শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

গাজায় হামলা বন্ধ হচ্ছে না কেন

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৪, ১২:৪৬ এএম

গাজায় হামলা বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছেন জো বাইডেন। তারপরও বন্ধ হচ্ছে না এ নৃশংসতা। বিভিন্ন সূত্র থেকে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

গত বছরের ৭ অক্টোবর গাজায় শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলা বন্ধের জোর উদ্যোগ নিয়েছেন জো বাইডেন। তিনি কয়েকটি শর্তসহ একটি প্রস্তাব জমা দিয়েছেন জাতিসংঘে। ইসরায়েল হামলা বন্ধে প্রাথমিক মত দিয়েছে। হামাসও রাজি বলে জানিয়েছে। তবে এখনো বন্ধ হচ্ছে না ইসরায়েলি হামলা। কারণ হামলা বন্ধের পরিণতি কী হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়াতায় রয়েছে হামাস ও ইসরায়েল। যা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। বিবিসিতে প্রকাশিত এক মতামতে বলা হয়েছে, যুদ্ধ থামলে নতুন এক ‘খেলা’ সেখানে শুরু হতে পারে। সেখানে বলা হয়েছে, যেসব শর্তে হামলা বন্ধের ঘোষণা আসতে পারে, তাতে এ দুই অঞ্চলের রাজনৈতিক ভবিষ্যতে অনিশ্চয়তাও  দেখা দিতে পারে। যেমন হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার কীভাবে গাজায় কাজ করবেন তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। জো বাইডেন যেসব শর্তে যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যেমন এর আগে অন্যান্য দেশের উদ্যোগে কেন তাহলে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হলো না?

জিম্মি মুক্তি

বিবিসিতে এ বিষয়ে একটি মতামত লিখছেন তাদের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি লুসি উইলিয়ামসন। তার লেখা থেকে জানা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা ইসরায়েলের হামলা বন্ধে বাইডেনের তৈরি একটি খসড়া প্রস্তাবনা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে জমা দিয়েছে। তিন শর্তের মধ্যে রয়েছে সংঘাতের অবসান, জিম্মিদের মুক্তি এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের পুনর্গঠন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ধাপে ধাপে এ চুক্তি সমর্থন করতে হবে। কারণ তার দেশের ভেতরেই এ নিয়ে চাপ রয়েছে।

শর্তের প্রথমে বাইডেন বলেছেন, জীবিত এবং মৃত বেশ কয়েকজন জিম্মিকে মুক্তি দিতে হবে হামাসকে। অবশ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি হামাস তা করে তাহলে নৈতিক চাপে পড়বেন নেতানিয়াহু। কারণ প্রায় ৩৫ হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেও তিনি হামাসের হাত থেকে জিম্মিদের মুক্ত করতে পারলেন না। যেখানে বাইডেন একটি আলোচনার মাধ্যমে তাদের মুক্ত করতে পারছেন। তবে এ শর্তের বিষয়ে সতর্ক থাকবে হামাস। তারা গুরুত্বপূর্ণ (রাজনৈতিকভাবে) জিম্মিদের প্রথমেই মুক্ত করবে না। তাদের শঙ্কা এসব জিম্মি মুক্তি পেয়ে গেলে ইসরায়েল আবার গাজায় হামলা শুরু করবে হামাসকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে। কোনো ধরনের গ্যারান্টি ছাড়াই জিম্মিদের ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ হামাস মনে করছে, জিম্মিরা ফিরে গেলে ইসরায়েল ঘরে বসে থাকবে না। যুদ্ধ পুনরায় শুরু করতেও পারে। গত সোমবার সকালে ইসরায়েলি সংবাদ মাধ্যমে ফাঁস হওয়া একটি বার্তার কারণে তারা আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে। যে বার্তায় জানা যায়, নেতানিয়াহু তার সংসদীয় সহকর্মীদের বলেছেন, ইসরায়েল বিকল্প পথ খোলা রাখবে। এখানে বিকল্প পথ বলতে আবার হামলার পথ বেছে নেওয়াকে বুঝানো হতে পার। কারণ হামাসকে ‘নির্মূল’ না করা পর্যন্ত নেতানিয়াহুর অতি ডানপন্থি জোটের শরিকরা শান্ত হতে চাইবে না। তাদের সমর্থন ছাড়া আগাম নির্বাচনে জেতা বা দুর্নীতির বিচার থেকে রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই নেতানিয়াহুর সামনে। লুসির লেখা থেকে জানা যায়, যে কারণে মিসরের উদ্যোগে হামলা থামানোর প্রস্তাবে রাজি হয়নি ইসরায়েল। জিম্মি মুক্তির চুক্তিতে যা-ই থাক, নেতানিয়াহুর জন্য বিকল্প রাস্তা খোলা রাখতেই হবে। অন্যদিকে হামাস নেতারা সম্ভবত স্থায়ী যুদ্ধবিরতির নিশ্চয়তা চান। পূর্ববর্তী চুক্তি যে কারণে সফল হয়নি। এখন আবার হামলা বন্ধের চুক্তির কোথায় হামাসকে নির্মূলের বিকল্প নেতানিয়াহুর জন্য খোলা আছে তা বুঝে ওঠা মুশকিল। তবে নেতানিয়াহুর জন্য সেটা জরুরি। কারণ তার কট্টর ডান সরকারের মিত্রদের চাপ রয়েছে এ বিষয়ে।

কী হারাবেন নেতানিয়াহু

অবশ্য নেতানিয়াহু গত সপ্তাহের শেষ দিকে বলেছেন, হামাসের ‘সামরিক ও শাসন ক্ষমতা’ ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে গোষ্ঠীটি আর ইসরায়েলের জন্য হুমকি নয়। অবশ্য এটা স্বাভাবিক যে হামাস ইতিহাসের রেকর্ড হামলার মুখে তার সামরিক অবকাঠামোতে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং এমনকি গাজায় তার জনসমর্থনের ওপর নিয়ন্ত্রণও হারাতে পারে। তারপরও এখন পর্যন্ত এমন কোনো লক্ষণ নেই যে ইসরায়েল তার শীর্ষ নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার বা মোহাম্মদ দেইফকে হত্যা বা বন্দি করতে পেরেছে। এদিকে গাজা ছেড়ে চলে গিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর উদযাপনের জন্য কিছু থাকবে না, উল্টো তাদের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটতে পারে। সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, ইসরায়েলি হামলায় হামাসের সক্ষমতার অবনতি হয়েছে। তবে তারা হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে না যে গোষ্ঠীটিকে সামরিকভাবে নির্মূল করা যাবে। হোয়াইট হাউজের তথ্যমতে, ইসরায়েল হামলা বন্ধে অনেকটা সম্মত হলেও, হামাস কী করবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

ইসরায়েলের সামরিক রেডিও স্টেশন জিএলজেড-এর কূটনৈতিক সংবাদদাতা ইয়ানির কোজিন বলেন, নেতানিয়াহু যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাবেন না যতক্ষণ না তিনি এটিকে সাফল্য হিসেবে রূপ দিতে পারেন। তিনি বলেন, চুক্তির মাধ্যমে হামাসকে ছেড়ে দেওয়া নেতানিয়াহুর জন্য একটি বড় ব্যর্থতা। ‘আট মাস পরে আপনি যখন যুদ্ধের কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি, হামাসকে শেষ করতে পারা, সমস্ত জিম্মিকে ফিরিয়ে না আনা বা সীমান্ত সুরক্ষিত না করা; তখন তিনি যুদ্ধ শেষ করতে চান না। তিনি (নেতানিয়াহু) এটাও বোঝেন যে ২০২৬ সালের পরবর্তী ইসরায়েলি নির্বাচন পর্যন্ত তিনি গাজা ইস্যুকে ছেড়ে দিতে পারবেন না’। ইয়ানির পরামর্শ, যদি তিনি বলতে পারেন, আমরা ইয়াহিয়া সিনওয়ার এবং মোহাম্মদ দেইফকে নির্বাসিত করেছি, তারা গাজায় বসবাস করছে না; আমি মনে করি তিনি তার সরকারকে একসঙ্গে রাখতে পারবেন। কিন্তু এটা অনেক যদির ওপর নির্ভর করছে। অবশ্য হামাস তার শীর্ষ নেতাদের নির্বাসনে পাঠানো বা আত্মসমর্পণে রাজি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। কিন্তু গাজার ভেতরে ও বাইরে হামাস নেতাদের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজনও দেখা যাচ্ছে। প্রাক্তন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক সোমবার ইসরায়েলি রেডিওকে বলেছিলেন, নেতানিয়াহু কেবল তখনই এগিয়ে যান (হামলা বন্ধের চুক্তি) যখন তিনি নিশ্চিত হন যে সিনওয়ার তা প্রত্যাখ্যান করবেন। এহুদ বারাক বলেন, আপনি ভেবে দেখুন সিনওয়ার কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে যখন তাকে বলা হবে যে সমস্ত জিম্মি ফিরিয়ে দেওয়ার পরও আমাদের আপনাকে হত্যা করতে হবে।

হামাসের সংকট

ইসরায়েল জানিয়েছে, হামলা বন্ধে তারা সম্মত যদি তাতে হামাস রাজি হয়। হামলা বন্ধে হামাসমুক্ত ফিলিস্তিন ভূখণ্ড পুনর্গঠনের শর্ত দিয়েছেন জো বাইডেন। এ শর্ত মানা হামাসের জন্য কঠিন হবে। বাইডেন বলছেন, ‘হামাস এখন সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতির একমাত্র বাধা’। তবে ইসরায়েল প্রস্তুত বলে তারা নিশ্চিত করেছেন। কাতার গত সোমবার বলেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে তিনি ফোন পেয়েছেন ‘গাজার স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করার জন্য’। এক বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, দুই নেতা গাজা এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেছেন। কাতার, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্র হামাস এবং ইসরায়েলের মধ্যস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আলজাজিরা জানাচ্ছে, গাজায় আর হামাস ক্ষমতায় থাকতে পারবে না এমন শর্ত তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। গ্রুপ-৭ সোমবার জানায়, তাদের নেতারা ‘যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা’কে সম্পূর্ণরূপে সমর্থন করে। গাজায় অবিলম্বে ‘যুদ্ধবিরতি’, সমস্ত জিম্মি মুক্তি, মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং টেকসই ফিলিস্তিনের জন্য তারা হামাসকে এ চুক্তি মেনে নিতে আহ্বান জানায়। তারা বলছে, ইসরায়েল এগিয়ে যেতে প্রস্তুত এবং আমরা হামাসের ওপর প্রভাব রয়েছে এমন দেশগুলোকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই। হামাসের মুখপাত্র ওসামা হামদান ইসরায়েলি হামলা বন্ধের পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে গত রবিবার আলজাজিরাকে বলেন যে তারা এখনো কোনো লিখিত নথি পাননি।

যদিও বাইডেনের প্রস্তাব চাউর হওয়ার পর হামাস এতে ইতিবাচকভাবে সম্মতি জানিয়েছিল। কিন্তু বাইডেন তার প্রস্তাবের সবকিছু খোলাসা করেননি। এখনো অনেকে জানে না এ রূপকল্পে কী আছে। ধীরে ধীরে বিভিন্ন শর্ত উন্মুক্ত হচ্ছে। যার একটি হলো, গাজায় আর হামাস তাদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে না। যে শর্ত প্রকাশ হওয়ার পর হামাস পিছিয়ে পড়েছে বলে মনে হয়। যদিও এ শর্ত সহসাই পূরণ করার মতো নয়। তবে এতে সম্মত হলে হামাসের পক্ষে গাজার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ কমে যাবে। এখন যেমন গাজা এবং ফিলিস্তিনের অন্য অংশে আলাদা শাসনব্যবস্থা চালু আছে, তা বন্ধ হয়ে যাবে। এমন একটি ভয়ংকর গণহত্যার মুখোমুখি হওয়ার পর গাজাবাসীও হামাসকে কতটা সমর্থন দেবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় অন্যান্য দেশের সমর্থনও হারাতে হবে হামাসকে। আবার হামলা বন্ধের শর্তে রাজি না হয়েও উপায় নেই।

গাজা উপত্যকা ২০০৭ সাল থেকে শাসন করে আসছে হামাস। এর আগে ২০০৫ সালে দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে সহিংস ‘ইন্তিফাদা’র পর ইসরায়েল গাজা উপত্যকা থেকে তাদের সৈন্য এবং প্রায় সাত হাজার বসতি স্থাপনকারীদের প্রত্যাহার করে নেয়। এর এক বছর পর নির্বাচনে হামাস নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। এরপর ২০০৭ সালে ফিলিস্তিনের হামাস এবং ফাতাহ পার্টির মধ্যে একটি সহিংস লড়াই হয়। সে সময় ফাতাহ পার্টির নেতৃত্বে ছিলেন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। সে লড়াইয়ে হামাস বিজয়ী হয় এবং এখন পর্যন্ত তারাই সেখানকার শাসন ক্ষমতায় টিকে আছে। গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে আবার আলোচনায় আসে হামাস। তবে এ হামলার জেরে গাজার নিয়ন্ত্রণ হারানোর শঙ্কায় পড়েছে তারা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত