মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সংকটের চক্রে ঘূর্ণায়মান বাজেট

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৪, ১১:৩০ এএম

অর্থনৈতিক নানা সংকটের মধ্য দিয়ে চলেছে গত অর্থবছর। সামনের বছরে সংকটগুলো থাকবে না কী কাটবে সেই বিতর্কের যেমন সমাধান দরকার, তেমনি একটা পথনির্দেশনাও দরকার। বাজেটকে সংবিধানে বলা হয়েছে, সরকারের আর্থিক বিবরণী। এই বিবরণী থেকে সংকটের কারণ ও উত্তরণের উপায় জানা যাবে বলে মনে করা হয়। কিন্তু এবারের অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট কি তেমন হলো নাকি সংকটের চক্রে ঘূর্ণায়মান বাজেট হিসেবেই প্রণীত হলো? বিগত বছরের অর্থনৈতিক সংকটের কারণ দূর না হলে তো অর্থনীতি সংকটের চক্রেই ঘুরপাক খেতে থাকবে। বাজেট প্রণয়ন করে সরকার, বাজেট থেকে সাফল্য না এলে তার দায় নিতে হয় সরকারকেই। কিন্তু বাস্তবে দায় বহন করে জনগণ। জনগণের ওপর চেপে বসে নতুন নতুন কর ও ভ্যাট বৃদ্ধির বোঝা, যা পরিণামে জনজীবনে দুর্ভোগ বাড়িয়ে তোলে। তাই বাজেটের আলোচনা হলেই মানুষ শুনতে চায় কোন কোন জিনিসের দাম বাড়ল, কমল কি কোনো কিছুর দাম? ক্ষমতাসীনরাও বাজেটের মূল বিষয়টি আলোচনায় না এনে সাধারণ মানুষকে আটকে রাখতে চায়, দাম বাড়া কমার আলোচনাতেই।

স্বাধীনতার পর ৫৩তম বাজেট ঘোষিত হয়েছে। প্রতিবার বাজেটের সময় বলা হয়, এবারের বাজেট স্বাধীনতার পর সর্ববৃহৎ বাজেট। এবারও তাই হয়েছে। তবে আইএমএফের পরামর্শ মেনে কিছুটা সংকোচন করে আগামী অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে, যা গত বাজেটের তুলনায় টাকার অঙ্কে ৩৫ হাজার ২১৫ কোটি টাকা বেশি। যা জিডিপির ১৪ দশমিক ২০ শতাংশ। গত কয়েক বছরে যেভাবে বাজেটের আকার বাড়ছিল এবার তেমন বাড়েনি এবং জিডিপির অনুপাতে এটি গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ছোট বাজেট। কিন্তু বাজেট ছোট হলেও সরকারি ব্যয় কমেনি বরং কর বাড়িয়ে আয় বাড়ানোর নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে জনজীবনে যে দুর্ভোগ নেমে এসেছিল তার কারণ ছিল দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি, টাকার মানের অবনমন, ডলার সংকট ও ডলার পাচার, বিদেশি ও দেশি ঋণ এবং তাদের সুদাসল পরিশোধ খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, রিজার্ভ সংকট ও ব্যাংক খাতে লুটপাট। সারা বছর এসব নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, কিন্তু এই সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় সংকট ক্রমাগত ঘনীভূত হচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণের কোনো পথ রেখা দেখা যাচ্ছে না বাজেটে।

বাজেটের আয়তনের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সংশোধিত বাজেটকে ভিত্তি ধরা হলে আগামী বাজেটের আকার বাড়ছে ৮২ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাড়ানো হয়েছিল ১ লাখ ১ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা। সেই বিবেচনায় বাজেটের আকার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কিছুটা লাগাম টেনে ধরা হয়েছে।

এই বাজেটে ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা হচ্ছে কর। করের মধ্যে এনবিআর নিয়ন্ত্রিত অংশ ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা এবং এনবিআরবহির্ভূত অংশ ১৫ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া করবহির্ভূত প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা ৪৬ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। আর অনুদান পাওয়া যাবে বলে ধরে নেওয়া হয়েছে ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ফলে বাজেটে ঘাটতি থাকছে। অনুদান ছাড়া বাজেট ঘাটতি ধরা হচ্ছে ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। তবে অনুদানসহ সামগ্রিক ঘাটতি দাঁড়াবে ২ লাখ ৫১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ঘাটতি মেটানোর দুটি খাত আছে। প্রথমত বৈদেশিক ঋণ, দ্বিতীয়ত দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়া। বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ১ লাখ ২৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এই ঋণ থেকেই বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হবে ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ফলে নিট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়াবে ৯০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

বাকি ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ৬০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের মূল অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৪ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা বেশি। অভ্যন্তরীণ ঋণের মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, আর সঞ্চয়পত্র বিক্রিসহ ব্যাংকবহির্ভূত ঋণ নেওয়া হবে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যয়ের মধ্যে পরিচালন অংশ বা রাজস্ব বাজেট ৫ লাখ ৬ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। আর উন্নয়ন অংশ বা উন্নয়ন বাজেট ২ লাখ ৮১ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। উন্নয়ন অংশের মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেট বাস্তবায়নে সরকারকে শেষ পর্যন্ত ঋণের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। এই ঋণের বড় অংশই এসেছে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে। বিদেশি ঋণও নিতে হয়েছে বড় পরিমাণে। ফলে গত অর্থবছরে যেমন সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয়েছে ঋণ ও সুদ পরিশোধে, সেই ধারা চলবে আগামী অর্থবছরেও। ইতিমধ্যেই সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান সুদ পরিশোধ একটা বড় মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মাথাব্যথা কমবে না বরং বাড়বে। এর ফলে অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্রেই সরকারকে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। অর্থনীতির সংকট দীর্ঘমেয়াদি হবে। অর্থনীতির যে সূচকগুলো নেতিবাচক সেগুলো ইতিবাচক করার তেমন কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি এবারের বাজেটে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তিন মাসেই ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। গত মার্চের শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ১১ দশমিক ১১ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৯ শতাংশ। দেশে এর আগে খেলাপি ঋণ বেড়ে কখনো এতটা হয়নি। একদিকে ঋণ খেলাপি বাড়ছে, অন্যদিকে সরকার বাজেটে দেশের ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে।

শিক্ষা খাতে যে বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা গতানুগতিক। একই বৃত্তে ঘুরছে শিক্ষার বাজেট। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা-৪ পূরণ অর্থাৎ গুণগত শিক্ষার, দক্ষতা উন্নয়নের জন্য এই বাজেট যথেষ্ট নয়। টাকার অঙ্কে বরাদ্দ কিছুটা বাড়লেও বাজেটে তা দাঁড়াচ্ছে ১১.৯ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের দাবি থাকলেও সেটি পূরণ হয়নি। আবার শিক্ষার যে বরাদ্দ তার মধ্যে উন্নয়ন ব্যয়ের বেশির ভাগই ব্যয় হয় অবকাঠামোতে। আর পরিচালন ব্যয়ের বেশির ভাগ খরচ হয় বেতন-ভাতা বাবদ। ফলে মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের জন্য এবারের শিক্ষা খাতের বাজেট প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটায়নি। বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। এটি প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুরবস্থা নিরসনে এই বরাদ্দ যথেষ্ট নয়। আবার বাজেট যখন সংশোধিত হয়, তখন দেখা যায় স্বাস্থ্যের বরাদ্দের এই হার আরও কমে যায়। গত অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল জাতীয় বাজেটের ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ। সংশোধিত বাজেটে তা কমে হয় ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে ধারণা করলে তা ভুল হবে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানিয়েছে, দেশে শিশুমৃত্যু বাড়ছে। অনেক বছর ধরে মোট প্রজনন হার এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে। পাশাপাশি চিকিৎসা করাতে গিয়ে ব্যক্তিপর্যায়ে ব্যয় অনেক বেশি প্রায় ৭০ শতাংশ। এই হার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেশি। ফলে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যে কম বরাদ্দ পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলবে।

কৃষি খাতে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ১১.৫ শতাংশ বরাদ্দের সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাজেটে এ খাতে উন্নয়নে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ৪.৯৯ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের কৃষি মন্ত্রণালয়ে মোট ২৭ হাজার ২১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ছিল ৩৩ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। সে হিসেবে আগামী বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমানো হয়েছে। কৃষিতে একটা নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য কারা যাচ্ছে, যা বিপজ্জনক। বিবিএসের হিসাবে বছরের ব্যবধানে ২০২৩ সালে কৃষকের সংখ্যা কমেছে প্রায় ১৫ লাখ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রান্তিক চাষি যারা লাভবান হচ্ছেন না বা পণ্যের মূল্য পাচ্ছেন না তারা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। কৃষি উৎপাদন করতে গিয়ে কৃষকদের সব দিক দিয়েই খরচ বাড়ছে। বিশেষ করে শ্রমিকের খরচ বাড়ছে। কিন্তু এই চিত্র প্রতিবছরই দেখা যাচ্ছে যে, কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। যে দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন তাতে উৎপাদন খরচ উঠছে না। বেকারদের কর্মসংস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কিন্তু বাজেটে তার কোনো নির্দেশনা নেই। জনমিতির সুবিধা তাই কথার কথা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বরং সস্তা শ্রমের দেশে পরিণত করেছে বাংলাদেশকে। একদিকে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্লোগান, অন্যদিকে ক্রমাগত মুঠোফোনে কথা বলা ও ইন্টারনেট সেবার ওপর ক্রমবর্ধমান ভ্যাট আরোপের ফলে, ১০০ টাকার টক টাইম পেতে এখন গ্রাহককে দিতে হবে ১৩৯ টাকা। মেট্রোরেলের সাফল্য নিয়ে বিপুল প্রচারের পর এখন এর ভাড়ার ওপরও ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে, যা জনজীবনে ভোগান্তি বাড়াবে।

দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, টাকা পাচার, ব্যাংক লুটের যে মিলিত চক্র দেশের মানুষের দুর্দশা বাড়িয়েছে তা নিরসনে কোনো উদ্যোগ না নিয়ে জনগণের ওপর করের বোঝা বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। বাজেট নিয়ে সরকারি মহলের বাগাড়ম্বর দিয়ে অর্থনীতির সংকট দূর হয় না। প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ, সে ধরনের পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি এবারের বাজেটে। বাজেটের নীতি কৌশল একই থাকায় এবারের বাজেট অতীতের বাজেটের মতোই ফল নিয়ে আসবে।

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

[email protected]

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত