সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বিদ্যালয়ের মাঠ যেন চাতাল

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৪, ০১:৩৬ এএম

ক্লাস চলাকালে বিদ্যালয়ের মাঠে চাতালের মতো করে ধান ও ভুট্টা শুকানো হচ্ছে। চরানো হচ্ছে গরু ও ছাগল। টিফিনের সময় শিক্ষার্থীরা মাঠে জায়গা না পেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের শমসেরনগর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের এই চিত্র প্রায় নিত্যদিনের। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়েও তাদের অভিযোগের শেষ নেই। শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না, পাঠদানও হচ্ছে না ঠিকঠাক। এসব বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে অভিযোগ করলেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের পুরো মাঠজুড়ে ধান ও ভুট্টা রোদে শুকানো হচ্ছে চাতালের মতো করে। কয়েকজন নারী ধান ও ভুট্টা কিছুক্ষণ পরপর ওলটপালট করে দিচ্ছেন। ক্লাস চলাকালে ছাত্রছাত্রীরা বিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে ঘোরাফেরা করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন অভিভাবক বলেন, ‘বিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসকে চাতাল হিসেবে ব্যবহার করছেন স্কুলের সভাপতির ভাতিজা মনোয়ার হোসেন। সভাপতির আরেক ভাতিজা আনোয়ার হোসেন নিয়ম বহির্ভূতভাবে স্কুলের রুমে নিয়মিত প্রাইভেট পড়ান। প্রাইভেট পড়ানো অবস্থায় অনৈতিক কর্মকান্ডের ঘটনাও ঘটেছে।’

ক্লাসরুমগুলোতে গেলে দেখা যায় ঠিকমতো ক্লাস হচ্ছে না। শিক্ষকদের কমনরুমেও অল্প কয়েকজন শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বললে তারা জানায়, তাদের ক্লাস ঠিকমতো হয় না, স্যারদের ডেকে এনে ক্লাস করাতে হয়। আর বিদ্যালয় মাঠে ধান ও ভুট্টা শুকানোর কারণে তারা খেলাধুলা করতে পারে না।

একই অভিযোগ এলাকাবাসীর। তারা বলেন, শিক্ষকরা ঠিকমতো স্কুলে আসেন না। প্রধান শিক্ষকও বিদ্যালয়ে নিয়মিত আসেন না। ব্যক্তিগত কাজেই বেশি ব্যস্ত থাকেন।

বিদ্যালয়ে পরপর দুদিন গেলেও দেখা মেলেনি প্রধান শিক্ষকের। দ্বিতীয় দিনে তাকে মোবাইল ফোনে জানিয়ে বিদ্যালয়ে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যায়। তিনি স্কুলে এসে স্বাক্ষর করেই ব্যক্তিগত কাজে চলে গেছেন বলে জানান অন্য শিক্ষকরা। প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতি নিয়ে তৎক্ষণাৎ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নুর আলমকে ফোনে বিষয়টি জানানো হলে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে তার স্কুলে থাকার কথা, কেন নেই তা বলতে পারছি না। তবে আমি বিষয়টা দেখছি।’

স্থানীয় মিজানুর রহমান কমল বলেন, ‘আমার ছোট মেয়ে মাগফিরাতুল জান্নাত মিথিলা এই বিদ্যালয়ে ৯ম শ্রেণিতে পড়ত। কিন্তু প্রায় সময় বিদ্যালয়ে শিক্ষক উপস্থিত থাকেন না। এখানকার শিক্ষার মান এতই খারাপ যে বাধ্য হয়ে আমি আমার ছোট মেয়েকে এই বিদ্যালয় থেকে নিয়ে অন্যত্র ভর্তি করেছি।’

বিদ্যালয়ের সামনের এক ব্যবসায়ী মাসুদ রানা বলেন, ‘সঠিক তদারকি না থাকায় দিনে দিনে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিম্ন পর্যায়ে যাচ্ছে। আমরা চাই প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের লোকজন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিদ্যালয়টির শিক্ষার মান উন্নয়ন করুক।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রধান শিক্ষক আবদুল লতিফ ম-লের সঙ্গে সরাসরি বা মোবাইল ফোনে অসংখ্যবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি।

বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ওসমান গনি শাহ বলেন, ‘আমি মূর্খ মানুষ, এসব বিষয়ে কথা বলতে পারব না।’ তার ভাতিজা বিদ্যালয়ের মাঠকে চাতাল হিসেবে ব্যবহার করছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘গ্রামের অনেকেই মাঠে ধান ও ভুট্টা শুকায়।’

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নুর আলম বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকসহ অন্য শিক্ষকদের অনুপস্থিত থাকা এবং বিদ্যালয়ের মাঠকে চাতালের মতো করে ধান ও ভুট্টা শুকানোর বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত