মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মানবকোষে পচন

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৪, ১২:২১ এএম

সুস্থ, সৎ এবং কল্যাণ চিন্তা করতে হলে প্রকৃত শিক্ষা এবং সুস্বাস্থ্য থাকতে হয়। এর জন্য দরকার আর্থিক নিরাপত্তা। সব চাইলে প্রয়োজন, সেই প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করা সমাজে আমাকে আসলে কে পরিচালিত করছে? একটি দেশের অধিকাংশ মানুষ কখন একই কল্যাণ সিদ্ধান্তে আসতে পারে না? যখন সেই সমাজের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরের ১০ লাখ কোটি কোষের সব শক্তির উৎস মাইটোকন্ড্রিয়া (Powerhouse of Cel) বা ‘কোষের শক্তিঘর’ দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে। ফলে সে বোধসম্পন্ন মানুষ থাকে না। আত্মচিন্তায় নিমগ্ন মানুষ কেবলই অন্যের ক্ষতি চিন্তা এবং নিজের স্বার্থ দেখে। যেমনটি আমরা দেখছি। আমাদের মাইটোকন্ড্রিয়াকে সুচিন্তিতভাবে দূষিত করা হয়েছে বিভিন্ন উপায়ে। যে কারণে মানবকোষে পচন ধরেছে। এর ফলে শিক্ষায় ধস, খাদ্যে বিষ, স্বাস্থ্যে হযবরল। এসবের চূড়ান্ত রূপ দেখছে দেশবাসী। অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না।

দেশের মোট জনসংখ্যার কত শতাংশ মানুষ, নিজেকে প্রকৃতভাবে মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ-শিক্ষিত-সচ্ছল এবং সৎ ভাবেন? যারা মনে করেন, আমি সবগুলোই তাদের সংখ্যা কত? আমাদের দেশে দুর্নীতির মহাকাশ বিস্তৃত। অনেকটা গ্যালাক্সির চেয়েও জটিল। সেখানে আবার কোটি কোটি জানা-অজানা নক্ষত্র, গ্রহ-উপগ্রহ। কোটির পর রয়েছে অর্বুদ। এরপর মহার্বুদ, বৃন্দ, খর্ব, নিখর্ব, শঙ্খ, মহাশঙ্খ, পদ্ম, মহাপদ্ম। এই মহাপদ্মে অবস্থান করছে দুর্নীতি! রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ১৮ হাজারের বেশি। এর মধ্যে মাত্র ৫ হাজারের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে। বাকি সব অবৈধ লাইসেন্সে চিকিৎসা কার্যক্রম চালাচ্ছে। সারা দেশে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে চলছে অসংখ্য অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংক। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান বিভাগীয় শহরের বাইরে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বেশি। কিন্তু অবৈধভাবে কত প্রতিষ্ঠান চলছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এসব বিষয়ে তেমন কিছুই জানে না। সরকারের দপ্তরটির কাছে এ সংক্রান্ত সঠিক তথ্যও নেই। আর সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতাল! দেশে প্রায় ৫০০ উপজেলায় কতগুলো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আছে? জেলায় আছে কতগুলো হাসপাতাল?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী মানসম্পন্ন সেবা পায় না। ২০১৯ সালে স্বাস্থ্য খাতের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অন্তত ১১টি উৎস চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে ২৫ দফা সুপারিশ করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তারও ২ বছর আগে গঠিত দুদকে ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিম’ অনুসন্ধান শেষে কমিশনের কাছে এসব সুপারিশ দাখিল করেছিল। বলা হয়েছিল স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি বন্ধে দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে জনসাধারণের দৃষ্টিগোচর হয় এমন উন্মুক্ত স্থানে সিটিজেন চার্টার প্রদর্শনের বিধান চালু করতে হবে। প্রতিদিন কী কী ওষুধ স্টকে আছে তাও প্রদর্শন করতে হবে। ওষুধ ও মেডিকেল যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে ক্রয় কমিটিতে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই সুপারিশের কোনো খবর নেই। তাই বলাই যায়, স্বাস্থ্যখাতের সমস্যা কমবে দূরের কথা, আরও বাড়বে। শুক্রবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে বৃহস্পতিবার সকালে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবার মান পরিদর্শনে এসে মতবিনিময় সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী রূপগঞ্জে উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবায় গাফিলতি পেলেই ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। তিনি বলেছেন কোনো রোগী সরকারি সেবাবঞ্চিত হলে এর দায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নিতে হবে। কোনো গাফিলতি থাকলে কঠোর শাস্তি পেতে হবে। লাইসেন্সবিহীন বেসরকারি হাসপাতাল বন্ধের অভিযান আগের মতো চলবে। অনিয়ম পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রোগীরা যাতে সেবাবঞ্চিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখার নির্দেশ দেন তিনি। এরপর কী হবে? সব ঠিক হয়ে যাবে! এসব এখন মন্ত্রীদের কথার কথা।

আসলে সঠিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ইচ্ছা থাকলে স্বাস্থ্য খাতকে নিতে হবে পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় খাতে। এই খাতে আর্থিক বরাদ্দ বাড়াতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত রেখে বর্ধিত বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলো দূর করে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন দরকার। প্রায়ই দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বলেন স্বাস্থ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। এখন নতুন বাক্য গঠন-পঠন-শ্রবণ দরকার। আর কত?

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত