সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

হিংসার বার্তায় লক্ষ্য অর্জনের কৌশল

আপডেট : ৩১ মে ২০২৪, ০৪:১৪ এএম

পশ্চিম উত্তর প্রদেশের মিরাট লোকসভা আসনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সোশ্যাল মিডিয়া কো-অর্ডিনেটর ও দলটির কর্মী অঙ্কুর রানা। তার ৪০০ থেকে ৪৫০টি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ রয়েছে, যার প্রতিটিতে ২০০ থেকে ৩০০ সদস্য আছেন। তাদের কাছেই দ্রুত হাতে ফোনে টাইপ করে বার্তা পাঠাচ্ছেন রানা। অনেককে বার্তা পাঠানোর বিষয়টি সমন্বয়ও করছেন। সব মিলিয়ে তিনি ভোটের আগে থেকে ব্যক্তিগতভাবে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষের কাছে বার্তা পাঠান। উত্তর প্রদেশের আরও কয়েক ডজন লোকসভা আসনে এই একই ধরনের দল গঠন করা হয়। চলতি বছরের লোকসভা নির্বাচনে ৩৭০টি আসনের টার্গেটে পৌঁছানোর জন্য অন্যান্য ম্যাসেজিং অ্যাপ এবং সোশ্যাল মিডিয়ার পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপকেই মূল পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে বিজেপি। কারণ দেশটির ৫০ কোটিরও বেশি মানুষ প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা সময় এই ম্যাসেজিং প্ল্যাটফর্মে ব্যয় করে।

বিবিসি বলছে, বিজেপির এই ‘হোয়াটসঅ্যাপ অভিযানে’র ব্যাপকতা সত্যিই বিস্ময়কর। বার্তায় এক দিনে যেমন বিজেপির গুনগান থাকছে, তেমনি থাকছে বিরোধীদের সমালোচনাও। তবে বিজেপির পক্ষে যেসব বার্তা যায়, তার অনেকগুলোয় থাকে ভুয়া তথ্য। আর বিরোধীদের বিষয়ে বার্তায় স্পষ্ট ফুটে ওঠে হিংসার বার্তা।

উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় সোশ্যাল মিডিয়া সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেন এমন আরও দশজন বিজেপি কর্মীর সঙ্গে বিবিসি কথা বলেছে, যাদের প্রত্যেকেই জানিয়েছেন যে তারা কয়েকশ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ পরিচালনা করেন। এর প্রত্যেকটিতে ২০০ থেকে ২০০০ সদস্য রয়েছেন।

বিজেপি কর্মীরা জানান, তাদের কাজটি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত অভিযান। প্রতিদিন দিল্লির সদর দপ্তর থেকে তাদের রাজনৈতিক বার্তা এবং হ্যাশট্যাগ পাঠানো হয়। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপির প্রশংসা থেকে শুরু করে বিরোধীদের সমালোচনা পর্যন্ত রয়েছে।

একটি ভাইরাল বার্তা, যা বিভিন্ন গ্রুপে বহুবার ফরোয়ার্ড করা হয়েছিল, সেখানে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু মুসলিমদের তোষণ করার অভিযোগ আনা হয়। সেই ভাইরাল বার্তা বিবিসির নজরেও এসেছে। সেখানে হিন্দিতে লেখা ছিল, কংগ্রেস ইতিমধ্যেই ভারতকে ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছে, তারা কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে এটি ঘোষণা করেনি। ওই হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় ১৮টি পন্থার তালিকা প্রকাশ করে দাবি করা হয়েছিল, ওই পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করেই নাকি কংগ্রেস মুসলিমদের তোষণ করে থাকে।

এই বার্তার উৎস কোথায় তা প্রমাণ করা অসম্ভব। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় নির্বাচনী সমাবেশে বিজেপি নেতৃত্বের মন্তব্যের প্রতিফলন কিন্তু এই বার্তায় দেখা যায়।

গত এপ্রিল মাসে যেমন একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে স্বয়ং নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধেও ইসলামোফোবিয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। কারণ একটি নির্বাচনী সভায় তিনি মন্তব্য করেছিলেন, বিরোধীরা ক্ষমতায় এলে জনগণের সম্পদ অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে বিলিয়ে দেবে। অনুপ্রবেশকারী বলে প্রধানমন্ত্রী মুসলিমদের ইঙ্গিত করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।

এর পুনরাবৃত্তি করে বিজেপি তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হ্যান্ডেলগুলো থেকে অ্যানিমেটেড ভিডিও-ও শেয়ার করেছে। বিজেপি নেতাদের যে দাবি, কংগ্রেসের ইশতেহারে বিষয়টির (জনগণের সম্পত্তি মুসলিমদের বিলিয়ে দেওয়ার) উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সেটা ভুল। বাস্তবে কংগ্রেসের ইশতেহারে সম্পদ পুনর্বণ্টন বা মুসলমান জাতীয় শব্দের উল্লেখই নেই।

রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কিরণ গারিমেলা ভারতে হোয়াটসঅ্যাপের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বিবিসিকে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর আনুষ্ঠানিক মতাদর্শের প্রতিফলন সাধারণত ব্যক্তিগত গ্রুপগুলোয় শেয়ার করা বার্তাতেও দেখা যায়। তিনি আরও বলেন, তাদের (বিজেপির) টপ-ডাউন পদ্ধতি রয়েছে, আইটি সেলের (বিজেপির সোশ্যাল মিডিয়া টিম) অভিযান আছে, সেই অভিযানকে ঘিরে একটা কনটেন্ট তৈরি করা হয়, যা ক্রমাগত শেয়ার করা হয়। তবে এই পুরো জিনিসটার বিশেষত্ব হচ্ছে, সাধারণ মানুষও এই মতাদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করছে।

তিনি বলেন, হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে দেওয়া বার্তার প্রকৃতি দেখে এটা বোঝা কঠিন, কোন কনটেন্ট আইটি সেল থেকে এসেছে এবং কোনটি দলের সমর্থকদের। তার মতে, এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়, বার্তাগুলোয় একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলেও দ্রুত অন্যান্য প্ল্যাটফর্মেও যদি দেখা যেতে থাকে, তখন মানুষ ভাবতে বাধ্য হন তারা যা দেখছেন সেটাই সত্যি!

এবারের ভোটে বিজেপির প্রচারমূলক বিজ্ঞাপনে দেখা গেছে, ইউক্রেনে আটকে পড়া পড়–য়াদের সরিয়ে ফেলতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ‘থামিয়ে দিয়েছিলেন’ প্রধানমন্ত্রী মোদি। এই দাবিটি প্রথম ২০২২ সালের মার্চ মাসে করা হয়েছিল যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক পরপরই। এক্স হ্যান্ডেলে (সাবেক টুইটার) বেশ কয়েকজন ব্যক্তি একই জিনিস শেয়ার করেন। বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমও অতিরঞ্জিত করে বিষয়টি পেশ করে। সে সময় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই দাবি নাকচ করে দেয়। তাদের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘কেউ বোমা হামলা রুখে দিয়েছে বা আমরা এটি সমন্বয় করছি, এসব বলাটা সম্পূর্ণ ভুল। কিন্তু দুই বছর পর বিজেপির শীর্ষ নেতারা নির্বাচনী প্রচারের সময় এ বিষয়টি আবার উল্লেখ করছেন। এই বিজ্ঞাপনটি সামাজিক মাধ্যমেও ব্যাপকভাবে দেখা যায়। কেন এই দাবির পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নের কোনো জবাব অবশ্য দেয়নি বিজেপি।’

তবে মিরাট বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী কিন্তু সেটি সত্য মনে করেন। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ওই ভিডিওটি দেখেছেন। তাদের মধ্যে বিশাল ভার্মা ও তার বন্ধুরা সবাই সায় দিয়ে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা অবশ্যই বিশ্বাস করি ভারতের অনুরোধে যুদ্ধে বিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল।’

অবশ্য মাত্র কয়েকজন শিক্ষার্থী দ্বিমত পোষণ করেন। তাদেরই একজন কবির। তিনি বলেন, ‘এটি সত্যি নয়। আমি ছাত্রদের তৈরি ভিডিও দেখেছি, তারা বলেছে সরকার তাদের সাহায্য করেনি।’

আশপাশের গ্রামবাসীরও আমরা একই কথা জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তারা জানিয়েছিলেন, টেলিভিশনে সম্প্রচারিত সংবাদে তারা এই দাবির কথা শুনেছেন। ৪১ বছরের সঞ্জীব কাশ্যপ বলেন, ‘হ্যাঁ, যুদ্ধবিরতি হয়েছিল বিশ্ব মোদিকে সম্মান করে তাই!’

৭৫ বছরের জগদীশ চৌধুরী বলেন, ‘দেখুন, আমরা শুনেছি যে যুদ্ধ থেমে গেছে, আমরা নিজে সেখানে গিয়ে দেখিনি। তবে আমি মনে করি এর মধ্যে অবশ্যই কিছু সত্যতা রয়েছে।’ আরও চারজন গ্রামবাসীর সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে এই কথাগুলো বলেছিলেন তিনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘আসলে মানুষের বিশ্বাসকে প্রভাবিত করতে পারা একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। বিজেপি দীর্ঘ সময় ধরে এক নাগাড়ে ক্ষমতায়। রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রেও তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। ইতিমধ্যে তারা বিরোধী দলগুলোকে ছত্রখান করে দিতে পেরেছে। দেশটিতে জাতীয় বিরোধী দল বলতে সামান্যই অবশিষ্ট আছে। বিজেপির প্রধান সফলতা হলো, তারা ভারতের জীবনধারা, সমাজকে ভেতর থেকে বদলে দিতে পারছে। কিন্তু নির্বাচনের জন্য তাদের হাতে আপাতত বাবরি মসজিদের মতো বড় ইস্যু নেই। তাই তারা সরাসরি এমন কোনো ইস্যু নিয়ে কথা না বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বেছে নিয়েছে। আগামীকাল লোকসভার শেষ দফার ভোট। ৪ জুন ভোটের ফল। সেদিনই জানা যাবে বিজেপি হিংসা আর মিথ্যা বার্তা ছড়িয়ে জনগণকে কতটুকু প্রভাবিত করতে পেরেছে। নাকি হিংসার ও ভুয়া বার্তায় তাদের জন্য কাল হয়ে এসেছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত