মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

দুশ্চিন্তার শিক্ষাজীবন

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৪, ১২:৩৩ এএম

স্কুল-কলেজের গন্ডি পার হয়ে একজন শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন তখন দুচোখে স্বপ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীই আসেন মফস্বল থেকে। তারাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পেরিয়ে একটি প্রত্যাশিত চাকরির মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অধিকাংশই শহুরে পরিবারের। তারপরও উভয় মাধ্যমের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন নিজেদের ভয়াবহ সমস্যার কথা তুলে ধরেন, তখন আতঙ্কিত না হওয়ার কারণ নেই। কেন তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে চান, কেন পড়াশোনা শেষে তারা হতাশায় থাকবেন আর কেনইবা পেশাজীবন নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকবেন? রীতিমতো চমকে ওঠার মতো জরিপের ফল জানিয়েছে আঁচল ফাউন্ডেশন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে পারেন না অনেকেই। পড়াশোনার মান ও হলের পরিবেশ নিয়ে অসন্তুষ্টি, জ্যেষ্ঠ সহপাঠী ও শিক্ষকদের বুলিং, যৌন হয়রানি, ভবিষ্যৎ পেশা নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং মন খুলে কথা বলতে না পারার কারণে হতাশা ও বিষণœতায় ভোগেন অনেক শিক্ষার্থী। এমন পরিস্থিতিতে প্রচণ্ড মানসিক অস্থিরতা ও প্রতিকূল পরিবেশে খাপ খাওয়াতে না পারার কারণে ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থীর মনে আত্মহত্যার চিন্তা এসেছে। ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা ভবিষ্যৎ পেশাজীবন নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশনের এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। শুক্রবার অনলাইনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির কারণ’ শিরোনামের ওই জরিপের তথ্য তুলে ধরা হয়। দেশের ৮৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৫৭০ শিক্ষার্থী জরিপে অংশ নেন। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে হতাশার বিভিন্ন উপসর্গে ভোগেন বলে জানিয়েছেন। তাদের ক্লান্তি, ওজন কমে যাওয়া, কোনো কিছু উপভোগ না করা, ঘুমের ধরনের পরিবর্তন, আত্মহত্যার চিন্তা, কাজে মনোযোগ দিতে না পারা ইত্যাদি অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৩, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৮০ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা এ ধরনের উপসর্গের মধ্য দিয়ে গেছেন।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩২ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী সরকারি চাকরি করতে চান, প্রায় ১০ শতাংশ ব্যবসা বা উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, মাত্র ৭ শতাংশ বেসরকারি চাকরি করতে চান। পেশাজীবন নিয়ে এখনই কোনো ভাবনা নেই প্রায় ২২ শতাংশ শিক্ষার্থীর। ২০১৬ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষিতদের মধ্যে মানসিক সমস্যার প্রবণতা সব থেকে বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা শিক্ষার প্রয়োজনে পরিবার ও কাছের মানুষদের কাছ থেকে দূরে এসে মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন সব থেকে বেশি। ভবিষ্যৎ উচ্চাভিলাষ, প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া, হতাশা প্রভৃতি ধাপে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে নিয়ে যায় আত্মহত্যা বা আত্মহননের মতো জঘন্যতম পরিণতিতে।

প্রতিবছর অনেকেই বেকার থাকছেন অথবা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ার, জীবন যে অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে, তার দায়ভার কার? অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীরা যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন জ্ঞানার্জনের জন্য, গবেষণার জন্য, সেখানে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা ভর্তি হন একটা ভালো চাকরির জন্য। কিন্তু দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। চাইলেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে চাকরির নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা যদি একটি গবেষণানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে পারি, তরুণদের মধ্যে ভালো প্রতিষ্ঠানের কর্মী হওয়ার পরিবর্তে উদ্যোক্তা হওয়ার আগ্রহ তৈরি করতে পারি, তাহলে কিছুটা হলেও শিক্ষার্থীদের হতাশা দূর করা সম্ভব। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কের মানোন্নয়ন করতে হবে। কোনো শিক্ষক যেন শিক্ষার্থীর স্বপ্নভঙ্গের কারণ না হন, শিক্ষকরা যেন হন শিক্ষার্থীদের সব থেকে বড় আশ্রয়, স্বপ্ন গড়ার কারিগর। একই সঙ্গে প্রত্যেকটি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সেলিংয়ের শিক্ষক দল বাধ্যতামূলক করা দরকার। যে করেই হোক, আগামী প্রজন্মকে সুস্থ-স্বাভাবিক রাখতে না পারলে, দেশের পরিণতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে বাধ্য। শিক্ষার্থীদের জীবন যেন দুশ্চিন্তা আর হতাশায় আচ্ছন্ন না থাকে, সে বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে সতর্কতা এবং সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। 

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত