বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

উপদূতাবাস এবং বাংলাদেশি কমিউনিটি

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৪, ১২:১৭ এএম

জনসংখ্যার বিচারে কানাডার তৃতীয় বৃহত্তম শহর ‘কেলগেরি’। বাসস্থান, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সুবিধা আর ট্যাক্সেশনের বিশেষ ছাড়ের কারণে শহরটি অভিবাসীর পছন্দের শীর্ষে। বাংলাদেশিদের পদচারণায় শহরটি এখন মুখরিত। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশি কমিউনিটির আয়োজন ও সরব উপস্থিতি দেখে মূলধারার রাজনীতিও আজ প্রভাবিত। যেখানেই বাংলাদেশিদের আয়োজন, সেখানেই ফেডারেল আর প্রভিন্সিয়াল সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এমপি, মন্ত্রীদের সরব উপস্থিতি। জনসংখ্যা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতায় এখানকার বাংলাদেশি কমিউনিটি যথেষ্ট সমৃদ্ধ। একটি শহরে প্রায় বিশ হাজারের বেশি বাংলাদেশির বসবাস! সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও কেলগেরি, এডমন্টন আর আশপাশের ছোট ছোট শহরে বসবাসকারী বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীকে হিসাব করলে সংখ্যাটি যে ৩০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে, এতে সন্দেহ নেই। পার্শ্ববর্তী ব্রিটিশ কলাম্বিয়া এবং সাসকাচুয়ান প্রদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের যোগ করলে, কানাডায় অভিবাসী বাংলাদেশিদের অর্ধেক বা তার কাছাকাছি জনগোষ্ঠী এই তিনটি প্রদেশে বসবাস করে। আর ভৌগোলিক অবস্থানের দিক দিয়ে আলবার্টা তিনটি প্রদেশের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। পেট্রোনগরী কেলগেরি এই প্রদেশটির বৃহত্তম শহর। কানাডার অর্থনীতিতে আলবার্টা প্রভিন্স জাতীয় রাজস্বের অন্যতম বৃহত্তম জোগানদাতা। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ এ প্রদেশটির বৃহত্তম শহর কেলগেরিতে উত্তর আমেরিকার সব কয়টি বড় অয়েল কোম্পানির সদর দপ্তর। কানাডায় অভিবাসী বাংলাদেশি পেশাজীবীদের বৃহত্তম অংশ এই শহরে বসবাস করে। ভূতাত্ত্বিক ও প্রকৌশলীদের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ সরকারি বিভিন্ন সেক্টরে বাংলাদেশিদের অবদান চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দক্ষ পেশাজীবীদের অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানের কারণে কেলগেরি শহরকে কেন্দ্র করে বাঙালি কমিউনিটির একটি শক্তিশালী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বলয় তৈরি হয়েছে। স্থানীয়, প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সেতুবন্ধন।

অটোয়া বাংলাদেশ মিশন এবং টরন্টো কনস্যুলেট জেনারেলের কার্যালয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেখভাল আর দ্বীপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অফিস। দুটি কার্যালয়ের অবস্থানই অন্টারিও প্রদেশে। ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, আলবার্টা এবং সাচকাচুয়ান প্রদেশ থেকে যার দূরত্ব যথাক্রমে ২৬৬৪, ১৯৯১, ১৪৬৮ কিলোমিটার। বিমান পথে সাড়ে ৩ ঘণ্টা থেকে সাড়ে ৪ ঘণ্টার পথ। কোনো সেবা গ্রহীতাকে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে এসব ওয়েস্টার্ন প্রভিন্স থেকে অটোয়া বা টরন্টো গিয়ে সেবা গ্রহণ করতে হলে, ব্যক্তিগত খরচের অঙ্কটি দেড় থেকে দু’হাজার ডলারে দাঁড়ায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জরুরি প্রয়োজন ব্যতিরেকে কেউ সেবা গ্রহণের জন্য অটোয়া বা টরন্টোমুখী হতে চান না। ফলে ওয়েস্টার্ন প্রভিন্সগুলোতে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের একটা বড় অংশ নতুন পাসপোর্ট অথবা পুরনো পাসপোর্ট নবায়ন না করে বছরের পর বছর কাটিয়ে দেয়। অর্থ ও সময়ের ব্যালেন্স না করতে পেরে কানাডিয়ান ট্রাভেল ডকুমেন্ট দিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নেয়। যদিও বছরে বা ২ বছরে ১ বার ২-৩ দিনের জন্য হাইকমিশনের কনস্যুলার সার্ভিস টিম বিশেষ ব্যবস্থাপনায় সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে, তবুও চাহিদা ও সময়ের বিবেচনায় সেবা গ্রহণে আগ্রহী একটি বড় অংশ সেবা বঞ্চিত থেকে যায়। এসব বিশেষ ক্যাম্পিংয়ে দূতাবাসের কর্মকর্তারা নিরলসভাবে রাত-দিন সেবা দিয়ে থাকেন, তবুও প্রত্যাশীদের একটি বড় অংশকে সেবা দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। গত ১ বছরে দুই পর্যায়ে মাত্র ৬ দিনে, বাংলাদেশ হাইকমিশন কেলগেরি শহরে প্রায় দেড় হাজার আবেদনকারীকে সেবা দিয়েছেন। অনেক আবেদনকারী একাধিক সার্ভিস গ্রহণ করেছেন। মাথাপিছু গড়পড়তা ১২০ ডলার হিসাব করলেও, ৬ দিনে রাজস্ব আহরণের মাত্রাটি দাঁড়ায় ১ লাখ ৮০ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় দেড় কোটি টাকারও বেশি। এই চিত্রটি শুধু কেলগেরি শহরের হলেও সব কয়টি ওয়েস্টার্ন প্রদেশের অবস্থা একই রকম। ২-৩ দিনের কনস্যুলার সার্ভিস ক্যাম্পিংয়ে দেখা দেয় উপচে পড়া ভিড়। সেবা গ্রহীতাদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে হাইকমিশন কর্মকর্তাদের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও গলদঘর্ম হতে হয়। তবুও নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে অভিবাসী বাংলাদেশিদের একটি বৃহত্তম অংশকে সেবা গ্রহণ থেকে দূরেই থাকতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে ৩টি ওয়েস্টার্ন প্রভিন্স ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, আলবার্টা ও সাসকাচুয়ানের মধ্যবর্তী স্থান কেলগেরি শহরে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একটি উপ-দূতাবাস স্থাপন জরুরি।

প্রশ্ন থেকে যায়, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় একটি উপদূতাবাস স্থাপন কতটা যুক্তিপূর্ণ হবে : প্রথমত, অভিবাসী বাংলাদেশিদের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী এই তিনটি প্রদেশে বসবাস করায় ড্রাইভিং দূরত্বে সেবাকেন্দ্র থাকলে অধিক সংখ্যক বাংলাদেশি সার্ভিস গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হবে, বৃদ্ধি পাবে রাজস্বের পরিমাণ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশি কমিউনিটি সংগঠনগুলো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে বাংলাদেশ দূতাবাসকে একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র স্থাপনের জন্য বিনা ভাড়ায় প্রয়োজনীয় অফিস স্পেস দিতে আগ্রহী বিদায়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে অন্তত কয়েক বছরের জন্য ভাড়া বাবদ বাড়তি অর্থের জোগান দিতে হবে না। তৃতীয়ত, একদিকে প্রবাসীদের কল্যাণে সরকারের আন্তরিকতার বিষয়টি যেমন পরিস্ফুটিত হবে, অন্যদিকে এই ৩টি প্রদেশে বসবাসকারী একটি বৃহত্তম বাংলাদেশি পেশাজীবী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে দুটো দেশের দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আরও সহজতর হয়ে উঠবে। চতুর্থত, প্রবাসে বাংলাদেশের মিশনগুলো শিক্ষা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য সম্প্রসারণসহ নানা কূটনৈতিক স্বার্থ নিয়ে কাজ করে। প্রবাসে বাংলাদেশিদের একটি দক্ষ ও সংঘটিত কমিউনিটি এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে। এসব বিবেচনায় নিঃসন্দেহে বলা যায়, কেলগেরির পেশাজীবী বাংলাদেশি কমিউনিটিকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি বিশেষ করে পেট্রোলিয়াম সেক্টরে দেশের জন্য নানা রকম সুবিধা সৃষ্টি সহজতর হয়ে উঠবে। সেই সঙ্গে সম্প্রসারিত হবে বাণিজ্য বৃদ্ধির সুযোগ। কানাডার মূলধারার রাজনীতিবিদদের সঙ্গে কেলগেরির বাংলাদেশি কমিউনিটির ঘনিষ্ঠ সংযোগ, সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপায়ণ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বৈরিতা নয়, বন্ধুত্বের মাধ্যমেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আর এই পথে কেলগেরি শহরে একটি উপ-দূতাবাস হতে পারে সরকারের উন্নয়ন ইতিহাসের আরেকটি মাইলফলক।

লেখক : কলামিস্ট ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক কেলগেরি, কানাডা

[email protected] 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত