বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

হজের সফরে করণীয় কিছু বিষয়

আপডেট : ৩১ মে ২০২৪, ০৪:১০ এএম

ফরজ ইবাদত হজের অন্যতম শিক্ষা হলো তাওহিদ বা একত্ববাদ। বলা যায়, একত্ববাদই হজের প্রাণ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা হজ ও ওমরাহ আল্লাহর জন্য সম্পন্ন করো।’ (সুরা বাকারা ১৯৬) যে ব্যক্তি জেনে-বুঝে আল্লাহর নির্দেশাবলির বিরুদ্ধাচরণ করে, তার জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। আজকাল হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের অনেকেই এ বিষয়ে অসতর্ক। তারা প্রথমত হজ ও ওমরাহর নিয়মাবলি জানতে চেষ্টা করে না। যদিওবা জানে, অনেকেই তা যথাযথভাবে পালন করে না। অনেকে ওয়াজিবও পরিত্যাগ করে। আর সুন্নত-মুস্তাহাবের তো কথাই নেই। তাই হজপালনকারীদের এ বিষয়গুলো মনে রাখা আবশ্যক।

এ ছাড়া ধর্ম পালনে ইখলাস ও ঐকান্তিকতা যেন অর্জিত হয় এবং লোক দেখানো থেকে যেন দূরে থাকা যায়, সে বিষয়ে সতর্কতা কাম্য। এজন্য হজের সময় আল্লাহর কাছে আকুতি প্রকাশ করতেন নবী কারিম (সা.)। তিনি দোয়ায় বলতেন, ‘আল্লাহুম্মা হিজ্জাতুন লা রিয়ায়া ফিহা ওয়ালা সুময়াতা।’ অর্থ : হে আল্লাহ! এমন হজ চাই, যা হবে লোক দেখানো ও রিয়া থেকে মুক্ত।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ ২৮৯০)

নিঃসন্দেহে দোয়া একটি অপরিসীম গুরুত্বের বিষয়। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়ার প্রতি বিশেষভাবে যতœবান ছিলেন। তিনি দোয়াকে ইবাদত সাব্যস্ত করেছেন। হজে রাসুলুল্লাহ (সা.) অধিক পরিমাণে দোয়া করতেন। তিনি কাবা তাওয়াফের সময়, সাফা-মারওয়ার ওপর দাঁড়িয়ে, আরাফাতের মাঠে উটের ওপর বসে হাত বুক পর্যন্ত উঠিয়ে দীর্ঘ দোয়া ও কান্নাকাটি করেছেন। আরাফাতের যে জায়গায় তিনি অবস্থান করেছেন, সে জায়গায় স্থির হয়ে সূর্য ঢলে গেলে নামাজের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দোয়া করেছেন। এ ছাড়া মুজদালিফায় ও দুই জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপের পর দাঁড়িয়ে হাত উঠিয়ে দীর্ঘক্ষণ দোয়া করেছেন।

হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের হজ সম্পন্ন করলে আল্লাহকে স্মরণ করো, যেমন তোমরা স্মরণ করো তোমাদের পিতাদের।’ (সহিহ মুসলিম ১৫৬৪)

আরেক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত জাবের (রা.) বলেন, ‘হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করে কান্না শুরু করলেন, কান্নায় দুই নয়ন ভেসে গেল। অতঃপর তিনি তিন চক্কর রমল করেন এবং চার চক্কর হেঁটে চলে শেষ করলেন। সমাপ্তির পর তিনি হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করেন, এর ওপর দুই হাত রাখেন এবং তা দিয়ে চেহারা মাসেহ করেন।’ (সুনানে বায়হাকি ৫/৭৪)

আমাদেরও উচিত হজের সফরে বেশি বেশি দোয়া করা, গুনাহ থেকে তওবা করা, সুখ-সমৃদ্ধি, সুস্থতা ও উন্নতির জন্য দোয়া করা। হজে যাওয়ার আগেই নির্দিষ্ট কিছু দোয়া মুখস্থ করা। কারণ হজের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রয়েছে নির্দিষ্ট দোয়া। তাওয়াফে, সায়িতে ও আরাফাতের ময়দানে। তাই কখন কোন দোয়া কীভাবে পড়তে হবে, তা এখনই জেনে নিন। সময় নিয়ে তা ভালোভাবে মুখস্থ করুন। এমন যেন না হয় যে, হজ করিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দোয়াও অন্যজনকে পড়িয়ে দিতে হয়। এটি দ্বীনের ক্ষেত্রে অসচেতনতা ও অবহেলা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেমদের লিখিত বই সংগ্রহ করুন। এখনই দোয়াগুলো মুখস্থ করুন। প্রয়োজনে নিকটস্থ আলেমের সহযোগিতা নিন। এ ধরনের দোয়ার সংখ্যা খুব বেশি নয়। সুতরাং ঘাবড়ানোর কিছু নেই। অল্প কিছু ছোট ছোট দোয়াই তো আপনাকে মুখস্থ করতে হবে, এটা কঠিন কোনো বিষয় নয়। একটু চেষ্টা করলেই আপনি পারবেন। আর সাধারণ দোয়া তো নিজ ভাষাতেই করা যায়।

হজের সফরে প্রতিটি সুন্নত আমলের ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া। হজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আপনি চেষ্টা করুন যেন আপনার হজ হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হজের মতো হয়। সব স্থানে সবক্ষেত্রে সুন্নতের অনুসরণের মাধ্যমেই আপনার হজ হতে পারে ‘হজে মাবরুর’ বা কবুল হজ। যে হজের প্রতিদান একমাত্র জান্নাত।

এক্ষেত্রে একটি বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। জিলহজ মাসের এগারো ও বারো তারিখে মিনায় অবস্থান করা সব মাজহাবেই ওয়াজিব। শুধু হানাফি মাজহাব মতে তা সুন্নত। কিন্তু সুন্নত বলে তা অবহেলার নয়। দেশে থাকাকালে আমরা কত-শত সুন্নত পালনের চেষ্টা করি এবং অন্যকেও উদ্বুদ্ধ করি। আবার কখনো কখনো অধীনস্তদের ওপর চাপ প্রয়োগ করি। কিন্তু হজে এসে এই গুরুত্বপূর্ণ আমলটিকে সুন্নত ভেবে আমরা অনেকেই ত্যাগ করি। ওজর-আপত্তি ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) করেছেন এমন আমল পরিত্যাগ করি। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। হাজি সাহেবরা তো দ্বীনকে জিন্দা করতে এবং নিজেকে সুন্নত পালনে আগ্রহী করতেই হজে যাচ্ছেন। সুতরাং হজের সফরে সুন্নত আদায়ে বেশি চেষ্টা করা উচিত।

কোরআন-হাদিস ইসলামের মূল ভিত্তি আর হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) হজের সফরে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-কে তা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের মাঝে দুটি বিষয় রেখে যাচ্ছি। যতদিন তোমরা তা আঁকড়ে ধরবে, তোমরা বিভ্রান্ত হবে না। তা হলো আল্লাহর কিতাব ও তার রাসুলের সুন্নাহ (হাদিস)।’ (মুসনাদে আহমাদ)

হজের সফরে এসে মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববিতে নামাজ আদায় করার সুযোগ পাওয়া যায়। এই সুযোগটিকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে কাজে লাগানো উচিত। মহিমান্বিত এই সফরে সামনের কাতারে নামাজ আদায়ের অভ্যাস গড়ারও একটি সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের দেশীয় অনেক হাজি সাহেবকেই হারামের বাইরের প্রাঙ্গণে ও রাস্তায় নামাজ আদায় করতে দেখা যায়। অথচ ভেতরের কাতার অনেক ফাঁকা থাকে। আপনি বাইরে বসে না থেকে হারামের ভেতরে চলে যান। সামনের কাতারে নামাজ আদায় করার সওয়াব হাসিল করুন। যে সওয়াবের ব্যাপারে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি লোকেরা প্রথম কাতার ও আজানের ফজিলত কী তা জানত, আর তা লটারি ছাড়া লাভ করা সম্ভব না হতো, তবে তারা লটারির মাধ্যমে হলেও তা লাভ করার চেষ্টা করত।’ (সহিহ বুখারি ৪৩৭)

লেখক : প্রিন্সিপাল, পদুয়া কাসেমুল উলুম মাদ্রাসা, ফেনী

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত