সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন কী কেন কীভাবে

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৪, ০১:২৮ এএম

অধ্যাপক ডা. আয়েশা খাতুন

ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

১৪ জুন বিশ্ব রক্তদান দিবস। দাতা বা রক্তগ্রহীতাকে কোনো রকম ক্ষতির আশঙ্কায় না ফেলে রক্ত সংগ্রহ ও বিতরণসহ ৫টি রক্তবাহিত ঘাতক রোগের জীবাণু বাধ্যতামূলকভাবে স্ক্রিনিং করাই নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালনার প্রথম ধাপ। ডব্লিউএইচওর নিয়মানুযায়ী শতভাগ স্বেচ্ছারক্তদাতাদের রক্ত আহরণ, সংগৃহীত সব রক্তের বাধ্যতামূলক টিটিআই স্ক্রিনিং ও রক্তের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণই নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালনের মূল উদ্দেশ্য। কম ঝুঁকিপূর্ণ রক্তদাতা থেকে রক্ত সংগ্রহ করে স্ক্রিনিং পরীক্ষা বা কম্পোনেন্টে বিযুক্তকরণের মাধ্যমে রক্ত বা উপাদান পরিসঞ্চালন করাকে নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন বলা হয়। নিরাপদ রক্তদানে রক্তদাতার কোনো ক্ষতি হয় না। রক্ত গ্রহণ করে রক্তগ্রহীতার দেহে তাৎক্ষণিক বা দেরিতে পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে না বা গ্রহীতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না সেটাই নিরাপদ রক্ত বা রক্ত উপাদান।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিসিটি ইউনিটের মতে, নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন কর্মসূচির ৪টি লক্ষ্য রয়েছে। ১. নিরাপদ রক্ত সংস্থান ২. নিরাপদ রক্ত সহজলভ্য, ৩. নিরাপদ রক্ত সংস্থায় পাওয়া এবং ৪. সমন্বিত ও যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন কর্মসূচির ৩টি কৌশলের মধ্যে রয়েছে ১. শতভাগ স্বেচ্ছা রক্তদানে রক্ত সংগ্রহ করা, ২. সংগৃহীত রক্তের সব স্ক্রিনিং নিশ্চিতভাবে করা এবং ৩. উপাদানভিত্তিক যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।

রক্তদাতা কারা

একজন মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে যিনি রক্ত দান করেন তিনি রক্তদাতা। সাধারণত দাতা নিজের ক্ষতি না করে শরীরের রক্তের ৮-১০ শতাংশ  দেওয়া। রক্তদাতা প্রকারভেদ আছে যেমন: স্বেচ্ছা রক্তদাতা, পেশাদার রক্ত বিক্রেতা, প্রতিস্থাপিত রক্তদাতা, স্বজন রক্তদাতা অটো লোগাস রক্তদাতা, স্বেচ্ছাপ্রণোদিত রক্তদাতা, কম ঝুঁকিপূর্ণ রক্তদাতা, অনুপযোগী রক্তদাতা, অনিচ্ছুক রক্তদাতা, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ রক্তদাতাঝুঁকিপূর্ণ রক্তদাতা

রক্তদাতার নিরাপত্তা

রক্তদাতার নিরাপত্তা বলতে অসুস্থতা, চিকিৎসা গ্রহণ, নিয়মিত ওষুধ সেবন, হৃদরোগ, হাঁপানি, বহুমূত্র, যক্ষ্মা, স্নায়ুরোগ, রক্তরোগ,কিডনিরোগ, রক্তক্ষরণ বা রক্তপাত সংক্রান্ত রোগ, গর্ভধারণ, স্তন্যদান বা মিসক্যারেজ বিষয়ে লক্ষ্য রাখা হয়।

রক্তগ্রহীতার নিরাপত্তা

হেপাটাইটিস রোগ বা সম্পৃক্ততাসহ রক্তদাতা, স্ক্রিনিং পরীক্ষার রিঅ্যাকটিভ ফলাফলসংবলিত রক্তদাতা, শিরায় মাদক গ্রহণকারী রক্তদাতা, ৬ মাসের মধ্যে ট্যাটু, আকুপাংচার বা চর্মরোগ, রক্ত পরিসঞ্চালন গ্রহণ, ম্যালেরিয়া, প্রিভেনটিভ মেডিকেশন, এইডস অধ্যুষিত দেশে ভ্রমণ বা বসবাস, টিকাগ্রহণ, গত ২ সপ্তাহে দাঁত উঠানো, মুখে সার্জারি, সংক্রমণযোগ্য রোগের এক্সপোজার বা ক্যানসার আছে, এমন কারও কাছ থেকে রক্ত নেওয়া হয় না।

যারা রক্ত দিতে পারবেন না

৫ টিটিআই বাহক, থ্যালাসেমিয়ার রোগী, লিউকেমিয়ার রোগী, হাইপোপ্লাস্টিক এনিমিয়া, হিমোফিলিয়া, হৃদরোগ, স্নায়ুবিক রোগ,

থাইরোটকসিকোসিস, এমফাইসেমা, ইনসুলিন নির্ভর (টাইপ-১) ডায়াবেটিস ইত্যাদি।

রক্তদানের সুবিধা

রক্তদানে নানারকম শারীরিক লাভ হয়। মেরুমজ্জার রিজুভিনেশন বা স্টিমুলেশন, হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমবে। ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমা, বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়া থমকে যাওয়া।

রক্তদানের সামাজিক লাভ : পেশাদার রক্ত বিক্রেতাদের নির্ভরশীলতা ও রক্ত নিয়ে ব্যবসা কমানো, ঘাতক রোগের বিস্তার কমানোসহ, সামাজিক বন্ধন বাড়ে।

রক্তদানের মানবিক লাভ : জীবন রক্ষক সংঘের সদস্য হওয়া, বিনা খরচে ‘ভালো আছি’ তৃপ্তিবোধ করতে পারা এবং স্বর্গীয় আনন্দের অনুভূতি উপভোগ করা যায় রক্তদানের মাধ্যমে।

রক্তদানের অর্থনৈতিক লাভ : অর্থনৈতিক লাভও রয়েছে রক্তদানে। নিচখরচায় চেকআপ, পরামর্শ বা চিকিৎসা প্রাপ্তির সুযোগ, নিয়মিত রক্তদান ওষুধ ছাড়া চিকিৎসা পদ্ধতি ।

দেশে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সন্ধানী, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, বাঁধন, রেড ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রয়েছে, যারা রক্ত পরিসঞ্চালন বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে। চলুন রক্তদানে নিজে সম্পৃক্ত হই, অন্যকে উদ্বুদ্ধ করি মানবতার কল্যাণে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত