শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪, ১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

পেটেন্ট জটিলতায় হুমকিতে ওষুধশিল্প

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৪, ০২:৪২ এএম

দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি, জাতীয় উৎপাদন ও জনজীবনের যে গতিপ্রকৃতি তা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় জায়গা করে নেবে বাংলাদেশ। উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় জায়গা করে নেওয়া যেমন আনন্দের, তেমনি এর ফলে তৈরি হতে পারে বেশ কিছু জটিলতা। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পাওয়া বেশ কিছু সুবিধা বাতিল হবে। এতে ঝুঁকিতে পড়বে ওষুধশিল্প। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) প্রপার্টি রাইটস বা মেধাস্বত্ব ছাড় দেওয়া হয় ট্রেড রিলেটেড অ্যাসপেক্ট অব ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস (ট্রিপস) চুক্তির আওতায়। এই চুক্তির ফলে দেশের ওষুধ খাত বড় ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। ফলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে আমাদের ওষুধ ইউরোপ যুক্ত রাষ্ট্রসহ বিশ্বের ১৫৭ টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

মেধাস্বত্ব ছাড় পাওয়ার কারণে দেশের ওষুধ কারখানাগুলো বিদেশের যেকোনো ওষুধ তৈরি করতে পারে, এমনকি একদম নতুন আবিষ্কৃত ওষুধও তৈরি করতে পারে। কিন্তু এই সুবিধা বাতিল হয়ে মেধাস্বত্ব আইন কার্যকর হলে, যেকোনো পেটেন্টেড ওষুধ তৈরি করতে চাইলে মূল কোম্পানিকে রয়্যালটি দিতে হবে। উৎপাদনের পর ওষুধের ওপর মূল কোম্পানির পেটেন্ট থাকে সর্বোচ্চ ২৫ বছর। এ সময় ওই কোম্পানি একচেটিয়া ব্যবসা করে। তবে ২৫ বছর পর যে কেউ এই ওষুধ উৎপাদন করতে পারে।

ওষুধশিল্পের বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৮ সাল থেকে দেশের ওষুধশিল্প মেধাস্বত্ব ছাড়ের সুবিধা ভোগ করছে। এই সুবিধা ২০৩৩ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা থাকলেও বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় জায়গা করে নেওয়ার ফলে ২০২৬ সাল থেকে এই সুবিধা বাতিল হয়ে যাবে। যদিও বাংলাদেশের হাতে সুযোগ রয়েছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে মেধাস্বত্ব ছাড়ের সুবিধা আরও তিন থেকে সাত বছর পর্যন্ত বাড়িয়ে নেওয়ার। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নেওয়া যেতে পারে। দেশ দুটি মেয়াদ শেষে আলোচনার মাধ্যমে সাত বছর মেধাস্বত্ব ছাড়ের সুবিধা পেয়েছে। ইতিমধ্যে ডব্লিউটিওর বিভিন্ন বৈঠকে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পরও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাড়তি শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধার পাশাপাশি ওষুধশিল্পে মেধাস্বত্বে ছাড় চাওয়া হয়েছে। কিন্তু সমন্বিত ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

পেটেন্ট বিষয়ে কাজ করছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর। এই অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পেটেন্ট জটিলতায় যাতে ওষুধশিল্প না পড়ে সেই লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিভিন্ন বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে দাবি তোলা হয়েছে । তবে এখন পর্যন্ত বলার মতো কোনো প্রতিশ্রুতি আদায় করা যায়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. ফিরোজ আহমেদ বলেন, ‘এটা নির্ভর করে ডব্লিউটিওতে আমাদের আলোচনা ও দর-কষাকষির ওপর। ২৬ সালের পরও আমরা মেধাস্বত্ব ছাড় পাব কি না। ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকা আলোচনার টেবিল কাজে লাগিয়ে তাদের সময় বাড়িয়ে নিয়েছিল। এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে একটা বৈঠকে আমি বলেছিলাম, ডব্লিউটিও কিছু দেয় না, আদায় করে নিতে হয়। আলোচনার টেবিলে তাদের রাজি করানো গেলে আমাদের দেশের জন্য তা মঙ্গলজনক হবে।’ তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে একটা বড় সংকট হবে কোম্পানিগুলোর মুনাফালোভী মনোভাব। ধরেন পেটেন্ট ফি ১০ বছরের জন্য একটা কোম্পানি দিল। এখন এই কোম্পানি কিন্তু টাকাটা ১০ বছরে তুলে নেওয়ার কথা। কিন্তু তারা যদি তা না করে ২ বা ৩ বছরে বাজার থেকে সেই টাকা তুলে নিতে চায় তাহলে ওষুধের দাম এক রকম বাড়বে আর ১০ বছরে তুলে নিলে আরেক রকম বাড়বে।

বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতির সভাপতি আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধা থাকায় এখনো আমরা বিদেশের পেটেন্ট করা ওষুধগুলো মূল কোম্পানির অনুমতি ছাড়াই তৈরি করতে পারি। ২০২৬ সালের নভেম্বরের পর মেধাস্বত্ব আইন কার্যকর হলে এই সুবিধায় আমরা আর তৈরি করতে পারব না। তবে এই অসুবিধাটা শুধু সর্বশেষ আবিষ্কৃত ওষুধের বেলায় ঘটবে। কিন্তু ২০২৬ সালের নভেম্বরের আগ পর্যন্ত সর্বশেষ আবিষ্কৃত সব গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন করে রাখার ব্যবস্থা করতে পারলে তা দিয়েই পরবর্তী ৭ থেকে ১০ বছর দেশের চিকিৎসা চালিয়ে নিতে পারবে। এই ওষুধগুলো পরবর্তী সময়ে দেশে তৈরি করলেও মূল কোম্পানিকে রয়্যালটি দিতে হবে না; কিন্তু এর আগে বাংলাদেশ ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে প্রয়োজনীয় সব পেটেন্টেড ওষুধ নিবন্ধন করে রাখার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। বর্তমানে আমাদের চাহিদার ৯৭ ভাগ ওষুধ দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। আমাদের এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পেছনে অন্যতম সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে মেধাস্বত্ব ছাড়। এই ছাড়ের কারণে পেটেন্টেড ওষুধ তৈরিতে কোনো আবিষ্কারক কোম্পানিকে রয়্যালটি বা ফি দিতে হয়নি বাংলাদেশকে। এতে দেশীয় কোম্পানিগুলো বিশ্ববাজারের তুলনায় অনেক কম দামে ওষুধ উৎপাদন করে। কিন্তু দাম বেড়ে গেলে একদিক দিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে ওষুধের দাম আবার রপ্তানির ক্ষেত্রে দেশের ওষুধ খাতকে প্রবল প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে।’

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) এক হিসাবে দেখা গেছে, ওষুধশিল্পে ট্রিপস সুবিধা না থাকলে দেশে উৎপাদিত অন্তত ২০ শতাংশ ওষুধে পেটেন্ট প্রযোজ্য হবে। পরবর্তী সময়ে আবিষ্কৃত নতুন নতুন ওষুধেও পেটেন্ট প্রযোজ্য হওয়ায় দাম বেড়ে যাবে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ইনসুলিন তৈরিতে এখন যে খরচ হয়, সুবিধা বাতিল হয়ে গেলে তা আট গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই সুবিধা বাতিল হয়ে গেলে ক্যানসার, কিডনি, হার্ট অ্যাটাকের মতো জটিল ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার ওষুধের দাম বহুগুণ বেড়ে যাবে, ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে এসব ওষুধের দাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য অধ্যাপক সীতেশ চন্দ দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ নিয়ে কাজ করছেন। তিনি পেটেন্ট বিষয়ে সরকারের একাধিক বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের হাতে কিন্তু সুযোগ ছিল নতুন উৎপাদিত ওষুধকে একটু পরিবর্তন করে নিজেদের মতো ডিজাইন করে নেওয়া। এরপর সেই ওষুধের পেটেন্ট নিজেদের নামে করে নেওয়া। কিন্তু আমাদের সরকার, ওষুধ প্রশাসন ও কোম্পানিগুলো তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। পেটেন্ট ফি দিয়ে ওষুধ উৎপাদন করতে গিয়ে যদি এমন হয় যে আমাদের উৎপাদন খরচ চীন বা ভারতের চেয়েও বেশি হয়ে যায়, তাহলে আমাদের কোম্পানিগুলো নিজেদের উৎপাদনের চেয়ে রপ্তানিতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। এটা কিন্তু আমাদের শিল্পের জন্য বিপজ্জ নক হতে পারে।’

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে মেধাস্বত্ব ছাড়ের সুবিধা পেয়ে এলেও তা কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। এ সময় ওষুধের উৎপাদন ও দেশীয় কোম্পানির সংখ্যা বাড়লেও নিজস্ব ওষুধ তৈরি হয়নি। এ নিয়ে গবেষণাও হয়েছে অতি সামান্য। ২০১০ সালে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দেশের ওষুধশিল্প মেধাস্বত্ব আইনের আওতায় এলে ওষুধ তৈরির খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি সে সময় বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘মেধাস্বত্ব ছাড় থেকে যতটা সুবিধা বাংলাদেশ পেতে পারত, ততটা সুবিধা নিতে পারছে না। আমাদের রপ্তানি আরও বাড়তে পারত, কাঁচামাল উৎপাদনের দিকে আমরা সেভাবে নজর দিচ্ছি না। কাঁচামাল তৈরি করতে না পারলে ওষুধ তৈরির খরচ কমবে না।’

বাংলাদেশের ওষুধশিল্প সম্প্রসারিত হয়ে এখন প্রায় ৩৫ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদিত ওষুধের জন্য এখনো কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। কাঁচামালের আমদানির কারণে ওষুধের দাম কমানো যাচ্ছে না। সস্তা মজুরির দেশ হিসেবে ওষুধশিল্পের পাশাপাশি বাংলাদেশ হতে পারত কাঁচামাল (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস) উৎপাদনের উৎকৃষ্ট স্থান। সব সম্ভাবনা থাকার পরও আমরা তা কাজে লাগাতে পারিনি। দেশে ওষুধশিল্প পার্ক (এপিআই) গড়ে তোলার কাজ শুরু হয় মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ২০০৮ সালে। কিন্তু ১৬ বছর পার হতে চললেও উৎপাদনে যেতে পারেনি ওই ওষুধশিল্প পার্ক।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত