শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ফিরেছে কোটা ফিরছে আন্দোলন

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৪, ০৩:০২ এএম

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল করার রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। রায়ের পর সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক ও বিক্ষোভ নতুন করে ডালপালা মেলেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সরকারি চাকরিতে সব ধরনের কোটা বাতিলের দাবি জানান তারা। অন্যথায় বৃহত্তর আন্দোলনের ঘোষণাও দেন আন্দোলনকারীরা।

২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা প্রচলিত ছিল। তবে ওই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক কোটাবিরোধী আন্দোলন হয়। আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের মন্ত্রিসভা ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর সরকারি চাকরিতে নবম থেকে ১৩তম গ্রেডে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। তার আগে এসব পদে চালু থাকা কোটার ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং তাদের নাতি-নাতনিদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। এর বাইরে নারীদের জন্য ১০ শতাংশ, অনগ্রসর জেলার বাসিন্দাদের জন্য ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ আর প্রতিবন্ধীদের জন্য ১ শতাংশ সংরক্ষণ করা হতো।

গত বুধবার সরকারি নিয়োগের দুই শ্রেণিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে ২০১৮ সালে যে পরিপত্র জারি করা হয়েছিল, সেটি অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছে উচ্চ আদালত। ২০২১ সালে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের অংশটিকে চ্যালেঞ্জ করে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হাইকোর্টে রিট করেন। সে রিটের শুনানি নিয়ে ওই ৩০ শতাংশ কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়। সর্বশেষ গত বুধবার সেই রুল যথাযথ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট। ওই পরিপত্র অবৈধ ঘোষণার ফলে এখন মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নবম থেকে ১৩তম গ্রেডে নিয়োগ দেওয়ায় আর কোনো বাধা থাকল না বলে জানিয়েছেন রিট আবেদনকারীদের আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী।

এ রায়ের পর থেকে কোটা বাতিলের দাবিতে ফের আন্দোলন শুরু করেছেন শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ করতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। বুধবার সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থেকে কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। পরে মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন। এ সময় ‘চাকরিতে কোটা, মানি না মানব না’, ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলায়, কোটার ঠাঁই নাই’, ‘হাইকোর্টের রায়, মানি না মানব না’, ‘কোটা পদ্ধতি, কোটা পদ্ধতি, মানি না মানব না’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন তারা।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জানান, সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা কোনো দেশের স্বাভাবিক শিক্ষাব্যবস্থা হতে পারে না। হাইকোর্ট কোটা পুনর্বহালের রায় দিয়েছে। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানান। তারা দেশের সূর্যসন্তান। তাই বলে তাদের সন্তান এমনকি নাতি-নাতনিরা পরিশ্রম না করেই কোটায় চাকরিতে যোগ দেবে, এটা মানেন না তারা। রায়ে অসন্তুষ্টির কথা জানিয়ে ওই শিক্ষার্থীরা বলেন, এটা তাদের অধিকারের লড়াই। মেধাবীরা পরিশ্রম করে চাকরি পাবেন, কোটায় নয়।

পরে গত বৃহস্পতিবার ফের কোটা বাতিল চেয়ে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। এ সময় ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘২০১৮ সালের রাবার বুলেটের ক্ষত এখনো শুকায় নাই, কার্জন হলে টিয়ার শেল খেয়েছিলাম, সেই জ¦লন এখনো শুকায় নাই। ক্যাম্পাসে পুলিশ যেভাবে আমাদের নির্যাতন করেছে, সেই ভয়াল অভিজ্ঞতা এখনো ভুলি নাই। সেদিনের কোটা বাতিল ছিল সারা বাংলার ছাত্রসমাজের গণজোয়ারের ফলাফল।’

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিদ হাসান কোটা পুনর্বহালের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘আমরা কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি। আমরা রক্ত দিয়েছি। তার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এ কোটা পদ্ধতি বাতিল করেছিল। কিন্তু আবারও হাইকোর্ট সেই কোটা পুনর্বহাল করেছে, আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। আমরা হাইকোর্টের এ রায়কে প্রত্যাখ্যান করছি।’

ওইদিন রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী একদল শিক্ষার্থী। মানববন্ধনে হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার এবং পরে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে গতকাল একই ইস্যুতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। কোটা পুনর্বহালের আদেশের নিন্দা জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টির স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘স্টুডেন্ট রাইটস অ্যাসোসিয়েশন’। কোটা বাতিল চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে আন্দোলন করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও।

২০১৮ সালে ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’-এর ব্যানারে যে পাঁচটি বিষয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলে সেগুলোর অন্যতম ছিল মুক্তিযোদ্ধা কোটার সংস্কার। আন্দোলনকারীরা চেয়েছিলেন, ৫৬ শতাংশ কোটার মধ্যে যে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধার জন্য বরাদ্দ সেটিকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হোক। তাদের সেই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে কোটা ব্যবস্থাই বাতিল করা হয়েছিল।

তবে ২০১৮ সালে বাতিলের পর কোটা ব্যবস্থা বহালের দাবিতে আন্দোলনে নামে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের স্বজনদের কয়েকটি সংগঠন। মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহাল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল তারা। কোটা বাতিল করে হাইকোর্টের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের বিভিন্ন সংগঠন।

উচ্চ আদালতের এ রায়ের ফলে শুধু মুক্তিযোদ্ধা কোটাই ফিরবে নাকি বাকি সব কোটা বহাল হবে সেটি এখনো পরিষ্কার নয়। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ মোহাম্মদ সাইফুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদালত তার বক্তব্যে বলেছেন আগের মতো কোটা বহাল হবে। আদালতের জাজমেন্ট (পূর্ণাঙ্গ রায়) না পাওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যায় না। এক কথায় বলা যায়, আগের মতো কোটা ফিরে আসবে।’ তবে বাকি কোটাগুলোর ব্যাপারে ‘প্রসিডিং’-এ কিছু উল্লেখ ছিল না বলেও জানান তিনি।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘যদি পুরো পরিপত্রটিই বিবেচনায় নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সবই বহাল হওয়ার কথা। আদালত কোনো রুলের ক্ষেত্রে অংশবিশেষকে বিবেচনায় নিয়েও রায় দিতে পারেন।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত