওয়ারের চাহিদা থাকলেও মাত্র ৩০টি টাওয়ার বসানো গেছে। পুরনো টাওয়ার নিয়েও অনেক জায়গায় বিপাকে পড়েছেন তারা। ভবন মালিকের আপত্তি, রেডিয়েশন ভীতি এসব কারণে প্রতি বছর গড়ে ২০০টি পুরনো টাওয়ার সরিয়ে নিতে হচ্ছে। বিটিআরসির তথ্যমতে, গত এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোবাইল টাওয়ার ৪৫ হাজার ২৩১টি।

একটি মোবাইল অপারেটরের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজধানীর গুলশানে আজাদ মসজিদের ওপর সব অপারেটরের টাওয়ার ছিল। বছর দুই আগে মসজিদ কমিটির আপত্তির কারণে সবাইকে টাওয়ার সরিয়ে নিতে হয়েছে। এরপর ওই এলাকায় চাহিদামতো টাওয়ার বসানো যায়নি। ফলে গুলশান-১ থেকে গুলশান-২-এ যাওয়ার পথে মোবাইল নেটওয়ার্ক সমস্যায় পড়েন গ্রাহকরা।

সম্প্রতি বিটিআরসিতে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে সংস্থাটির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বিটিআরসি সারা দেশে বিভিন্ন শহর ও উপজেলায় টাওয়ার-রেডিয়েশন পরিমাপ করে দেখেছে, এর মাত্রা আন্তর্জাতিক মানদন্ডের নিচে রয়েছে। রেডিয়েশন নিয়ে শঙ্কার কিছু নেই। টাওয়ার শেয়ারিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এক টাওয়ার থেকে অন্য অপারেটররাও সেবা নিতে পারবে। এতে টাওয়ার সংখ্যা কম হলেও সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

প্রতি বছর মোবাইল নেটওয়ার্কের চাহিদা বাড়তে থাকায় টাওয়ার-চাহিদাও বাড়ছে। দেশে মোবাইল টাওয়ার নির্মাণের জন্য কাজ করছে চারটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা, ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন নন-আয়োনাইজিং রেডিয়েশন প্রোটেকশন (আইসিএনআইআরপি) ও ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের আদর্শ মান অনুযায়ী, রেডিয়েশনের অনুমোদিত সীমা প্রতি বর্গমিটারে ২.১০৬ মিলিওয়াট (এমডব্লিউ/এম ২)। বিটিআরসি বিভিন্ন এলাকায় রেডিয়েশনের বিকিরণ পরিমাপ করে পেয়েছে গড়ে ০.৫৮ মিলিওয়াট থেকে ০.৭৭ মিলিওয়াট, যা আন্তর্জাতিক মানদন্ডের অনেক নিচে।

টাওয়ারের রেডিয়েশন থেকে মানবদেহে ক্যানসার, পুরুষের বন্ধ্যত্ব, শিশুর জন্মত্রুটি, ফসলি জমি নষ্ট হওয়া, গাছপালা মরে যাওয়ার ধারণা রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। যদিও এসবের শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

মোবাইল অপারেটর ‘রবি’র সেক্রেটারি ও চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার মোহাম্মদ সাহেদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রেডিয়েশন মূলত দুই ধরনের, আয়োনাইজিং ও নন-আয়োনাইজিং। এক্স-রে, গামা রশ্মি ও ডায়াগনস্টিক রেডিয়েশন হলো আয়োনাইজিং রেডিয়েশন, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। আর মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশন হল নন-আয়োনাইজিং, এর শক্তির মাত্রা অনেক কম, মানুষের শরীরের চামড়া ভেদ করতে পারে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছে, এতে মানুষের ভয়ের কোনো কারণ নেই। মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশেন নিয়ে মানুষের ভয় পুরোপুরি অমূলক।

তিনি বলেন, ‘রেডিয়েশন নিয়ে অমূলক ধারণার কারণেই চাহিদামতো মোবাইল টাওয়ার বসানো যাচ্ছে না। অপারেটররা এবং বিটিআরসি তথ্য-প্রমাণসহ প্রচারণা চালাচ্ছে। সেবার মান ঠিক রাখতে আমরা সিটি করপোরেশনের অনুমতি নিয়ে রাস্তার সড়ক বিভাজকে ছোট ছোট টাওয়ার বসিয়েছি। যদিও এগুলো অনেক ব্যয়বহুল এবং কাক্সিক্ষত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।’

আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটি বলেছে, মোবাইল ফোনের টাওয়ার থেকে নির্গত রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির সংস্পর্শে আসার ফলে জনস্বাস্থ্য লক্ষণীয়ভাবে প্রভাবিত হয়েছে বলে কোনো শক্ত প্রমাণ তাদের কাছে নেই। টাওয়ারের রেডিও তরঙ্গ যে একেবারে নিরাপদ, সে প্রমাণও তাদের কাছে নেই।

বিটিআরসির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি বহুতল ভবনে সঠিক ডিজিটাল সংযোগ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। বিল্ডিং কোডের মধ্যে একটি ধারা যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি ওয়াইফাই প্রযুক্তি চালু করার বিষয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরমাণু প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে করা এক গবেষণায় দেশের কিছু জায়গায় টাওয়ার-রেডিয়েশন আন্তর্জাতিক মানদন্ডের চেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে।

শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৩৬১টি স্থানে মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশন ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের নির্ধারিত মানদন্ডের চেয়ে এমনকি ভারতের চেয়েও বেশি পাওয়া গেছে। এটি নীরব ঘাতক হিসেবে পরিচিত। ক্রমাগত এ বিকিরণের সংস্পর্শে থাকলে মানবদেহের ক্ষতি হতে পারে। তবে মানুষের কী ক্ষতি হতে পারে সে পরীক্ষা করা হয়নি। কারণ মানবদেহের মতো সেল তৈরি করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা অনেক ব্যয়বহুল।’

তিনি বলেন, ‘বিটিআরসি রেডিয়েশন নিয়ে যে ফল প্রকাশ করেছে তাতে সঠিক প্যারামিটার অনুসরণ করা হয়নি। এটাকে স্ট্যান্ডার্ড বলা যায় না। মোবাইল টাওয়ার স্থাপনের নীতিমালা অপারেটররা মানছে না। এ ক্ষেত্রে বিটিআরসির ভূমিকা নীরব।’

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফাঁকা জায়গায় মাইক্রোওয়েব লিংক ক্ষতিকর না হলেও ঢাকা কিংবা আরবান সিটিতে যেখানে ভবনগুলো খুব কাছে থাকে এবং ঘনবসতিপূর্ণ জায়গায় ক্ষতি করছে কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা দরকার। মোবাইল ফোন, ওয়াইফাই বা অন্যান্য যন্ত্র থেকে নির্গত রেডিয়েশন মানবদেহের জন্য কতটুকু সহনশীল, তার সঙ্গে মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশনের পার্থক্য কতটুকু এ বিষয়ে মানুষকে স্বচ্ছ ধারণা দেওয়া হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত