সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

তামাক সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

আপডেট : ৩১ মে ২০২৪, ০৪:১৭ এএম

তামাক ও তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার দিন দিন জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। তামাকের কারণে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুস ক্যানসার, মুখ গহ্বরের ক্যানসার, ডায়াবেটিকস, অ্যাজমাসহ নানা ধরনের রোগ বাড়ছে। এসব রোগ প্রাণঘাতী এবং এসবের চিকিৎসা ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি। এরপরও দেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করে। যার মধ্যে কিছু মানুষ ধূমপানের মাধ্যমে তামাক ব্যবহার করে এবং কিছু মানুষ ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করে।

সমীক্ষায় দেখা গেছে ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারের হার পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে বেশি। ধোঁয়াবিহীন তামাক পণ্য, যেমন : জর্দ্দা, গুল, সাদাপাতা ইত্যাদিও ফুসফুসের অপূরণীয় ক্ষতি করে। এর মধ্যে ৩০ ধরনের ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক রয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ ধরনের নাইট্রোস্যামিন পাওয়া যায়, যা ফুসফুস ক্যানসারের জন্য দায়ী বলে প্রমাণিত হয়েছে। ফুসফুস ছাড়াও মুখগহ্বর, গলনালি এবং পাকস্থলী ক্যানসারের জন্যও দায়ী এই ধোঁয়াবিহীন তামাক।

বাংলাদেশে সবচেয়ে কম মূল্যে তামাকজাত দ্রব্য কিনতে পাওয়া যায়। ফলে দরিদ্রদের মধ্যেও তামাকের ব্যবহার অনেক। এজন্য বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তামাকের প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। সবরকম তামাকজাত পণ্য থেকে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব আয় করে তার দ্বিগুণের বেশি অর্থ তামাকজনিত রোগের চিকিৎসায় স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করতে হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে হৃদরোগজনিত মৃত্যুর প্রায় ১২ শতাংশের জন্য দায়ী তামাক ব্যবহার এবং পরোক্ষ ধূমপান। হ্রদরোগের কারণ হিসাবে উচ্চ রক্ত চাপের পরেই তামাক ব্যবহারের অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক দ্য ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভাল্যুয়েশন (আইএইচএমই)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২০০৫ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে অকাল মৃত্যুর তালিকায় হৃদরোগ সপ্তম স্থান থেকে প্রথম স্থানে ওঠে এসেছে এবং এই পরিবর্তনের হার প্রায় ৫৩ শতাংশ। আর এই মৃত্যুর জন্য দায়ী হিসেবে তামাকের অবস্থান চতুর্থ। তামাক শুধু ব্যবহারকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং যারা তাদের আশপাশে থাকে তারাও এর ক্ষতির প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। তারা না চাইলেও পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে, স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে। পরোক্ষ ধূমপান সংক্রামক এবং অসংক্রামক উভয় রোগ সৃষ্টি করে। বিশেষভাবে শিশু, নারী ও নারীর গর্ভের সন্তান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমানে দেশে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের ফলে যে ভয়াবহ স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে তার কারণে প্রধানমন্ত্রী ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশীয় স্পিকারদের সম্মেলনে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা দেন। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে তামাক সেবন ও ধূমপানের প্রচলন ছিল না। প্রায় হাজার বছর পরে তা বিভিন্ন দেশে প্রসিদ্ধ লাভ করেছে। পানাহারের বিষয়ে একটি মূলনীতি হলো, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে বিদ্যমান না থাকার কারণে যেসব খাদ্য ও পানীয় সম্পর্কে তার কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই, সেসব বিষয়ে তার অন্যান্য নির্দেশনার আলোকে ইজতিহাদ (গবেষণা) করে নতুন বিষয়ে হুকুম আরোপ করতে হবে।

তামাক ও ধূমপান প্রচলিত হওয়ার পরে কোনো কোনো ইসলামি স্কলার মতপ্রকাশ করেন যে, তা মুবাহ বা বৈধ। কারণ তা অবৈধ হওয়ার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায় না। তবে বেশিরভাগ ইসলামি স্কলার মতপ্রকাশ করেন যে, ধূমপান মাকরুহ তথা শরিয়তের দৃষ্টিতে অন্যায় ও অপছন্দনীয় কর্ম। এর কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন, দেহে বা মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করতে পারে এমন খাদ্য ভক্ষণ করতে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিষেধ করেছেন। বিশেষ করে এরূপ খাদ্য গ্রহণ করে মসজিদে গমন করতে নিষেধ করে তিনি বলেন, ‘যদি কেউ রসুন খায় তবে সে যেন তার দুর্গন্ধ দূর হওয়া পর্যন্ত মসজিদে না আসে বা আমাদের সঙ্গে নামাজ আদায় না করে এবং রসুনের দুর্গন্ধ দিয়ে আমাদের যেন কষ্ট না দেয়। কারণ মানুষ যা থেকে কষ্ট পায়, ফেরেশতারাও তা থেকে কষ্ট পায়।’ (সহিহ বুখারি)

এ হাদিসের আলোকে ইসলামি স্কলাররা বলেছেন, পেঁয়াজ, রসুন বা কোনো দুর্গন্ধযুক্ত খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করে মুখে বা দেহে দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে গমন করা মাকরুহ। আর ধূমপানের মাধ্যমে মুখে যে দুর্গন্ধ হয় তা পেঁয়াজ বা রসুনের দুর্গন্ধের চেয়ে অনেক বেশি কষ্টদায়ক। আর পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি খেয়ে মুখের দুর্গন্ধ দূর করে মসজিদে যাওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু ধূমপানের দুর্গন্ধের ক্ষেত্রে তা মোটেও সম্ভব নয়। এজন্য বেশির ভাগ স্কলার একমত হন যে, ধূমপান সর্বাবস্থায় মাকরুহ।

বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও প্রমাণিত হয় ধূমপান মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক। এজন্য আধুনিক যুগের বেশিরভাগ ইসলামি স্কলার ধূমপান নাজায়েজ বলেছেন। কারণ তা সুনিশ্চিতরূপে ক্ষতিকারক। আর আল্লাহ স্বহস্তে নিজেকে ক্ষতির দিকে ঠেলে দিতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা নিজ হাতে নিজদের ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না।’ (সুরা বাকারাহ ১৯৫)

ইসলামি স্কলাররা এই বিষয়ে একমত যে, যা দ্বারা ক্ষতি হয় এবং ধ্বংস টেনে আনে তা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব। আর ওয়াজিব না মানা সম্পূর্ণ হারাম।

তামাক সেবনের আরেকটি ক্ষতি হলো, এতে মুখে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ হয়। আর মুখে দুর্গন্ধ নিয়ে নামাজ পড়লে, দোয়া করলে তা কবুল না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এতে রহমতের ফেরেশতারাও কাছে থাকবে না। ফলে আল্লাহর দয়া থেকে বঞ্চিত হতে হবে। তাই ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হতে না চাইলে আজই তামাকজাত দ্রব্য পরিহার করুন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত