শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কৃষককন্যার চড়ে ভারত জুড়ে বিস্ফোরণ!

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৪, ০২:৫৫ এএম

বলিউড তারকা এবং লোকসভা নির্বাচনে সদ্য নির্বাচিত বিজেপির এমপি কঙ্গনা রানাওয়াতকে চড় মেরেছেন সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্সের (সিআইএসএফ) একজন নারী কনস্টেবল। গত বৃহস্পতিবার হিমাচল প্রদেশের মান্ডি থেকে চণ্ডিগড় বিমানবন্দর হয়ে দিল্লি ফেরার পথেই ঘটে এ ঘটনা। কঙ্গনা বিমানবন্দরে সিকিউরিটি চেকআপের সময় তাকে সপাটে চড় মারেন দায়িত্বে বিস্ফোরণ!থাকা সিআইএসএফ কনস্টেবল কুলবিন্দর কউর। কুলবিন্দরের ভাষ্য, কৃষকদের অসম্মান করার জন্য তিনি কঙ্গনাকে চড় মেরেছেন। পাঞ্জাবের সুলতানপুর লোধির বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী কুলবিন্দর কউরের ওই চড়ের পর ভারত জুড়েই সেটি নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। কেউ কুলবিন্দর কউরের পক্ষ নিয়ে সাফাই গেয়েছেন, কেউ আবার দাঁড়িয়েছেন কঙ্গনার পক্ষে। বিজেপি-কংগ্রেসের পাশাপাশি ওই আলোচনায় চর্চা হচ্ছে কৃষক আন্দোলন, খালিস্তানি আন্দোলন নিয়েও। অবশ্য ঘটনাটি নিয়ে বিজেপি বা কংগ্রেস এখনো কোনো বিবৃতি দেয়নি বা তাদের শীর্ষ কোনো নেতা কথা বলেননি। তবে দল দুটির অনেক নেতাকর্মী বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

এদিকে ঘটনার পরপরই কুলবিন্দরকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে এফআইআরও দায়ের হয় সেদিনই। আর গতকাল তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার ভাগ্যে কী ঘটবে বা কী সাজা হবে সে বিষয়টি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে মোদি সরকারের এমপিকে কষে চড় মারার প্রভাবও কুলবিন্দরের জন্য কড়া হতে পারে সেটা মনে করছেন অনেকে। অবশ্য সিআইএসএফ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কুলবিন্দরের বিরুদ্ধে এর আগে কখনো কোনো ধরনের অভিযোগ আসেনি, বাহিনী থেকে তিনি কখনো কোনো শাস্তিও পাননি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ওই ঘটনার সময়ই কুলবিন্দরকে বলতে শোনা যায়, তিনি (কঙ্গনা) বলেছিলেন, নারীরা ১০০ রুপির জন্য ওখানে বসে আছে। তিনি কি ওখানে গিয়ে বসে থাকতেন? উনি যখন এ কথা বলেন, তখন আমার মা ওখানে বসে আন্দোলন করছিলেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর, কুলবিন্দর কউর ২০০৯ সালে সিআইএসএফে যোগ দেন। ২০২১ সাল থেকে তিনি চণ্ডিগড় বিমানবন্দরে বিমান চলাচল নিরাপত্তা বাহিনীর দলে কাজ করছেন। তার স্বামীও সিআইএসএফের সদস্য। এই দম্পতি দুই সন্তানের বাবা-মা।

কুলবিন্দরের ভাই শের সিং কৃষক নেতা। তিনি কিষান মজদুর সংঘর্ষ কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি বলেন, বিমানবন্দরে আমার বোন ও কঙ্গনার মধ্যে প্রথমে কথাকাটাকাটি হয়েছে। একপর্যায়ে আমার বোন ভীষণ রেগে গিয়েছিল। যে কারণেই সে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের কৃষকও যেমন দরকার তেমনি জওয়ানও দরকার। তারা খুবই নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করছে। এ ঘটনা কিষান-মজদুর কমিটির পূর্ণ সমর্থন আছে তার প্রতি। আমরা তার পাশে আছি। 

এদিকে প্রখ্যাত গীতিকার ও সুরকার এবং শিল্পী বিশাল দাদলানিও দাঁড়িয়েছেন কুলবিন্দরের পাশে। এক ইনস্টাগ্রাম পোস্টে তিনি বলেন, আমি সহিংসতার পক্ষে নই। তবে আমি বুঝতে পারছি ওই জওয়ানের তীব্র রাগের কারণ কী? দাদলানি বলেন, সিআইএসএফ যদি তার চাকরি কেড়ে নেয় তবে আমি তাকে নিশ্চিত করতে চাই, তার জন্য এমন কাজ আছে যেটি তার পছন্দ করা উচিত। এরপরই বিশাল লিখেছেন জয় হিন্দ, জয় জওয়ান, জয় কিষান।

পশ্চিমবঙ্গের মনো-সমাজকর্মী পিয়া চক্রবর্তী অবশ্য মনে করেন, এ ঘটনার প্রসঙ্গটা ভালো করে বোঝা দরকার। তিনি আনন্দবাজারকে বলেন, শারীরিক বা মৌখিক হিংসা, কোনোটাই সমর্থন করা যায় না। সমর্থন বা অসমর্থনের ঊর্ধ্বে গিয়ে এ ঘটনার প্রেক্ষিতটা বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। ১০ বছর ধরে বেড়ে ওঠা একটা রাজনৈতিক দল বিজেপি যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এসেছে, সেটাই এ ঘটনার প্রেক্ষিত। কঙ্গনা এই রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র সেজে বছরের পর বছর অত্যন্ত টক্সিক কথা বলে গেছেন।

কুলবিন্দর কউর সম্পর্কে পিয়া বলেছেন, তিনি খেটে খাওয়া মানুষ। কৃষকদের সরাসরি অপমান করেছেন কঙ্গনা। তাদের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, আন্দোলনকে অপমান করেছেন। এতদিন এই অপমান, ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতিরোধ করতে সরকার বা আইন কী করেছে? এ প্রশ্নটা সবার আগে করা উচিত। কঙ্গনাকে কি শাস্তি দেওয়া হয়েছে?

অবশ্য কঙ্গনাকে চড় মারা ঘটনায় নিন্দা করলেন উদ্ধব ঠাকরে ঘনিষ্ঠ শিবসেনা নেতা সঞ্জয় রাউত। তিনি বলেছেন, কঙ্গনার প্রতি আমার সহানুভূতি আছে। তিনি এখন সাংসদ। একজন সাংসদকে আক্রমণ করা উচিত নয়, কৃষকদেরও সম্মান করা উচিত।

সঞ্জয় রাউত বলেছেন, কেউ ভোট দেয়, আবার কেউ চড় দেয়। আসলে কী হয়েছে আমি জানি না... কনস্টেবল যদি বলে থাকেন, তার মাও আন্দোলনে বসেছিলেন, তাহলে এটা সত্যি। প্রধানমন্ত্রী মোদি যদি বলেন আইনের শাসন থাকতে হবে, তাহলে তা হাতে নেওয়া উচিত নয়... কৃষক আন্দোলনের লোকজন ভারতের ছেলেমেয়ে। কেউ যদি ভারত মাতাকে অপমান করে এবং তাতে কেউ ক্ষুব্ধ হয়, তাহলে ভাবার বিষয়।

তবে বিজেপিপন্থিরা কুলবিন্দরকে খালিস্তানি সন্ত্রাসী বলে উল্লেখ করে তার কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন। তাদের কেউ কেউ পুরো পাঞ্জাবকেই সন্ত্রাসের আখড়া বলেছেন। খোদ কঙ্গনা বলেছেন, পাঞ্জাবের ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসবাদ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।

ওই ঘটনার পর দিল্লিতে পৌঁছে এক ভিডিও বার্তায় এ বলিউড তারকা বলেন, তিনি নিরাপদ আছে, তবে পাঞ্জাবের ক্রমবর্ধমান ‘সন্ত্রাসবাদ’ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, ‘আমি নিরাপদ আছি। একদম ঠিক আছি। ঘটনাটি সিকিউরিটি চেক-ইনে ঘটেছে। আমি নিরাপদে আছি ঠিকই, কিন্তু আমার চিন্তা যে সন্ত্রাসবাদ পাঞ্জাবে বাড়ছে, সেটি আমরা কী করে সামলাব?’

২০২০ সালের ডিসেম্বরে কঙ্গনা লিখেছিলেন, এক বয়স্ক নারী তাকে বলেছিলেন যে, ১০০ রুপি দিলে তিনি ‘আসবেন’ অর্থাৎ টাকার বিনিময়ে আন্দোলন করবেন। সে সময় দিল্লির শিখ গুরুদুয়ারা ম্যানেজমেন্ট কমিটির প্রধান মাঞ্জিদার সিং সিরসা বলেছিলেন, কঙ্গনাকে এক সপ্তাহের মধ্যে ‘নিঃশর্ত ক্ষমা’ চাইতে হবে। পরে এ বলিউড তারকা ওই পোস্ট ডিলিট করে ফেলেন।

এরপর ২০২১ সালে পপ তারকা রিহানা এক্সে কৃষক আন্দোলন নিয়ে পোস্ট করেছিলেন। ওই পোস্টে তিনি বলেছিলেন, এটা নিয়ে আমরা কথা বলছি না কেন? তার সেই টুইটের জবাবে কঙ্গনা বলেছিলেন, কেউ কথা বলছে না, কারণ তারা কৃষক না। তারা ভারতকে সন্ত্রাসী; বিভক্ত করতে চেষ্টা করছে, যাতে চীন আমাদের ভঙ্গুর দেশের দখল নিয়ে চীনা উপনিবেশ বানাতে পারে। পরে কঙ্গনা ওই পোস্টও ডিলিট করে ফেলেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত