শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মাহিনের বই পড়া

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৪, ১২:২৪ এএম

ছোট্ট মাহিন প্রতিদিন বকা খায় মায়ের কাছে। কোনো গর্হিত কাজ বা কোনো খুব খারাপ কাজের জন্য নয়। বকা খেতে হয় তার বই পড়া নিয়ে। সময়-সুযোগ পেলেই বই নিয়ে বসে পড়ে মাহিন। ক্লাসের বই না, আউট বই। গল্পের বই। শিশু-কিশোর উপযোগী গল্পের বই। হাতের কাছে তার পছন্দের বই পেলেই ব্যস, খাওয়া-দাওয়া সব উবে যাবে। তার ধ্যান-জ্ঞান; সব ওই বইয়ের ওপর। এটাই মাহিনের অপরাধ। কঠিন অপরাধ। আর এ জন্যই মা বকাবকি করেন। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে শুধু বই আর বই। কী আছে এই বইতে!

মাহিনের বই পড়ার প্রতি ঝোঁক শুরু হয় মূলত ক্লাস থ্রি থেকে। ক্লাস থ্রিতেই বাংলা রিডিং পড়া আয়ত্ত করে ফেলেছিল মাহিন। ক্লাস থ্রিতে পড়ে ক্লাসের অন্যদের চেয়ে দ্রুত ও স্পষ্ট করে বাংলা রিডিং অনবরত পড়তে পারে সে। তাই বাংলা ক্লাসের স্যার খুশি হয়ে মাহিনকে একটা উপহার দিয়েছিলেন। উপহারটা ছিল শিশু-কিশোর উপযোগী গল্পের বই। ওই বই-ই মাহিনের ওপর চেপে বসে। বইপোকা হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ ছিল বাংলা স্যারের উপহার দেওয়া গল্পের ওই বইটি।

মাহিনের বই পড়ার ধরনটা একটু অদ্ভুত। গল্প পড়তে পড়তে যদি হাসির কোনো অংশ পড়ে সে তাহলে বইটা উল্টিয়ে রেখে দুই হাতে পেট হালকা চেপে ধরে ঝুঁকে ঝুঁকে কিছুক্ষণ হেসে নেবে। হা হা হা। অদ্ভুত তার হাসির ধরন। এরপর আবার পড়া শুরু করবে।

এবার মাহিন ক্লাস ফোরে। প্রতিদিন সে স্কুল থেকে এসেই গল্পের বই নিয়ে তার রুমের এক কোণে বসে পড়ে। এক ধ্যানে বই পড়ে। মাহিন আজও স্কুল থেকে এসে তাই করছে। সহপাঠী ইয়ামিনের কাছ থেকে একটা গল্পের বই নিয়ে এসেছে মাহিন। আগামীকালই ফেরত দিতে হবে। তাই মাহিন স্কুল থেকে এসেই সেই যে বসেছে বই নিয়ে, দুপুরে খাওয়ার সময় হয়ে গেল তবু তার খবর নেই। তাই মা আজও শুরু করলেন তার রুটিন মাফিক চিল্লা-চিল্লি। ‘মাহিন, এই মাহিন খেতে আসো বলছি। কী হলো! আসছো না কেনো?’

এমন সময় মাহিনের বড়ো মামা মাহিনদের বাসায় আসেন।

মাহিনের মায়ের এমন চিল্লা-চিল্লি দেখে মামা বললেন, হয়েছে কী, এভাবে চেঁচাচ্ছো কেন?

মা বললেন, আর বলো না, মাহিনটা যা করছে! ওকে নিয়ে আমি আর পারছি না। সারাদিন বই আর বই! দেখো না খেতে ডাকছি কিন্তু ও আছে ওর বই নিয়ে। আমার ডাক সে কানেই নিচ্ছে না! 

মামা বললেন, বই পড়া তো ভালো। আর বই পড়ার অভ্যাস থাকা আরও বেশি ভালো। এখনকার ছেলেমেয়েরা তো বইয়ের আশপাশেই থাকে না। সারাক্ষণ মোবাইল, কম্পিউটার আর গেমস নিয়ে মজে থাকে। আর এতে যে কী পরিমাণ ক্ষতি তা চিন্তার বাইরে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে খুব ভয়ে আছেন গবেষকরা।

আর যারা বই পড়ে, বই নিয়ে পড়ে থাকে, তাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। কেননা, বই জ্ঞানের পরিধি বাড়ায়। এতে মন ও মস্তিষ্ক, দুটোই সতেজ থাকে। আর আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও শিক্ষিত হবে।

সে হিসাবে আমাদের মাহিন খুব ভালো আছে। ছোটবেলা থেকেই এই অভ্যাসটা গড়ে নিলে ভবিষ্যতে ভালো কিছু আশা করা যাবে তার থেকে। তাই বলছি, মাহিনকে বই পড়া থেকে নিরুৎসাহিত না করে ওকে বেশি বেশি বই কিনে দাও। শিশু-কিশোর উপযোগী ভালো ভালো বই।

মাহিনের মা বললেন, কিন্তু ভাইয়া, মাহিন যে সারাক্ষণ বই নিয়ে পড়ে থাকে। ও বই ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না।

মামা বললেন, আচ্ছা আমি দেখি ওর সঙ্গে কথা বলে।

মাহিনের মামা মাহিনের রুমে উঁকি দিয়ে দেখলেন, মাহিন খুব মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছে। আর একটু পরপর দুহাতে পেট চেপে ধরে হি হি করে হেসে উঠছে। মামাও হাসলেন মাহিনের এমন বই পড়া আর হাসির ধরন দেখে। মামা ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে মাহিনের পাশে বসলেন। মাহিনের তবু খবর নেই। এক মনে বই পড়ছে ও। এবার মামা মাহিনকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, কী পড়ছো তুমি মাহিন?

মাহিন হঠাৎ মামাকে দেখে অবাক হলো। মুখ দিয়ে যেন কথা সরছে না। মামা আবার বললেন, ও তো মনোযোগ দিয়ে কী পড়ছো?

মাহিন বলল, গল্পের বই পড়ছি মামা। এই বইটা-না খুব... মজার।

মামা বললেন, বই পড়া তো খুব ভালো। তুমি বেশি বেশি বই পড়বে।

ঘরের কেউ মাহিনের বই পড়ার পক্ষে না, না বাবা না মা। সবাই মাহিনের বই পড়া নিয়ে বিরক্ত। কিন্তু মামা তার বই পড়াকে উৎসাহ দিচ্ছেন দেখে এই উৎসাহের সুযোগে সে বলে বসলো, মামা, আমাকে বই কিনে দেবেন? এই বইটা আমার বন্ধু ইয়ামিনের। কালকেই দিতে হবে। তাই তাড়াতাড়ি শেষ করছি। হাতের বইটা দেখিয়ে বলল মাহিন।

মামা বললেন, হ্যাঁ, তোমাকে অনেক মজার মজার বই কিনে দেব আমি। কিন্তু তুমি নাকি শুধু বই নিয়ে পড়ে থাকো? সময়মতো খাও না, সময়মতো ঘুমাও না, খেলো না, তোমার মায়ের কথাও শুনো না, এটা তো ঠিক না। আগে বলো সময়মতো খাবে, ঘুমের সময় ঘুমাবে, খেলার সময় খেলবে, পড়ার সময় পড়বে, আর মা-বাবার কথা শুনবে তাহলে বই কিনে দেব।

মাহিন একবাক্যে সব মেনে নিল। তার তো খুশির অন্ত নেই, মামা বই কিনে দেবেন। মাহিন এবার মামার গলা ধরে বলল, পড়ার সময় পড়বো, খাওয়ার সময় খাবো, খেলার সময় খেলবো, ঘুমের সময় ঘুমাবো এবং মা-বাবার সব কথা শুনবো।

মামা মাহিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, লক্ষ্মী ছেলে!

তারপর বললেন, আজ বিকেলে তোমাকে একটা বইয়ের দোকানে নিয়ে যাবো। মজার মজার বই কিনব। এখন চলো খেতে যাই। তোমার মা খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছে।

মাহিন খুব আনন্দ নিয়ে মামার সঙ্গে খাবার টেবিলে গিয়ে বসল।

বিকেলে মাহিনের মামা মাহিনকে একটা বইয়ের দোকানে নিয়ে গেলেন। দোকানে অনেক বই। তা দেখে সে খুশিতে লাফাতে লাগল। এত বইয়ের আগে সে কোনো দিন একসঙ্গে দেখেনি। মাহিন ভাবতে লাগল, ইশ! এসব বই যদি আমার হতো!

মামা মাহিনকে বললেন, বলো মামা মাহিন, তোমার কী কী বই লাগবে?

মাহিন খুশিতে লাফাতে লাফাতে বলল, আমার মজার মজার গল্পের বই লাগবে।

বইয়ের দোকানটি বেশ বড়ো। নতুন পুরনো অনেক বই সেখানে রয়েছে। মাহিন প্রকাশনী ঘুরে-ঘুরে দেখল। কত্ত মজার-মজার, সুন্দর-সুন্দর বই। মাহিন কোনটা রেখে

কোনটা নেবে ভেবে পায় না। এটা দেন, না না ওইটা দেন, না না ওপরেরটা আরও বেশি সুন্দর ওপরেরটা নেবো। নাহ, এভাবে হচ্ছে না।

মাহিন এবার তার মামাকে বলেই বসল, আচ্ছা মামা, একটা কাজ করলে কেমন হয়?

মামা বললেন, কী কাজ?

মাহিন হাতের ইশারা দিয়ে বলল, ওই সব বই আমি নিয়ে নিলে কেমন হবে!

বইকে ঘিরে মাহিনের এমন আগ্রহ দেখে মামা হাসলেন। বললেন, এতগুলো বই তুমি একসঙ্গে পড়তে পারবে না। এখন অল্পকিছু নিয়ে পড়ো। শেষ হলে আমাকে বলবে। তোমাকে আবার এই দোকানে নিয়ে আসবো। তখন আরো মজার মজার বই তোমাকে কিনে দেব।

মাহিন বেশকিছু বই কিনে নিল। সে পাঁচটা বই নিয়েছে সুন্দর প্রচ্ছদ ও ছোট্ট বাচ্ছাদের ছবি আঁকা দেখে। আর মামা দিয়েছেন আরও পাঁচটা বই বাছাই করা ভালো ভালো বই। মাহিনের এই দশটা বইয়ের মধ্যে, সুকুমার রায়ের হ য ব র ল ও পাগলা দাশু, পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের বাঙ্গালীর হাসির গল্প প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড, হুমায়ূন আহমেদের বোকাভূ, বনের রাজা, পিপলী বেগমসহ আরো কিছু শিশুসাহিত্যিকদের বই। ‘এসব বই আমার’ ভেবে মাহিন বেজায় খুশি! সে আগামীকাল তার সহপাঠী ইয়ামিনকে তার এই এত্তোগুলো বই কেনার গল্পটা বলবে। ইয়ামিন নিশ্চয় মাহিনের বই কেনার গল্প শুনে আকাশ থেকে পড়বে!

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত