শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ঝড়-ঝাপটায় টিকে থাকল খেলাঘর

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৪, ০২:২৪ এএম

পেশাদার খেলাধুলার দুনিয়াটা কখনো নিষ্ঠুর, কখনো সমুদ্রের মতো উদার। প্রত্যেকেই যার যার প্রাপ্যটা ঠিকই ফিরে পায়, কেউ আগে আর কেউ বা পরে। এই যে শনিবার সকালে (নাকি শুক্রবার রাতে!) মাহমুদউল্লাহর গলা জড়িয়ে ধরে ডাগআউটে ফিরবেন চন্ডিকা হাথুরুসিংহে, এটা কি কেউ কল্পনা করতে পেরেছিলেন? সেই মাহমুদউল্লাহ, ৭ বছর আগে শ্রীলঙ্কায় যাকে দলের সঙ্গে অনুশীলনেই থাকতে দেননি হাথুরু, ফেরত পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিলেন দেশে। ডালাসে সেই মাহমুদউল্লাহই বাংলাদেশের শ্বাসরুদ্ধকর জয়ের নায়ক। তাতে আপাতদৃষ্টিতে হাথুরুসিংহের চাকরি কিছুটা নিরাপদ।

‘ডালাস’ নামটা বাংলাদেশের মাঝবয়সীদের কাছে এক আবেগের নাম। সত্তরের দশকের এই টেলিভিশন সিরিজটি এক সময় দেখানো হতো বাংলাদেশ টেলিভিশনে। দেশের বাইরে তাকানোর সেই এক ছোট্ট জানালা দিয়ে পশ্চিমা দেশের জীবনযাপন দেখা। তেল কোম্পানির মালিক বড়লোক পরিবারের প্রেম বিয়ে পরকীয়াসহ কত আপাত নিষিদ্ধ উপাদানে ভরা সেই সিরিজের স্বর্ণকেশীদের নিয়ে কত কল্পনা। টেক্সাসের এই শহরটাও কি বাংলাদেশের ক্রিকেট রূপকথায় কার্ডিফ, গায়ানার মতো ঢুকে পড়ল? সপ্তাহখানেক আগেও ডালাস মানেই মনে হচ্ছিল অভিশাপ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সিরিজ হার তো এখানেই। যার ফল পড়েছে ম্যাচের টিকিট বিক্রিতে, অনেক প্রবাসী বাংলাদেশিই নাকি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাই অনেকেই আগাম অনলাইনে ২১৮ ডলার দিয়ে টিকিট কেটে মাঠে গিয়ে দেখেন কাউন্টারে একই টিকিট বিকোচ্ছে ১৩০ ডলারে। যারা যাননি তারা নিশ্চয়ই আফসোস করছেন, ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া হলো না। আর যারা গিয়েছেন, তাদের তো একেবারে পয়সা উসুল। ৩৯ ওভার খেলা হয়েছে, ১৮টা উইকেট পড়েছে, খেলা গড়িয়েছে শেষ অবধি, টান টান উত্তেজনা ছিল গোটা ম্যাচে... একটা টি-টোয়েন্টি ম্যাচ থেকে আর কী চাই?

টসে জিতে কে আগে ব্যাট করল আর বল করল, ওসব নিশ্চয়ই পাঠক এতক্ষণে জেনে গেছেন। ম্যাচ শেষের প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর পত্রিকার পাতা যখন আপনার হাতে, ততক্ষণে তাওহীদ হৃদয়ের প্রতিটা ছক্কার দূরত্বও আপনার জানা। তাহলে সাংবাদিকের হাতে থাকল কী? থাকল ছোট ছোট সব মুহূর্ত, যেসবে তৈরি হয়েছে বিজয়ের গল্প। ধনঞ্জয়া ডি সিলভা বল করতে যাচ্ছেন, স্ট্রাইকে মাহমুদউল্লাহ আর অন্যপ্রান্তে সাকিব আল হাসান।  ওপাশ থেকে সাকিব বললেন ‘আরামসে’, রিয়াদের জবাব ‘পাইলে মারমু’। সাকিব আবার বললেন, ‘পরের ওভারে চাইলে মারতে পারেন’, রিয়াদ ফের বললেন, ‘অসুবিধা নাই, পাইলে মারমু’। এই যে আত্মবিশ্বাস, এই যে হার না মানার জেদ এই মুহূর্তগুলো লিপিবদ্ধ করার জন্যই মনে হয় এই ইন্সট্যান্ট স্কোর আর লাইভ স্ট্রিমিং-এর যুগেও লেখার আবেদন থেকে যায়।

আরেকটা মুহূর্তের কথা বলি। বাংলাদেশ জিতেছে। স্টেডিয়াম থেকে একের পর এক বাংলাদেশের জার্সি গায়ে মানুষ বের হচ্ছেন হাসিমুখে। এই দৃশ্য শেষ কবে দেখা গেছে? টেক্সাসের বাংলাদেশি কমিউনিটি কম নয়। অন্য অনেক শহর থেকেও ক্রিকেট ভক্তরা এসেছেন। তাদের কাছে এই ম্যাচ শুধু ম্যাচ নয়, দেশের সঙ্গে সংযোগ। বিদেশ বিভুঁইতে ‘আমার সোনার বাংলা’ বেজে উঠলে যখন তারা গলা মেলান, তখন মনে পড়ে ফেলে আসা স্বদেশকে, প্রিয়জনকে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল তো স্রেফ একটা দল নয়, প্রবাসে এক টুকরো বাংলাদেশ। কাজ থেকে ছুটি নিয়ে, হাড়ভাঙা খাটুনির পয়সা জমিয়ে, বৃত্তির টাকা থেকে একটু একটু করে বাঁচিয়ে যারা মাঠে এসেছিলেন, তারা যে রাত্তিরে হাসিমুখে বাড়ি ফিরে শান্তিতে ঘুমাবেন, নাতি-নাতনির কাছে বলে বেড়ানোর মতো একটা গল্পের স্মৃতি তৈরি হবে তাদের মানসপটে, এই প্রাপ্তিটাও কি কম!

ব্যাটিং খারাপ হয়েছে, সৌম্য সরকার শূন্যের চূড়ায় চড়েছেন, সাকিব ব্যাটে বলে যাচ্ছেতাই দিন কাটিয়েছেন, যেটা তার জন্য খুবই অস্বাভাবিক, শান্ত অধিনায়ক কোটায় খেলছেন; সব সত্যি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যি হচ্ছে তাওহীদ হৃদয়ের টানা তিন ছক্কায় গ্যালারিতে বাংলাদেশি সমর্থকদের গর্জন। যে আওয়াজটা সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের হৃৎস্পন্দন ফিরিয়ে আনে। দর্শকরা বিশ্বাস করতে শুরু করে, এই ম্যাচটা বাংলাদেশ জিততে যাচ্ছে। সেই বিশ্বাস এতটাই দৃঢ় যে তার কাছে শারীরিক ব্যথাও তুচ্ছ। ডিপ মিডউইকেট দিয়ে হাসারাঙ্গার বলে উড়িয়ে মারা ছক্কায় বল যায় গ্যালারিতে; আঘাত করে এক দর্শকের পায়ে। বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা টি-শার্ট গায়ের ঐ দর্শকের হাঁটুর একটু নিচে বলের আঘাতে লাল হয়ে রক্ত জমে যাওয়ার চিহ্ন। এ রকম জোরে উড়ে এসে লাগা বলের আঘাতে পেশির ক্ষতি হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক, সেসব উপেক্ষা করেই সঙ্গে সঙ্গে মাঠ না ছেড়ে খেলা দেখা শেষ করেই মাঠ ছেড়েছেন তিনি এবং অবশ্যই হাসিমুখে।

গতকাল দেশ রূপান্তরে আমরা খানিকটা ভয়ে ভয়েই বিশেষ আয়োজনের শিরোনাম করেছিলাম, ‘তবু আশায় বাঁধি খেলাঘর’। আজ লিখতেই হচ্ছে, অনেক ঝড়-ঝাপটা সামলে খেলাঘর শেষ পর্যন্ত টিকে আছে। সেটা ‘মায়ের দোয়ায়’ না রিয়াদ-রিশাদ- হৃদয়ের ঘূর্ণি আর ছক্কায় সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে লাভ নেই। খেলাঘর টিকে থাকায় মাথার ওপর ছাদ আছে, অর্থাৎ সুপার এইটে যাওয়ার সম্ভাবনা টিকে আছে, এটাই আপাতত বড় স্বস্তি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত